ভগ্নপ্রাসাদে নাদিয়া আনজুমানের কবিতা

Nadia 2
কবি নাদিয়া আনজুমান

মঈনুস সুলতান: আজকের আবহাওয়া আচানক। শীত পড়েনি একেবারেই। আমার সামনে ত্রিকোণাকৃতির এক সারি পাহাড়ের ধূসরিমে বাসন্তি বাহারের মতো লেগে আছে হালকা সবুজের কুয়াশা। আমি কসর দারুল আমান বলে একটি প্রাসাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। তার পশ্চাৎপটে যেন তুষারের চাষাবাদ হচ্ছে। বরফের সফেদ জমিনে প্রাসাদের প্রতিবিম্ব হারানো জামানার অলিক কোন কেসসার মতো ভাসে। দারুল আমানের কেসসা অনেক।

সত্তর আশি বছর আগে এখানে বাস করতেন বাদশাহ আমানুল্লা ও তার কুইন সুরাইয়া। বাচ্চা সকাও বলে এক ভিস্তিওয়ালার আনপড় নাদান আওলাদ তাদের পাশ্চাত্ম্য প্রবণতার জন্য বাদশাহ ও বেগমকে কাফের ফতোয়া দিয়ে লড়কেলেঙ্গে দেশছাড়া করলে তার পরবর্তী আফগান নৃপতিরা ইউরোপীয় স্থাপত্যের এ ইমারতের হেফাজত করতেন। আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক জং-বেজঙের জামানায় আহমদ শাহ মাসুদ বলে পানশীরের এক জংগিলাট এখানে থানা গাড়েন। বীরবিক্রমে প্রতিদ্বন্দ্বী জঙ্গিলাঠ গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ারের সঙ্গে লড়াইয়ের প্যাচমারে মূলত হাউটজার কামানের গোলা ও রকেটবাজিতে এ প্রাসাদের মৌত হয়। আমি ভগ্ন প্রাসাদের চাতালে দাঁড়িয়ে কাবুলের জনা কয়েক মহিলা কবির জন্য ইন্তেজার করি। নীল বোরকা পরা দুই নারী হালকা চালে হেঁটে দ্বিধাগ্রস্ত পদক্ষেপে প্রাসাদের দরবার হলের দিকে এগোলে আমি দূরত্ব রক্ষা করে তাদের অনুসরণ করি।

প্রাসাদের নির্জন করিডোরে পড়ে আছে গোলাদগ্ধ ইট, তৈলচিত্রের ফ্রেম, ফ্রেঞ্চ কেতার টেবিলের পায়া, গলা ভাঙ্গা সিরামিকের তৈজস ও রকমারি মার্বেল পাথরের ভাঙ্গাচোরা সব টইলটুকরা। ত্রিতল ইমারতের উপরতলার ফ্লোরের বিশাল গাতাগর্তে ঝুলে আছে বর্ণাঢ্য মোজাইকের চকমিলান চাকলা। তার ভেতর দিয়ে চালহীন কড়িবরগার ক্ষয়িষ্ণু কাঠামোকে দেখায় তিমি মাছের কংকালের মতো। আমি পরপর ক’টি হলকক্ষ পাড়ি দিয়ে শায়িত এক নারী মূর্তির সাথে হোঁচট খাই। গ্রিক কেতার এ পিংক মার্বেলের ভাস্কর্য’কে বোধ করি দুরমুশ দিয়ে পিটিয়ে আচ্ছাসে শায়েস্তা করা হয়েছে। এখানে করিডোর বিস্তৃত হয়েছে চার-চারটি স্বতন্ত্র শাখায়।

OLYMPUS DIGITAL CAMERA
বালুকায় তৈরী প্রতীকী মনুমেন্ট

আমি এক ভাঙ্গাকাঁচ ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে ঠিক বুঝতে পারি নাই ঠিক কোন দিকে অগ্রসর হবো। ঠিক তখনই ভেসে আসে কাতরানোর ধ্বনির সাথে অস্পষ্ট কিছু কথা, কোথায় যেন কাকে শ্বাসরুদ্ধ করা হচ্ছে। অবাক হয়ে আমি কান পাতি। কে যেন বলে উঠে ‘জিগরে খুন’, বা ‘হৃদয়ে শোনিত।’ বিষয়টি ঠিক মতো বোঝার আগেই ঝনঝন করে কাঁচভাঙ্গা দুয়ার ঠেলে বেরিয়ে আসেন কাকা-জনুন। তার হাতে বিশাল একটি পিতলের খুঞ্চা, তাতে রেশমী চাদর দিয়ে ঢাকা কিছু একটা। পাঁচতারা হোটেলের খানসামারা যেরকম সাবধানে ট্রেতে করে সাহেবসুবোদের জন্য নিয়ে আসে পানের সরঞ্জাম, এরকম হুঁশিয়ারীর সাথে কাকা-জনুন খুঞ্চা হাতে আগ বাড়েন। সহসা আমাকে দেখতে পেয়ে তিনি ফিক্ ফিক্ করে হাসেন।

কাকা-জনুন লবজটির মানে হচ্ছে পাগলা-চাচা। তাঁর আকিকায় দেয়া নামটি কি আমি এখনো তার সন্ধান করে উঠতে পারিনি। আজ তিনি ঝেলঝেলে স্যুটের সাথে টাই পরে এসেছেন, তাঁর দাড়ি কুঁকড়ানো, মোচের মেহদী মাখা দু’প্রান্ত ক্রমাগত চুমরানোতে পেয়েছে প্রথম বন্ধনীর আকৃতি। কাকা-জনুনের হাসি অস্বাভাবিক। অবশ্য তিনি যে হালতের মধ্যে দিন গুজরান করছেন তাতে তাঁর স্বাভাবিক থাকার কথাও না।

তাঁকে আমি পয়লা দেখি কাবুল বিমান বন্দরের কাছাকাছি মাসুদ সার্কোল বলে গোলাকার এক সড়ক দ্বীপে দাঁড়িয়ে খামোকা হল্লা চিৎকার করতে। কাকা নিজের আঁকা একটি চিত্র উর্দ্ধে তুলে ধরে ব্রাশ দিয়ে পথচারীদের ফায়ার করার ভঙ্গিতে শাসাচ্ছেন। তারপর কাকার সাথে আমার মোলাকাত হয়েছে আরো বার কয়েক। কাবুলে কালোয়াতি গানের জলসা বা কবিতার মাইফেল হলে কাকা-জনুন বিনা দাওয়াতে হাজির হয়ে প্রথমত বেফায়দা খানিক হট্টগোল করেন, তাঁর হল্লা চিৎকার কখনো রূপান্তরিত হয় মৃদু কান্নাকাটিতে; তারপর গাছের ছোট ছোট বাকলায় তিনি এঁকে দেন হাজিরানদের চমৎকার সব ছবি।

তাঁর আঁকার হাত কিন্তু খারাপ না। শোনা যায় অনেক বৎসর আগে বাদশাহ জহির শাহ তার দরবারে হাজির নাজির এবং ঐতিহাসিকভাবে বিখ্যাৎ তাবৎ কবিদের তসবির তৈরী করে দেয়ার দায়িত্ব তাঁকে দিয়েছিলেন। তার আঁকা ছবিগুলোও নাকি ঝুলানো হয়েছিলো এক প্রদর্শনীতে। তারপর তালেবানি জামানা আসলে তিনি পিকাপ নিয়ে যান একজিবিশন হল থেকে চাপলিশে ছবিগুলো সরিয়ে গোপন কোন স্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য। সেদিন কাবুলে খুব ঝড় পড়েছে, একটু আগে হয়ে গেছে তুষার বৃষ্টি। একজিবিশন হলের আঙ্গিনায় তিনি জনা কয়েক তালেবি মোল্লাকে দেখেন।

Nadia Image
ভগ্নপ্রাসাদ দারূল আমান

নসীব খারাপ, দ্রুত সটকে পড়ার আগে তালেবরা তাকে পাকড়াও করে আগুন পোহাতে বলে। কাকার চোখের সামনে আগুনের ইন্ধন হয়ে পোড়ে দারী ভাষার তাবৎ কবিকুলের চমৎকার সব চিত্ররাজি। কাকা-জনুনের গর্দিসের এখানেই কিন্তু শেষ হয় না। তালেবানদের সিনিওর মোল্লারা ততদিনে বাদশাহ জহির শাহের পরিত্যক্ত প্রসাদ ‘আরগে’ গদিনশিন হয়েছেন। প্রসাদের দেয়ালে বিস্তর ফ্রেস্কো ও তেলের কাজ। কোন কোন ছবিতে গুলবাগে বিহার করছে পর্দাহীন জওয়ান সব জেনানা। মোল্লারা কাকাকে ডেকে পাঠান আওরতদের রেশরম অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে কালো সিয়া রঙ দিয়ে আব্রু করে দেয়ার জন্য। চিত্রশিল্পকে কালিমা লিপ্ত করার কাজ করতে করতে কাকা-জান ক্রমশঃ এলোমেলো হয়ে যান।

করিডোরের এদিকে হিরাতের কবি নাদিয়া আনজুমান হিরাওয়ীর ছবি ও তাঁর বইয়ের প্রচ্ছদকে ব্লোআপ করে একটি পোস্টার করা হয়েছে। তার নিচে মার্কার দিয়ে তীর চিহ্ণ আঁকা। নাদিয়ার সাথে আমার ঘন্টা খানেকের পরিচয় আছে। নাদিয়া লাইমলাইটে আসেন ইরানের মাসাদ, শিরাজ ও ইস্পাহানে তাঁর কিছু কবিতা ছাপা হলে পর। তালেবানি আমলে বয়সের নিরিখে নাদিয়া ছিলেন কিশোরী। আফগানিস্তান থেকে তখন কিছুই প্রকাশ হচ্ছে না। তার উপর সামাজিকভাবে মেয়েদের কবিতা চর্চা হয়ে গেছে সাফ হারামের সামিল। নাদিয়া তখন হিরাতের আরো জনা কয়েক মহিলা কবির সাথে মিলেঝুলে সেলাই শেখার ক্লাসে যেতেন। সেলাই ফোঁড়াই সর্ম্পকে এ কবিদের আগ্রহ কিছু ছিল না, কিন্তু এ অজুহাতে তারা কবিতা চর্চার জন্য মিলিত হতে পারতেন। ক্লাসে মেয়েরা কি করছে তা দেখার জন্য মাঝে মধ্যে বন্দুকধারী তালেবরা উঁকিঝুঁকি দিলে মহিলা কবিরা খাতা বোরকার আবডালে লুকিয়ে ফেলে সেলাইয়ের ভান করতেন।

করিডোরের এদিকে দেখি বোমা বিধ্বস্থ ছাদের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন জন বেইলি ও ভেরোনিকা ডাবোলডে বলে এক বয়স্ক ইংরেজ দম্পতি। আমরা পরস্পরের সাথে পরিচিত, সুতরাং থেমে শুভেচ্ছা বিনিময় করি। ভেরোনিকা ছাদের দিকে নির্দেশ করে বলেন, তিনি যখন সত্তর দশকের পয়লা দিকে কাবুল আসেন, তখনও এ প্রাসাদের তাম্বার মিনা করা চাল সূর্যকিরণে সোনার আভায় ঝলমল করতো।

ষাটের দশকের শেষ দিকে এ দম্পতি হিরাতে এথনোমিউজিকোলজিস্ট হিসাবে আফগান সঙ্গীতের উপর গবেষণা করতেন। তখন তাদের সাথে গড়ে উঠে দারী ভাষার অনেক কবিদের বন্ধুত্ব। তালেবানরা বিতাড়িত হলে পর ২০০৪ সালে তাঁরা আবার ফিরে আসেন। তখন মূলতঃ ভেরোনিকা সাম্প্রতিক আফগান মহিলা কবিদের কবিতা ইংরেজীতে তর্জমা করার জন্য একটি প্রকল্প করেন।

আমি তখন আফগানিস্তানে কাজ করছি। একদিন দুপুর বেলা তাদের গেষ্টহাউসে গেলে ভেরোনিকা আমাকে নাদিয়ার আনজুমানের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। তরুণী নাদিয়া হিরাত থেকে ভেরোনিকার কাছে এসেছিলেন তর্জমার জন্য তাঁর ক’টি কবিতা জমা দিতে। নাদিয়া তখন দেহজ ভালোবাসার কথা তাঁর কবিতায় সরাসরি লিখে আলোচিত হচ্ছেন। সম্ভবত তাঁর আগে কোন তরুণী এ প্রসংগ নিয়ে সরাসরি কিছু লিখেননি। আফগান সমাজে এ সব কথা বলারও তেমন কোন রেওয়াজ নেই।

কালো কাপড়ে সমস্ত শরীর ও চুল ঢেকে নাদিয়া খুব চুপচাপ বসেছিলেন। আমি তার নির্বাচিত হওয়া একটি কবিতার টেন্সলেশনের প্রিন্টআউট দেখছিলাম। তার দুটি চরণ এখনও আমার স্পষ্ট মনে আছে; “কে সেই লুটেরা/ ভেঙ্গে তছনছ করে আমার স্বপ্নের স্বর্ণ মূর্তি?”

আলাপ পরিচয়ে কিছু একটা বলতে হয়, তাই আমি জানতে চেয়েছিলাম, দারী সাহিত্যে তার প্রিয় কবি কে? অত্যন্ত দ্বিধাহীন জবানে নাদিয়া কবি রাবেয়া বলখীর নাম করেন। রাবেয়া বলখীকে ফার্সি বা আধুনিক দারী ভাষার প্রথম মহিলা কবি হিসাবে চিহ্ণিত করা হয়ে থাকে। পরবর্তীকালে নামজাদা সূফি কবি জামি তার ‘নাফাহাত-উল-উনস্’ এবং কবি আত্তার তার ‘মাহনাবিয়াত’ গ্রন্থে রাবেয়া বলখীর কথা উল্লেখ করেছেন। বলখীর কবিতা তর্জমায় সংগ্রহ করা মুশকিল, তবে তাঁর জীবন সংক্রান্ত কিংবদন্তী সম্পর্কে আমি ওয়াকিবহাল। রাবেয়ার জীবনকাল নবম শতাব্দী; তখন তার ভ্রাতা হারেস বিনতে কুজদারী ছিলেন বলখ প্রদেশের সুবেদার। রাবেয়ার সাথে সুবেদারের তূর্কি ক্রিতদাস বাকতাসের গোপনে প্রণয় হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে হারেস কুজদারী বাকতাসকে অন্ধকূপে নিক্ষেপ করে রাবেয়াকে হাম্মাম বা গোছলখানায় অন্তরীণ করেন। এক পর্যায়ে রাবেয়া তার হাতের শিরা কেটে রক্ত দিয়ে হাম্মামের দেয়ালে তাঁর জীবনের শেষ কবিতা লিখে যান।

কিংবদন্তীর এ কবিতার কথা আমি অনেক শুনেছি কিন্তু কখনো পড়িনি। আলোচনাকে বিস্তারিত করার জন্য আমি নাদিয়াকে রাবেয়ার শেষ কবিতার ভাবানুভূতি ইংরেজীতে তর্জমা করে শোনাতে অনুরোধ করি। নাদিয়ার ইংরেজী তেমন সবল না, ভিন ভাষার শব্দবন্ধের সাথে যুঝতে গিয়ে তাকে খানিক বিব্রত দেখায়।

আমি তাঁর কাছ থেকে যা শুনি তা ভুলে যাওয়ার আগে নোট নেই, যার ভাবার্থ অনেকটা এ রকম:

জড়িয়েছি ভালোবাসার কুহকী জালে

অশ্রুময় নোনাজল ঝুরে

পাঁজরের রক্তিম প্রবালে,

ভাঙ্গে হৃদয়ের বালিয়াড়ী

উড়ে ঝরা পাতা,

পান করি বিষ.. ..বিষে অমরতা।

আমরা প্রাসাদের প্রশস্ত একটি হলকক্ষে এসে পৌঁছি। এ কামরাকে সাফসুতরা করে মেঝেতে গালিচা বিছানো হয়েছে। কামরার চারপাশে মানুষ সমান উঁচু কাঁচভাঙ্গা রট-আয়রনের শামাদান। কাবুলের বেশ ক’জন মহিলা কবি শামাদানের ডালায় তাদের বোরকা রেখে অত্যন্ত নীরবে দাঁড়িয়ে আছেন। কাক-জনুন কামরার মধ্যিখানে তাঁর ট্রে রেখে মেয়েদের সকলকে ঝুঁকে ঝুঁকে কুর্নিশ করলে মেয়েরা মুখে ওড়না চাপা দিয়ে ফিক ফিক করে হাসে। কাকা-জনুন দূরের এক কোণায় রাখা ইজেলের সামনে দাঁড়িয়ে মার্কার দিয়ে ক্যালিওগ্রাফিতে আঁকতে শুরু করেন নাদিয়া আনজুমানের ‘গুলে দুদি’ বা ‘গাঢ় লাল ফুল’ নামক কাব্য গ্রন্থের একটি কবিতার ক’টি চরণ, যার ভাষান্তর হচ্ছে:

যদিও কবিতা ও সঙ্গীতের দুহিতা আমি

পংক্তি আমার লাজনম্র নাজুক

তারপরও স্বরাজপ্রাপ্ত আমার পুষ্প পল্লব

স্বীকার করে না মালির শুশ্রুষা।

ভরোনিকা ডাবোলডে যিনি আজকের জলসার  ইন্তেজাম করেছেন, এগিয়ে এসে মাহফিলটি কেন ভগ্নপ্রাসাদে অনুষ্ঠিত হচ্ছে তার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেন। কাবুলে মহিলা কবিদের মাহফিল  করার কোন রেওয়াজ ছিল না। বিশের দশকের শেষ দিকে পাশ্চাত্ম্য প্রবণ বাদশাহ আমানুল্লা প্রথম বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করে নারীশিক্ষার বদনামের ভাগিদার হন। তার মহিষী কুইন সুরাইয়া এ হলকক্ষে সমুজদার ক’জন মহিলাকে ডেকে এনে মাহফিল করে রাবেয়া বলখীর কবিতা পাঠ করান।

নাটকীয়ভাবে বাদশাহ মাহফিলে এসে ‘আফগান নারীদের আজ থেকে নেকাব পরার সামাজিকভাবে কোন প্রয়োজন নেই’ এ ঘোষণা দিলে কুইন সুরাইয়া তাঁর মুখ থেকে খুলে ফেলেন আব্রু। আজকের মাহফিলে আগত নারীদের উপর ভেরোনিকার বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া হয়। তারা সকলে খানিকক্ষণ নতমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে চুল থেকে ওড়না সরিয়ে তাদের মুখমণ্ডলকে নেকাবমুক্ত করেন।

ভেরোনিকাও তার মুখে জড়ানো চাদরী খুলে ফেলেছেন। তিনি একটু বিরতি নিয়ে আজকের মাহফিলের প্রসঙ্গে আসেন। আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক কবিতার প্রেক্ষাপটে বিষয়বস্তুর দিক থেকে নাদিয়ার অর্জন অনেক। রাবেয়া বলখীর পর তিনিই সম্ভবত প্রথম মহিলা কবি, যিনি ভালোবাসার নারীশোভন অনুভূতিকে উপজীব্য করেছেন। প্রত্যক্ষ এক্সপ্রেসনের কারণে কিশোরী নাদিয়ার উপর তার পরিবার ছিল ক্ষুব্ধ। তাদের ধারণা, নারী হয়ে ‘ভালোবাসা, দেহ ও রূপ’ সম্পর্কে শিল্পিত পদবিন্যাস করে তিনি বংশের মুখে লেপেছেন চুনকালি। ভেরোনিকা তাঁর একটি কবিতা থেকে উদ্ধৃতি দেন:

আমার কলমের অনুপ্রেরণা হয়ে বাজে

ভালোবাসার মঞ্জির,

না ফোটা ফুলে জমে

সৃজনের যে শিশির ,

উপড়ে নিয়ে শিকড় তার

কারা লেখে-

মনের মৃত্যু আমার?

আজকের মাহফিলে দাওয়াত প্রাপ্ত হয়েও কাবুলের পুরুষ কবিদের কেউই জলসায় হাজির হননি। মেয়েদের কাছাকাছি একা দাঁড়িয়ে থাকতে অস্বস্তি হয় বলে আমি কাকা-জনুনের ইজেলের কাছে এসে দাঁড়াই।  কাকা তাঁর হাতের ক’টি টানে ক্যালিওগ্রাফের নিচে এঁকেছেন নাদিয়া আনজুমানের মুখ। আমি তার সবুজ চোখের দিকে তাকাই। মনে হয় ওখানে জমে আছে জলের গভীরের স্তব্ধতা। কাকা ফিস ফিস করে বলেন,‘ নাদিয়া হচ্ছে গুলফামা গোত্রের মেয়ে। তাদের রূপ প্রস্ফুটিত হয় স্বপ্নালোকে। তারপর ঘুম থেকে জেগে উঠে তারা কিন্তু মানতে চায় না কোন বন্ধন।’

এথনোমিউজিকলজিষ্ট জন বেইলি ডিজিটাল ভিডিও তাক করলে মাহফিল শুরু হয় যুগপৎ দারী ও ইংরেজী ভাষায়। সিমা কালবাসি বলে অস্থির চোখের এক কবি খুব সাবধানে ফ্লোরে রাখা ট্রে’র ঢাকনা খুলেন। চীনামাটির ডিশে ঝুরঝুরে বালুকা, তাতে একটি মিনিয়েচার মনুমেন্ট, পেছনে রকি মাউন্টেনের প্রতীক। দরোজার আকৃতির আড়াল থেকে ভাসে হলুদ সবুজ ও ফিকে নীল রঙের বোরকা পরা নারীদের মূর্তি। মহিলা কবিরা বৃত্তাকারে তার চারপাশে এসে দাঁড়ায়। আমি ভিডিও’র আলোয় আশ্চর্য এ ভাস্কর্যের দিকে তাকিয়ে দেখি, সৃজনের প্রতীক যে নারী, বোরকাবৃতা সে জননীরা দাঁড়িয়ে আছেন অনুর্বর বালুকায়। দরোজা খোলা আছে বটে তবে তাদের দৃষ্টি অন্তরীন নেকাবের রঙীন আচ্ছাদনে। মহিলা কবিরা অতি ধীরে ভাস্কর্য থেকে হেঁটে চলে যান কামরার এক প্রান্তে। সিমা কালবাসির অঙ্গভঙ্গিতে ফুটে তার মনে অস্থিরতা। তিনি বুঝি দু’হাতে ধরে আছেন জলন্ত কিছু অংগার, এ রকম ভঙ্গিতে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে পাঠ করেন নাদিয়া আনজুমানের আরেকটি কবিতা:

ঘুঘুর গাঢ স্বরের মতো

আমার চারপাশে ঘুরে শূন্যতা

ভাঙ্গা ডানা আমি

ক্রন্দনই আমার একমাত্র অর্ঘ্য।

নদীর স্রোত যে রকম সহসা রূপান্তরিত হয় বৃত্তাকার ঘূর্ণিতে, সে সেরকম সিমা কালবাসির অস্থির আবৃত্তিতে যেন শ্রোতাদের দেহমনে ঊর্মি খেলে যায়, তারা সকলে যুগপৎ গেয়ে উঠে নাদিয়ার আরেকটি লোকপ্রিয় কবিতা:

আনন্দময় সেদিন হবে

যে দিন আমি ভাঙ্গবো খাঁচা

গাইবো গান

দিল-খোলা এক প্রান্তরে,

সুর জ্বলে যায় অন্তরে।

সিমা কালবাসিকে এবার অত্যন্ত উত্তেজিত দেখায়। মনে হয় তার শরীরের কিছু অংশ পুড়ে যাচ্ছে ধিকি ধিকি অংগারে। তিনি মাহফিলের দিকে তাকিয়ে সওয়াল করেন, নাদিয়া বলে হিরাতের এক আফগান দুহিতা তার মনের অন্তর্গত খবর প্রকাশ করেছে, হিম্মত দেখিয়েছে সে কবি হওয়ার, এর জন্য কী… বলে ঢাকনা দেয়া কেতলীর বাস্পের মতো বলকে উঠে তার আবেগ। তিনি কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে বলেন,‘এর জন্য কী প্রাপ্য ছিল তার মৃত্যু?’ সারা মাহফিল সহসা ভরে উঠে তীব্র নীরবতায়।

জন বেইলি ভেরোনিকার হাতে ভিডিও দিয়ে সকলকে মৌন হওয়ার সুযোগ দিতে বেরিয়ে যান দরোজা দিয়ে। আমি তার সাথে পাশের কামরায় আসি। তিনি ফিসফিস করে বলেন, ‘নাদিয়ার প্রকাশিত একটি কবিতায় প্রতীকীভাবে শারীরিক প্রেমের ইশারা থাকলে তাঁর স্বামী হিরাত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান লাইব্রেরীয়ান ফরিদ আহমদ মজিদনিয়া তাকে দৈহিকভাবে নির্যাতন করে রাত্রিবেলা। তাঁকে বার বার শ্বাসরুদ্ধ করা হয়। সারারাত ভর তাঁর যন্ত্রণাকাতর চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা। ভোরে বিছানায় পাওয়া যায় তার মৃতদেহ। বিষয়টিকে আত্মহত্যা বলে পুলিশ রিপোর্ট দিয়ে দ্রুত তাঁকে দাফন করা হয়। নাদিয়ার বয়স হয়েছিল মাত্র পঁচিশ। সি ওয়াজ সো ইয়াং।’

আমরা আবার মাহফিলের কক্ষে ফিরে আসি। সকলে ততোক্ষণে খানিক সামলে নিয়েছেন। মহিলা কবিরা এবার তাঁর স্মৃতিতে স্বরচিত কবিতা পাঠ করছেন। লোহিত বর্ণের কাফতান পরা জোহরা সাইদ বলে এক কবি মাইক্রোফোন হাতে নেন। ভেসে যাওয়া মেঘের মতোই তার চোখে মুখে লেপে আছে গাঢ় বিষাদ। তিনি খুব মৃদু স্বরে আবৃত্তি করেন:

বহু দূরের জনশূণ্য সৈকতে

আটকে পড়া মাছ আমি,

জোয়ারের হে জলধি

মৃত্যু হবে তৃষায়

যদি না আবার তরঙ্গে ভাসাও।

পড়তে পড়তে তার চোখ সিক্ত হয়। প্রজাপতির ডানায় রূপালি বৃত্তের মতো দু’ফোঁটা অশ্রু লেগে থাকে তার কপোলে। সবাইকে সহসা চমকে দিয়ে কাকা-জনুন বাষ্পরুষ্প কন্ঠে বলে উঠেন,‘ জিগরে মান খুন জিয়াদ আস্ত্’,বা ‘হৃদয়ে আমার অনেক রক্ত।’

[email protected]

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.