সেই আমি আর আজকের আমি

Ishrat
ইশরাত জাহান

ইশরাত জাহান: আমি বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করে কি করবো ভাবছিলাম। চাকুরীর চেষ্টা তদবিরও করছিলাম । কি সরকারি, কি বেসরকারি, এমন কোন বাছ বিচার ছিল না তখন। কারণ জীবনকে অত সিরিয়াসলি তখনও দেখতে শিখিনি। শুধু ভাবতাম স্বাধীনভাবে নিজের পায়ে দাঁড়াবো এবং অন্যের গলগ্রহ হয়ে থাকবো না। এদিকে বাবা তখন চাকুরী থেকে অবসর নিলেন। ফলে কিছু একটা করার তাগিদ আরও বেশী করে অনুভব করতে শুরু করলাম।

এমন সময় একটি বেসরকারী কলেজে শিক্ষকতার সুযোগ পেয়ে গেলাম। মনে মনে ভাবলাম শিক্ষকতা হল মহান পেশা যার সাহায্যে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিক্ষিত করে তুলবো এবং সৃষ্টির আনন্দে নিজের জীবন পাল্টে দেব। যদিও সেই সময় এটি মেয়েদের জন্য সম্মানের কাজ ছিল। প্রায় তিন বছর কাজ করার পর আমি উপলব্ধি করলাম এই কাজ আমার জন্য নয়। কারণ আমি এ কাজে কোন বৈচিত্র্য খুঁজে পাচ্ছিলাম না, আনন্দতো নয়ই। বড় একঘেয়েমি জীবন মনে হচ্ছিলো।

যে ব্রত নিয়ে, যে উচ্ছ্বাস নিয়ে শিক্ষক হয়েছিলাম বাস্তবতা ঠিক অন্যরকম। জ্ঞান বিতরণের আর অর্জনের যে নৈতিক দায় তার ছিটেফোঁটাও খুঁজে পাচ্ছিলাম না কাজটিতে। আবার ভাবতে শুরু করলাম আমার বৈচিত্র্যময়, গতিশীল, সৃজনশীল কাজ প্রয়োজন যার মাধ্যমে আমি নিজেকে ফুটিয়ে তুলতে পারব। ঠিক এমন সময় ১৯৯৯ এর শেষের দিকে আমার বড় দুলাভাই যিনি আমাদের বাবা মারা যাওয়ার পর পুরো পরিবারের দায়িত্ব নেন, আইটি ব্যবসা শুরু করেন। তিনি আমাকে প্রস্তাব দিলেন এই কাজের সাথে জড়িত হওয়ার জন্য। তখনও আমাদের দেশে অফিস আদালতে কম্পিউটার এর ব্যবহার উল্লেখযোগ্য ভাবে শুরু হয়নি। বাসা বাড়িতে কেউ কেউ ব্যাক্তিগত ভাবে কম্পিউটার ব্যবহার করতেন। কম্পিউটার সম্পর্কে আমার কোন প্রাথমিক জ্ঞান পর্যন্ত ছিল না। তাই খুব বেশী আত্মবিশ্বাসী হতে পারছিলাম না। তারপরও মনে মনে ঠিক করলাম যেহেতু এটা একটি পারিবারিক ব্যবসা এবং আমি চেষ্টা করলেই পারবো। আপা ও ভাইয়া দু’জনেই আমাকে মানসিকভাবে অনেক সাহস দিলেন এবং এক পর্যায়ে আমি রাজি হয়ে গেলাম।

ছোটবেলা থেকেই আমি বেশ জেদী স্বভাবের মেয়ে এবং যে কোন চ্যালেঞ্জ নিতে আমি বেশ স্বচ্ছন্দবোধ করি।  তাই ভাবনা চিন্তা বাদ দিয়ে ঠিক করলাম কম্পিউটারের ব্যবসার সাথেই যুক্ত হবো। কিছুটা উত্তেজনাও কাজ করছিল। কারণ তখন এটি খুবই সম্মানজনক ব্যাবসা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। কম্পিউটার নিয়ে মানুষের মাঝে তখন বিস্তর মাতামাতি। কম্পিউটার তখন অন্যতম জ্ঞানবিজ্ঞান সম্বলিত সৃজনশীল একটি ব্যবসা।

শুরু হল আমার কর্মজীবনের দ্বিতীয় ইনিংস। শুরুটা হয়েছিল একেবারেই নতুন এবং শূন্য থেকে।

ভাইয়া আমাকে কম্পিউটারের বেসিক কোর্সে ভর্তি করে দিলেন। আমি শিখতে শুরু করলাম কিভাবে কম্পিউটার চালু করতে হয় এবং কিভাবে বন্ধ করতে হয়। প্রতিদিনই আমি নতুন নতুন কাজ শিখতাম, নতুন নতুন তথ্য জানতাম। তখন আমি ভাইয়ার অফিসে (আজকের Rishit Computers ) এ আসা যাওয়া শুরু করলাম। সেলস এর কাজ দিয়েই ব্যবসার হাতে খড়ি। নানান ধরনের মানুষ আসতো কেনাকাটার জন্য। তাঁদের চাহিদা জেনে প্রায় এক/দেড় ঘন্টা সময় লাগতো একটা কম্পিউটার বিক্রি করতে। শুরু হলো এই কাজে আমার আনন্দ পাওয়া। কিন্তু মার্কেট থেকে প্রোডাক্ট খুঁজে সব এসেম্বেল করতে অনেক সময় চলে যেত। আমরা তখনও ছোট কোম্পানি, ৩০০ বর্গফুটের ছোট্ট একটা শো-রুম। আমরা তিন /চার জন প্রতি দিন সকাল নয়টা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত থাকতাম।

অল্প সময়েই বুঝে গিয়েছিলাম যে ক্রেতার সন্তুষ্টি সবচেয়ে বড় বিষয়। তাই আমরা খুবই আন্তরিক পণ্যের গুণগত মানে এবং সেবা প্রদানে। ফলে অনেক প্রতিযোগিতার মধেও আমরা বেশ সুনাম অর্জন করতে থাকলাম। আমি যেহেতু সেলস এ কাজ করতাম তাই প্রোডাক্ট গুছানো থেকে শুরু করে পণ্য সম্পর্কে ধারণা এবং কাস্টমার কন্সালটেন্সি সবই আমাকে নতুন করে শিখতে হয়েছে। শেখার জন্য আমাকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। কাজের চাপ এতোটাই ছিল যে দুপুরে আমরা খাওয়ার কথা ভুলে যেতাম। কখনো কোন কাজকে ছোট মনে হয়নি। সত্যিকারের শ্রমের মর্যাদা আমাদের কাজে ছিল।

কাজের ক্ষেত্রে কখনো কখনো কোন সমস্যায় পড়িনি এমন নয়।  যেহেতু সেলসে কাজ করি ফলে নানান ধরনের মানুষের সাথে কাজ করতে হয়তো। মেয়ে হিসেবে বিভিন্ন আকার ইঙ্গিত, অঙ্গভঙ্গি, খারাপভাবে তাকানো এসব অনেক কিছুর সম্মুখীন হতে হতো। কিন্তু এসবই মোকাবেলা করেছি নিজের বুদ্ধি দিয়ে। আমার অভিজ্ঞতাগুলোকে কাজে লাগিয়ে পরবর্তীতে আমি আমার কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সবার সমান মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি।

আমি কখনও সমাজের দৃষ্টিতে নিজেকে নতজানু রাখতাম না বরং নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে সমাজকে পাল্টানোর  চেষ্টাই করেছি। কারণ আমি মনে করেছি সমাজ যে দৃষ্টি দিয়ে মেয়েদের এখনও দেখতে চায় সে দৃষ্টিতে চললে নারী জাগরণ, নারী স্বাধীনতা, নারী প্রগতি আর স্বাবলম্বী হওয়া সম্ভব না।

ধীরে ধীরে আমাদের ব্যবসার উন্নতি হতে শুরু করল। আর আমারও পায়ের নীচের মাটি শক্ত হলো। ১৯৯৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ডেক্সটপ কম্পিউটারের পাশাপাশি ল্যাপটপ এবং কম্পিউটার সংক্রান্ত তথ্য প্রযুক্তি সব কিছু মিলিয়েই জীবনটা পাল্টে গেছে অনেক। এরপর সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণাও আমাদের অনেক উৎসাহিত করেছে। যতো দিন যাচ্ছে ততোই জ্ঞান, চিন্তা এবং প্রযুক্ত সম্পর্কে জ্ঞান বাড়ছে, বাড়ছে ব্যবসা করার প্রাচীন ধ্যান-ধারণার পরিবর্তন করে নিত্য নতুন ভাবনা।

২০০৬ সালে আমাদের কোম্পানি লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত হলো আমাকে শেয়ার হোল্ডার Director হিসেবে বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করা হলো। আরেকটা সলিউশান প্রভাইডার কোম্পানি হলো, সেখানেও শেয়ার হোল্ডার Director হিসেবে কাজ করছি। কোম্পানি আমার উপর আস্থা রাখতে শুরু করলো, আমারও ক্রমান্বয়ে অফিসে দায়িত্ব বাড়তে থাকলো। এখন আমি একক সিদ্ধান্ত নিতে পারি, ব্যবসার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে ভয় পাই না। পরিকল্পনা এবং পরিচালনা করা এখন আমার কাছে অনেক সহজ। কারণ আমি আমার জায়গা থেকে সব সময় চেষ্টা করেছি নিষ্ঠার সাথে, সততার সাথে দায়িত্ব পালন করতে। আজ প্রায় ১৪ বছর কাজ করে যে জায়গায় এসেছি শুধু মাত্র নিজের একার চেষ্টায় তা বললে ভুল হবে। আমি বলবো এ যাবত যারা আমার সাথে কাজ করেছে তাদের সহযোগিতা ছিল, আমার পরিবারের বিশাল সমর্থন ছিল এবং সর্বাত্মকভাবে যিনি আমাকে আজকের আমি হতে সাহায্য করেছেন তিনি আমার ভাইয়া, যিনি বর্তমানে কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর। উনি আমাকে শেখাননি “মেয়ে হয়ে জন্মেছি বলে সেইভাবেই জীবন-যাপন করতে হবে, সমাজের সমস্ত অন্যায় মেনে নিয়ে মাথা নত করে থাকতে হবে”।

আজ ২০১৫ এ এসে শক্তভাবে দাঁড়ালে টের পাই আমার পায়ের নিচের মাটি কতোটা শক্ত হয়েছে। কতটুকু অর্জন করতে পেরেছি জানি না, তবে সাহসের সাথে দাঁড়িয়েছি এবং যে কোন দুর্যোগে ভেঙ্গে না পড়ে শক্তিশালী একজন মানুষ হতে পেরেছি। আর কিছু না হোক এইটুকু বলতে পারি “ আমি ভালো আছি”।

একটা মেয়ের সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর জন্য সবার আগে প্রয়োজন শিক্ষা, মানসিক শক্তি, ব্যাক্তিত্ব, কাজের একাগ্রতা, দক্ষতা, সর্বোপরি পরিবারের সহযোগিতা। যেটা আমি নিজেকে দিয়ে বুঝতে পারি। তবে সমাজের পশ্চাতপদতা ও সামাজিক বৈষম্য নারীকে সামনে যেতে বাধাগ্রস্ত করে, আমাকে কষ্ট দেয়। তবুও বলব সাহস করে এগুতেই হবে। কোন রকম সামাজিক, পারিবারিক সংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামির কাছে মাথা নত নয়- এগিয়ে যাও নারী তবেই জীবন হবে সুস্থ, সুন্দর,মুক্ত স্বাধীন এবং মর্যাদাশীল।

জয় নারী……। জয় হোক নারীর……। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের শুভেচ্ছা।।

 

ডাইরেক্টর, ঋসিত রাফা কম্পিউটার

আইডিবি ভবন

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.