খ্যাতি ও নারী: বিপরীতার্থক?

অদিতি ফাল্গুনী:

‘সিনেমা কোম্পানিগুলো তাদের ছবির কাটতির জন্য নায়িকা আমার চরিত্র নিয়ে রসালো নানা গল্প ফাঁদছে বিভিন্ন পত্রিকার পাতায়…হ্যাঁ, ৭৫৯ বারের মতো আমাকে বিয়ে দেওয়া হলো বিভিন্ন গসিপ ম্যাগাজিনে। একেবারে শূন্য থেকে তারা ফাঁদে কীভাবে আমার বিয়ে হলো, কীভাবে আমি হারিয়ে গেছি, আত্মহত্যা করতে গেছি বা চাঁদেই গেছি কিনা? এবং আমি কখনোই আত্মপক্ষ সমর্থন করি না।

অথচ কঠিন বাস্তবতা হলো আজো আমি অবিবাহিত, এমনকি প্রেমও করছি না, ঘর-সংসারহীন একটি মানুষ (On top of all the other absurdities, they’re marrying me for the 759thtime…They produce me the most humiliating articles in all the papers to createpublicitiy for their films. Out of nowhere come long pieces about how I’ve gotmarried, how I’ve disappeared, shot myself, gone to the moon, etc. And I neverdefend myself. However, I’m still not engaged, still unmarried, houseless, homeless:Actress Greta Garbo quoted in Celebrityand the Time of the Secret in Women Making Time by Elizabeth McMahon& Brigitta Olubas).

খ্যাতি পুরুষের ক্ষেত্রে যেমন অলঙ্কার, নারীর ক্ষেত্রেও কি? বোধ করি না। মধ্যযুগের শেষে খোদ পশ্চিমে যে নারীরাই ‘প্রাইভেট স্পেস’ বা ঘরের সীমানা ছেড়ে বর্হিপৃথিবীতে নিজের অবস্থান তৈরি করতে হয়েছে, তাদেরই প্রায়শ:ই ক্যাথলিক মিশনের সন্ন্যাসিনী হয়ে, হাসপাতালের সেবিকা হয়ে এবং এক অর্থে সারা জীবনের মতো ঘর-সংসারের পরিকল্পনা কবর পুঁতে বের হতে হয়েছে। ভারতে দ্বিতীয় শতাব্দীতে বৌদ্ধ সন্ন্যাসিনীদের রচিত স্তোত্রের রান্নাঘর ছেড়ে সঙ্ঘে যোগদানের আনন্দ ও মুক্তির কথা বলা হয়েছে।

খোদ ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলকে বিয়ে করার বদলে সেবিকা পেশা গ্রহণের জন্য নিজ মা ও বোনের সাথে দীর্ঘ সংগ্রাম করতে হয়েছে। মাদার তেরেসাকেও তাই করতে হয়েছে। আজো বিভিন্ন পেশার উচ্চতম পর্যায়ে আসীন নারীদের অনেকেই (ওপার বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রাক্তন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিৎসা রাইস বা বাংলাদেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রিসিয়া বিউটেনিস), উপমহাদেশে সঙ্গীতের এ পর্যন্ত শ্রেষ্ঠতম নক্ষত্র লতা মঙ্গেশকরসহ যেকোনো পেশায় উচ্চতম অবস্থানে নারীরা অনেকেই অবিবাহিত। ব্যক্তিগতভাবে উন্নয়ন পেশায় দীর্ঘদিন থেকে দেখছি, এ পেশাতেও আজ বিশ্ব ব্যাংক, জাতিসঙ্ঘসহ নানা প্রতিষ্ঠানে সফল নারীদের অনেকের বয়স পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই হয়েও তারা অবিবাহিত। তারা নিশ্চিতভাবেই আর বিয়ে করবেন না।

একটি সফল ক্যারিয়ার বেছে নেবার প্রশ্নে মাঝে মাঝে বিবাহ বিচ্ছেদও দেখা যাচ্ছে। মহাশ্বেতা দেবী যেদিন থেকে লেখার প্রশ্নে পরিপূর্ণ আত্মনিয়োগ করেছেন, সেদিন থেকে বিবাহ বিচ্ছিন্ন। বিবাহ বিচ্ছিন্ন ছিলেন বাংলা সিনেমার কিংবদন্তী নায়িকা সুচিত্রা সেন। দেশ-বিদেশের রূপসী নায়িকাদের জীবন প্রায় ক্ষেত্রেই মর্মন্তুদ। ভারতের ভানু রেখা গণেশন বিবাহিত নায়ক অমিতাভ বচ্চনের সাথে প্রণয় সম্পর্কে জড়িয়ে পরবর্তী সময়ে প্রতারিত হয়ে অন্য একজনকে বিয়ে করেও সুখী হননি। তাঁর স্বামী আত্মহত্যা করেন এবং তিনি বাকি জীবনটি একা ও বিবাহ বিচ্ছিন্ন কাটান। শ্রীদেবীও বিবাহিত নায়ক মিঠুনের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে প্রতারিত হোন ও পরে বয়সে অনেক সিনিয়র এক প্রযোজককে ‘হিসেব-নিকেশে’র বিয়ে করেন। রাভিনা ট্যান্ডন, বিপাশা বসু, প্রীতি জিনতাসহ অনেকেই তাদের সতীর্থ নায়ক ও ছেলে বন্ধুদের দ্বারা প্রতারিত হয়েছেন। পুরনো দিনের বলিউড সিনেমায় মীনা কুমারী বা মধুবালাদের মত অনিন্দ্য সুন্দরী নায়িকাদের জীবন ছিল আরো কষ্টের।

আবার ‘সুখী’ জীবনের জন্য সত্তরের দশকের নিতু সিং বা সাম্প্রতিক সময়ের কাজল, কারিশমা কাপুররা কেরিয়ার ছেড়ে দিয়েছেন। কেউ ‘সুখী’ হতে পেরেছেন, কেউ হন নি। অতি সম্প্রতি বিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন আমার কিশোরী বয়সের স্বপ্ন প্রতিমা মাধুরী দীক্ষিত শুধু যার সিনেমা দেখে আমি হিন্দি বলা রপ্ত করতে পেরেছিলাম।

হলিউডের অবস্থা আরো খারাপ। মেরিলিন মনরোর মত সৌন্দর্যের প্রতিমা জন কেনেডির সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে সিআইএ-এর হাতে খুন হয়েছেন বলে জনশ্রুতি আছে। আমাদের বাংলাদেশে টেবিল টেনিসে গিনেস বুক রেকর্ডধারী জোবেরা রহমান লিনু চিরকুমারী থেকে গেলেন। ববিতার সাথে জাফর ইকবালের মধুর সম্পর্কের গুঞ্জন শোনা গেলেও সম্পর্কের বীজ ছায়াদায়ী তরুতে আত্মপ্রকাশ করেনি। দু’জনেই জীবন কাটিয়েছেন দু’ভাবে। একটি অসুখী বিয়ের মাধ্যমে ক্যারিয়ারে দ্রুত পরিসমাপ্তি, বিবাহ বিচ্ছিন্নতা নেমে এসেছে ববিতার জীবনে। জাফর ইকবাল জীবন শেষ করেছেন অতি পানাসক্তিতে।

বাংলায় একটি প্রবাদ আছে: ‘অতি বড় সুন্দরী না পায় বর/ অতি বড় ঘরণী না পায় ঘর।’ কেন পৃথিবীর নায়িকা, গায়িকা, নারী লেখক সহ অধিকাংশ প্রতিভাময়ী নারীদের জীবন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অসুখী? কিম্বা তাদের ভেতর প্রায়ই ‘অপ্রাপণীয়’ (যাকে পাওয়া যায় না যেমন নিকটাত্মীয় বা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিবাহিত) পুরুষের প্রতি আকর্ষণ বোধ এবং সেখান থেকে উদ্ভুত জটিলতা দেখা যায় কেন? এর সুন্দর ব্যখ্যা দিয়েছেন সিমন দ্য বেভোয়া তাঁর ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’ গ্রন্থে।

প্রতিভাময়ী নারী যেহেতু আর দশটি সাধারণ নারীর মত শুধু একটি গৃহকোণের স্বপ্নই দেখে না…একজন প্রতিভাবান পুরুষেরই মতো তারও ইচ্ছে করে মহাবিশ্বে আত্মপ্রকাশের, একজন সাধারণ নারীর তুলনায় তাকে অনেকগুলো বছর বেশি দিতে হয় পেশায় বা নেশায়। কেরিয়ার বা সৃজনশীলতায় (গান, নৃত্য, চারুকলা, সাহিত্য বা বিজ্ঞান)। এই প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকায় নারীর জন্য আজো পৃথিবীর সব দেশেই পুরুষের তুলনায় অনেক সীমিত ‘বিয়ের বয়স’ পার হয়ে যায়। একটু গুছিয়ে নেবার পর সে যখন ব্যক্তি জীবন নিয়ে ভাবার অবকাশ পায়, তখন তার সমসাময়িক পুরুষেরা প্রায়ই বিবাহিত। এছাড়াও সত্যিকার অর্থে নিজের সৃজনশীলতায় মগ্ন নারীরা আসলে কোথাও বাঁধা পড়তেও চান না। কিছুটা দু:খবিলাসী হয়েই তারা বারবার ‘অপ্রাপণীয়’ কাউকে ভালবাসেন। তারা জানেন ঐ ‘অপ্রাপণীয়’ শেষপর্যন্ত নিজেই কাছে আসতে পারবে না। একধরনের বিরহ মধুরতায় আক্রান্ত সৃজনশীল নারী আরো বেশি মগ্ন হন ছবি আঁকা, কবিতা লেখা বা গান গাওয়ায়। এছাড়া সাহিত্য, সঙ্গীত, খেলা বা সিনেমার জগতের (অফিস বা কর্পোরেট জগতেও) আজো পুরুষই ক্ষমতার অধিকারী। এই ক্ষমতার খেলার জঘন্য বলি হতে হয় নারীকে।

মেয়েরা মূলত: তিন ভাগে রিএ্যাক্ট করেন। প্রতিভাময়ী কিন্তু ক্ষমতাবানকে তুষ্ট করছেন না। দাঁতে দাঁত চেপে স্ট্রাগল করে চলেন। হয়তো তার চেয়ে অনেক কম ক্ষমতার কেউ ক্ষমতাবানকে তুষ্ট করে দ্রুত উঠে যান। তবে শেষপর্যন্ত টিকে থাকা যায়। অনেক রক্তাক্ততা, অনেক অপমান সইতে হয়। অল্প প্রতিভা কিন্তু সন্তোষ বিধান করছেন। না, বেশিদিন টেকা যায় না। প্রতিভা ও সন্তোষ বিধান দুটোই আছে চরিত্রে।

গ্র্যান্ড সেলিব্রিটি। সিনেমায় নি:সন্দেহে এই অপক্ষমতার চর্চা সবচেয়ে বেশি। পেশাগত জগতে অনেক মেয়েকেই অনেক সময়েই ঘন ঘন চাকরি ছাড়তে হয়। এই যে কখনো পেশা আর কখনও সৃজনশীলতায় ক্ষমতাবানের হাতে নিষ্ঠুর ব্যবহার হওয়াও একজন নারীর ব্যক্তি জীবনকে তছনছ করে দিতে পারে। কিম্বা কোনো নারী নিজেকে ব্যবহৃত হতে দিলেন না। সেই শিল্পের ক্ষমতাবান পুরুষেরা দিনের পর দিন তাকে ‘আত্মপ্রকাশে’র সুযোগ না দিয়ে, তাকে নিষ্ঠুর ব্যঙ্গ-উপহাস-আক্রমণ ও (পেশাগত জগতে প্রমোশন না দিয়ে, যৌন হয়রানি আচরণ বা কোন রিটার্ন না পেলে স্থানবিশেষে কর্মচ্যূতি) তার এক-দশমাংশ ক্ষমতার সতীর্থ নারীটিকে অনেক বেশি বিকশিত হবার সুযোগ দিয়ে একরকম পাগল বানিয়ে ফেলা হয়। এসবই তার ব্যক্তি জীবনে প্রবল মর্মপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আমার নিজের ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ থেকে মনে হয় ‘খ্যাতি’ বা ‘লাইম লাইট’ পাবার আগেই মেয়েদের বিয়ে করে ফেলা উচিত বা বিয়ের পর ‘খ্যাতি’ পেলে ভালো। ত্রিশের পর খ্যাতি আসা ভালো। কারণ ততদিনে বিয়ে হয়েই যায়। আর সেক্ষেত্রে বিবাহ বিচ্ছেদের সম্ভাবনা থাকলেও লাড্ডু খেয়ে বমিটা হয়। কিন্তু কোনো মেয়ে যদি পঁচিশের ভেতরই ‘খ্যাতি’ পেয়ে যায়, তবে তার জন্য বিয়ে করাটা একটা কঠিন ব্যপারই বটে। লাড্ডু আর এ জীবনে খাওয়া হয় না।

জানতে চান কেন? একজন ‘খ্যাতিময়ী’ নারীর সুন্দরী হবার দরকার নেই। শুধু যদি তিনি নিদারুণ কদর্য চেহারার অধিকারী না হন, হন পঁচিশের এক তরুণী ও একাকী তবে তার পেছনে এত পুরুষ গিজগিজ করে যে প্রথমত: তার জন্য ‘কাকে রেখে কাকে বাছি’ জাতীয় বিড়ম্বনা দেখা যেতে পারে। এর ভেতরই ধরা যাক ক্ষমতাবান বা প্রতিষ্ঠিত কারো বদলে খ্যাতিময়ী তার প্রথম যৌবনেই খুব সাদাসিধে এমনকি বেকার কোন ছেলেকে ভালবেসে ফেললেন। সব ক্ষমতাবানকে পাশ থেকে হঠিয়ে দিলেন তিনি।

দেখা যাবে ছেলেটিই খ্যাতিময়ীর পাশে আসতে ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে ভুগছে। কিম্বা কেউ কেউ এমনি ঈর্ষাকাতর ও সন্দেহ প্রবণ আচরণ শুরু করেন যে ন্যুনতম আত্মবিশ্বাস সম্পন্ন কোন মেয়ের পক্ষে এর পরে সম্পর্কটা চালানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আমার জীবনে যখনি কোন সম্পর্ক ‘বন্ধুত্বের থেকে অল্প বেশি’ হতে গেছে, তখনি ওপক্ষের সন্দেহ, পুলিশী নজরদারি সব মিলিয়ে…ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি! দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল আমার সারা জীবন ঢের বেশি ভাল লাগে। কোনো কোনো মেয়ে প্রেমে ‘পজেসিভনেস’ পছন্দ করলেও আমার এতে দমবন্ধ হয়ে আসে।

আমি অদ্ভুত প্রকৃতির মানুষ কিনা জানি না…আমি জীবনে যখনি কোন ছেলেকে একটু হলেও পছন্দ করেছি, তাকে অন্য মেয়ের সাথে গল্প করতে বা হাসতে দেখে আমি জ্বলিনি। এতে করে সেই ছেলেদের মনে হয়েছে, আমি তাদের ‘ভালবাসি না।’ তারা অপেক্ষাকৃত ঈর্ষাকাতর মেয়েদের সত্যিকারের প্রেমিকা ভেবে আমাকে বিদায় জানিয়েছে। কিন্তু ভালবাসায় ঈর্ষা আর সন্দেহ কেন থাকবে? বিশ্বাস থাকাই তো উচিত।

সব মিলিয়ে গোটা পৃথিবীর ইতিহাসেই খ্যাতিময়ীদের ব্যক্তি জীবন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অসুখী। আবার উল্টোটাও হয়। শুধুই ‘প্রেমিকা’ বা ‘বধূ’ হিসেবে জীবনের অর্থ খুঁজতে চেয়েছিল এমন একাধিক মেয়েকে দেখেছি সম্পর্কে বিনা দোষে ব্রেক আপ হবার পর কাজ বা সৃষ্টিশীলতাকে একটু বিলম্বে হলেও আঁকড়ে ধরতে।

সতেরো বছরের প্রেমিককে বিয়ে করতে পারেননি জার্মান সমাজতন্ত্রী নেত্রী রোজা ল্যুক্সেমবার্গ। কিন্তু সেই ব্রেক-আপ তাঁর জীবনের সম্মুখমানতায় এতটুকু বিঘ্ন ঘটায়নি। আরো কাজ করেছেন, নতুন প্রেমে পড়েছেন। মার্কিন নারীবাদী অড্রিয়েন রিচ রোজার জীবনের এই দিকটি নিয়ে বলতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘একজন শক্তিশালী নারীর চরিত্রের প্রকাশ কত দ্রুততা আর দৃঢ়তার সাথে তারা একটি ব্রেক-আপ সামলে উঠেন তা’ দিয়ে।’ সম্পূর্ণ সহমত অড্রিয়েন রিচ।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.