নারীবাদী পুরুষেরা আর তাদের বোধ

Feminism 2তামান্না কদর: নারীবাদ আজ খুবই আলোচিত বিষয়। নারীবাদ নিয়ে লিখে থাকেন নারী, পুরুষ উভয়েই। নারী নারীর পক্ষে কথা বলবে, বলা উচিত। নিজের প্রাপ্তি নিজে না ঘটালে অন্য কে ঘটাবে আর? আর পুরুষেরা লিখবেন। কেন লিখবেন? লিখবেন এজন্যে যে, নারী হচ্ছে মানবজাতির কেন্দ্র, কেন্দ্রকে এভয়েড করে উন্নতি সম্ভব নয়। অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়। নারীকে তারা বহুকাল অত্যাচার করেছে, ঠকিয়েছে এখন তার মূল্য পরিশোধ করবে যে শুধু তাই নয়, মানুষ হবারও চেষ্টা করবে। লিখবে এজন্যে যে মানুষ মানুষের কথা বলবে, অধিকারের কথা বলবে, কিন্তু বাস্তব প্রেক্ষাপটে পুরুষেরা নারীদের হয়ে কথা বলে, কলাম লিখে, কেন?

একটু তলিয়ে দেখা উচিত। কেননা পুরুষ নারীর কল্যাণ চাইবে, নারীকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করবে এটি বিশ্বাস করতে আশঙ্কা হয়। আশঙ্কা না হয়ে উপায়ও নেই। দাদী, নানী, খালা, ফুফু, চাচী, মামী, বোন, মা এবং নিজের জীবন পর্যালোচনা করলে নিঃসন্দেহে বিশ্বাস করার কোন সুযোগ খুঁজে পাই না যে, পুরুষ যে সুবিধে পেয়েছে মানব সমাজে, সেই সুবিধে নারীরা পাক- এটা তারা চায়।

তাই সন্দেহ করতে চাই। প্রত্যেক নারীকে বলি এবং প্রকৃত পুরুষ যারা মানুষ হতে পেরেছেন তাদেরকেও বলি সন্দেহ করুন, যাচাই করুন। বিনা প্রশ্নে গ্রহণযোগ্য নয় কোনও নারীবাদী পুরুষ।

অনেকে ’নারীবাদ’কে মানবতাবাদ বলেই উল্লেখ করেন। আমি ভিন্নমত ব্যক্ত করি। ’নারীবাদ’ নারীবাদই। এর কোন বিকল্প নেই। নারী শোষিত হয় দ্বিমুখী। সেক্ষেত্রে ’নারীবাদ’ শব্দকে মানবতাবাদ দিয়ে ঢেকে মূলত নারীবাদের বিলুপ্তি ঘটাবার প্রয়াস অথবা হতে পারে কেউ কেউ একে কৌশল হিসেবে নিয়ে নারীবাদকে আড়াল করতে সচেষ্ট হতে চাইছে। অনেকে ’নারীবাদ’ শব্দটি বলতে সঙ্কোচ বোধ করে বলেন- ’মানবতাবাদ’। তারা লজ্জায় মরে গিয়ে মাটির সাথে মিশে যেতে যেতে সংকুচিত হয়ে গিয়ে ’মানবতাবাদ’ বলেন। তারা কি আসলেই লজ্জিতবোধ করেন? তারা কি লজ্জিতবোধ করেন এই ভেবে যে, নারীর প্রাপ্য বিষয়গুলি লজ্জার? ’নারীবাদ’, একে অন্য কোন শব্দ দিয়ে ঢেকে দিলে নারীবাদের অকল্যান হবে, নারীর অকল্যান হবে।

হুমায়ুন আজাদ ’নারী’ নামে যে গ্রন্থটি লিখেছেন তা অসাধারণ কেননা নারীকে, নারীবাদকে বুঝবার জন্যে এ এক অনন্য লেখা এবং নারীর শত্রু-মিত্র চেনার প্রেক্ষাপট, অতীত ব্যক্তিত্বগুলি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন। যদিও রেফারেন্স বই এটি তবু অসাধারণ। কেননা এতে লিখার বৈচিত্র্যও রয়েছে। আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি বাক্য নির্মাণে, ভাষা দক্ষতায় এমন আরেকজন লেখক পেতে বাঙালি জাতির আরও হয়তো ২০০ বছর সময় লাগবে কিন্তু যদি প্রশ্ন করি হুমায়ুন আজাদ নারীর শত্রু ছিলেন নাকি মিত্র ছিলেন?

যারা তার ব্যক্তিগত সান্নিধ্যে বিশেষত নারীরা এবং আরও বেশী বলতে পারবেন তিনি, যে নারীর সাথে তিনি নিত্য বাস করতেন। কতোটা ছিলেন তিনি নারীবান্ধব? নারীকে পুলকে পুলকে অভিভূত করতে পারলেই যে পুরুষ নারীবান্ধব হয়ে যায় না। নারীকে কি তিনি মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতেন, নাকি যোনী, পণ্য এমনই মনে করতেন?

করতেন। তিনি ব্যক্তিজীবনে নারীবাদ বিশ্বাস করতেন না, পালনও করতেন না। ব্যক্তিগতভাবে তার সাথে আমার দেখা হওয়া, কথা হওয়া একই সাথে আমি সৌভাগ্য এবং দুভার্গ্য দুটোই মনে করি। একটা উদাহরণ দিলে খানিকটা পরিস্কার হবে তিনি কতোটা প্রথার বাইরে যেতে পেরেছিলেন, সবাই তো তাকে প্রথার বাইরে বলেই জানি। তার প্রতিটি সন্তানের নামের পেছনে তার নিজের নামের শেষাংস জুড়ে দিয়েছেন। আমি খুব গভীরভাবে বিশ্বাস করি যে মানুষ যা বলবে তা তার বিশ্বাস থেকেই বলবে এবং ব্যক্তিজীবনেও পালন করবে। প্রথাবিরোধিতা, নারীবাদ কেবল মুখে বলা বা কাগজে বলার বিষয় নয়, ব্যক্তিজীবনে ঘর থেকে সমগ্র পৃথিবী পর্যন্ত এটি পালনীয় বিষয়।

এমন অনেক উদাহরণ আছে। তাদের নাম নিলে প্রায়  ‘ঠগ বাছতে গা উজার’ এর মতো অবস্থা হবে।

নারীবাদ খুব যায় এখন বাজারে, প্রচুর পয়সাও জোটে, প্রসংশাও জোটে এমন একটি ধারণা থেকে কিছু পুরুষ নারীবাদী হয়ে যায়। ভেতরে সে মূলত কামুক পুরুষতান্ত্রিক পুরুষ। প্রগতিশীল হওয়া এখন ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে, তাই কেউ কেউ, কোন কোন পুরুষ নারীবাদী হয়ে ওঠে আর ঘরে এসে তার সাথে নিত্য বাস করা নারীকে বলে- ”মুক্তবুদ্ধি চর্চা সব জায়গায় চলে না।”

হ্যাঁ চলেই না তো, বউ যখন মানুষের মতো জীবন যাপন করতে চাইবে, পুরুষ সঙ্গীটির তখন নানাবিধ সুবিধে হ্রাস পায়, পরিশ্রম বাড়ে। তবে পুরুষদের বান্ধবীর বেলায় এবং অন্য নারীর বেলায় নারীবাদী হলে প্রশংসা জোটে। অন্যসব নারীরা ভাবে- ”আহা! এ যদি আমার বর হতো তাহলে জীবন কতোই না আনন্দের হতো। আহা! একবার তলায় ঘুরে এসেই দেখুন না নারীবাদী পুরুষের স্ত্রীরা কতো আনন্দেই না বেঁচে আছেন। যদি কোন নারী প্রকৃত নারীবাদী পুরুষকে সঙ্গী হিসেবে পেয়ে থাকেন, তার সংখ্যাও আঙ্গুলে গোনার মতো। আর সেই আঙ্গুলে গোনার মতো প্রকৃত নারীবাদী পুরুষদের প্রতি আমার আন্তরিক অভিনন্দন, শ্রদ্ধা।

নারীবাদী পুরুষের বেশীর ভাগই মুখোশ পরে থাকেন। সময় সুযোগ পেলে সেই মুখোশ খুলে কেবলি শিশ্নধারী পুরুষ হয়ে ওঠে। এরা আসলে কী চায়? এইসব পুরুষেরা নারীদের ঘর থেকে বের করে আনে সুন্দর সুন্দর উদার কথা বলে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করবে বলে নয়, নারীকে, নারীর শরীর অন্য স্বাদের আনন্দে মাতিয়ে তোলার জন্যে। নারীকে বের করে স্বাধীনতার কথা বলে তা নারীর কল্যানের জন্যে নয়, পুরুষ তার বিকৃত কামবাসনা চরিতার্থ করার জন্যে। নারীকে করে তোলে ক্রমশঃ পণ্য। কেননা এমনতর নারীবাদী পুরুষের মননেমগজে নারীবাদ বলে কোন বিষয়ের অস্তিত্বই নেই। এদের মগজে আছে শুধু নারীর শরীর। এরা এমন সব সুন্দর সুন্দর কথা বলে যে——।

এরা বোঝাতে চায় যে, দ্রোহী এবং প্রথাবিরোধী হতে হলে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। আমি বলি, কোথায় বেরিয়ে আসবে নারী? বেরুবার আগে অবশ্যই নিশ্চিত হওয়া জরুরি, তার মানুষ হিসেবে মূল্য পাবার বিষয়টি। সাথে আত্মবিশ্বাস এবং আত্মনির্ভরতাও বিষয়টিও ভাবতে হবে নারীর।

এইসব মুখোশধারী পুরুষেরা বোঝাতে চায় যে, যৌন স্বাধীনতা যেহেতু নারীবাদের একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় তাই এখানে স্বাধীনতা ভোগ করতে হবে এবং তা চাইলে তাদের অর্থাৎ পুরুষের কাছে যেতে হবে, জড়িয়ে ধরতে হবে, তীব্র চুম্বন করতে হবে, তারপর আর কিছু বলবার বা চাইবার দরকার হবে না, জৈবিক তাগিদেই নারী খুলতে থাকবে নিজকে। এইসব পুরুষেরা এমনসব ভাষার কারুকাজ প্রয়োগ করে যে, টিনএজাররা তো বটেই প্রাপ্তবয়স্ক নারীও নারীবাদের ভুল পুরুষের ভুল ব্যাখ্যার ফাঁদে পা দিয়ে দিতে পারে। এইসব নারীবাদী পুরুষেরা জৈবিক চাহিদা পূরণের পর সংশ্লিষ্ট নারীকে আর চিনবারই প্রয়োজন বোধ করে না, এমনকি নষ্ট মেয়ে বলতেও ছাড়ে না। অসহায় নারীর মাথায় তখন যেন বজ্রপাত হয়। কি সে ভেবেছিল পুরুষটিকে আর কি প্রমাণ পেল! অসহায় নারী তখন কাঁদে, নিজের মাথার চুল ছিঁড়ে। কখনো সখনো আত্মঘাতীও হয়ে ওঠে।

এইসব কথা কে বলবে, কে বোঝাবে মেয়েদের? মূলতঃ মায়েদেরই দায়িত্ব পুরুষ, পুরুষতন্ত্র, পৌরুষ সম্পর্কে মেয়েদের সচেতন করে তোলা কিন্তু পরিবারগুলোতে ঘটে উল্টোটি। এইসব জানার বিষয়কে নিষিদ্ধ বিষয় হিসেবে আড়াল করেন। ’বিয়ে’ যেখানে নারীকে সবচে বেশী বিপদে ফেলে দিয়েছে সেই বিয়ের মন্ত্রই পড়তে থাকেন মেয়ের কানে, মেয়েকে গড়ে তুলতে থাকেন উপযুক্ত গৃহবধু হিসেবে।

বড় দুঃখ হয় যখন নারীবাদী নারীও তার নিজের মেয়ের বেলায় উপরোক্ত আচরণটি করেন। আমি জানি এমনটি তারা করেন। করেন এজন্যে যে তিনি নারীবাদী হয়ে দেখেছেন এ পথ খুবই অমসৃণ। বলি- অমসৃণ পথ হলেও চলতে দিন মেয়েকে কেননা এ পথ খুবই মর্যাদার, এখানে মানুষ হিসেবে লক্ষ্যে পৌঁছার সম্ভাবনা থাকে। আর মসুণ পথ তা সুখের হলেও হতে পারে কিন্তু সেখানে মানুষ হিসেবে জীবন যাপন করার দরজা খোলে না।

নারীবাদী পুরুষেরা আসলে কী চায়? তা বোধহয় আমরা প্রায় সবটাই বুঝে গেছি, এখন বোঝাতে হবে আমাদের উঠতি বয়সের মেয়েদের।

এভাবে যদি নারীবাদের জালটি ছড়িয়ে দিই আমাদের মেয়েদের দিকে, এমনকি ছেলেদের দিকের তাহলে শিশ্নসর্বস্ব নারীবাদী পুরূষেরা নারীর সামনে কিলবিলিয়ে দাঁড়াবারই সাহস দেখাবে না, শরীরকে পণ্য বানাবে তো দূরের কথা।

শরীরে শরীরে সম্পর্ক হবে স্বাভাবিক। হতেই হবে এমন নয়। হবার আগে, শরীরকে শরীর চিনবার আগে অন্য আরো অনেক বিষয় চিনবার প্রয়োজন রয়েছে। নইলে তা কেবলি পশুর যৌনাচারের মতো হবে।

আমাদের মেয়েরা, আমরা মেয়েরা পথ চলতে গিয়ে এইসব শিশ্নসর্বস্ব নারীবাদী পুরুষদের চিনে হতাশার কালো আবেগে মুষড়ে পড়ি। মুষড়ে পড়া মৃত্যুর সমান। এমন পুরুষ থাকবেই সমাজে তবু বলবো, পুরুষ নারীর ভালো চাইবেই, এমনটি না ভেবে, না পেয়ে হতাশ হওয়া অনুচিত। আগে দেখি, আমরা সকল নারী আত্মবিশ্লেষণ করি, নারী হিসেবে আমি, আমরা নিজেরা নিজেদের কতোটা কল্যাণ চাই, কতোটা যোগ্য করে তুলেছি, তুলছি নিজেদের, তারও আগে ভাবতে হবে আমরা কি নিজেদের নিজেরা মানুষ ভাবি কিনা? নিজকে নিজে মানুষ না ভাবলে নারীবাদী হওয়া অসম্ভব তা সে নারীর বেলায়ই হোক, হোক পুরুষের বেলায়ই। যে পুরুষ কেবলি শিশ্নসর্বস্ব পুরুষ সে তো নিজেই মানুষ নয়, অন্যকে মানুষ ভাববে কি করে?

নারীবাদী পুরুষেরা তার নিজের স্ত্রীদের কাছে খুব সাধু সেজে থাকে, থাকার চেষ্টা করে সবসময়। হয়তো খুব বোকাসোকা কিছু মেয়ে তাদের স্বামী নামক পুরুষকে সাধু ভেবে সেবা করেন, ধ্যান করেন কিন্তু আমি জানি, আমরা জানি- একটু সচেতন মেয়েই নিরবে, নিভৃতে প্রতি রাতে কাঁদে, যদিও তার বুক এতে হালকা হয় না। পুতুলের জীবন নিয়ে কেউ সুখী হয় এ আমি বিশ্বাস করি না।

শেয়ার করুন:
  • 24
  •  
  •  
  •  
  •  
    24
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.