‘ভারত কন্যা’ বনাম ‘পুরুষতন্ত্রের তৈরি ধর্ষকামিতা ও সহিংস বলপ্রয়োগের মনস্তত্ত্ব’

Delhi Rapeরিয়াজুল হক: আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে সামনে রেখে লেসলি উডউইন বিবিসির হয়ে নির্মাণ করেছেন ‘ভারত কন্যা’ শীর্ষক একটি প্রামাণ্যচিত্র। এ প্রামাণ্যচিত্রে মুকেশ সিং নামের এক আসামির একটি সাক্ষাৎকার রয়েছে। ২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর রাতে ভারতের রাজধানী দিল্লির একটি চলন্ত বাসে চার সঙ্গীকে নিয়ে তরুণী ‘নির্ভয়া’কে ধর্ষণের ঘটনায় মুকেশ হলো প্রধান আসামি। এ ঘটনার পর বিচারিক প্রক্রিয়ায় ভারতের একটি আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছেন।

‘ভারত কন্যা’-য় মুকেশের সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ পাওয়ার পর ভারতজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়, প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ‘ভারত কন্যা’ ভারতে প্রচার নিষিদ্ধের দাবি ওঠে। যদিও ‘নির্ভয়া’-র বাবাসহ অনেকেই এর বিপরীতে ‘ভারতের কন্যা’ ভারতে প্রচারের পক্ষে মত দেন। ব্যাপক প্রতিবাদের প্রেক্ষিতে ভারত সরকার প্রামাণ্য চিত্রটির প্রদর্শন এবং প্রচার নিজ দেশের মাটিতে নিষিদ্ধ করেছে। তারা এই প্রামান্যচিত্রটি প্রচার না করার জন্য বিবিসিকেও অনুরোধ করেছে। বিবিসি ভারত সরকারের এই অনুরোধ অগ্রাহ্য করেছে। আলোচনা-সমালোচনা, প্রতিবাদ-ক্ষোভের সে ঢেউ বাংলাদেশকেও আঘাত করেছে।

আমি প্রথমে খবরের কাগজে এবং অনলাইন নিউজ পোর্টালে অভিযুক্ত ধর্ষক মুকেশের সাক্ষাৎকারের বিবরণটি পাঠ করি। গতকাল রাতে ইন্টারনেটে ইউটিউবে ‘ভারত কন্যা’-য় ধারণকৃত তার সাক্ষাৎকারটি শুনেছি।

‘ভারত কন্যা’-য় মুকেশ তার সাক্ষাৎকারে বলেছে-‘‘ভদ্রঘরের মেয়েরা রাত ন’টার পরে বাড়ির বাইরে থাকে না৷’’ মুকেশ মনে করে, রাত-বিরেতে ঘরের বাইরে গেলে মেয়েরা ধর্ষণের শিকার হবে– এটাই স্বাভাবিক৷ মৃত্যুর জন্য ‘নির্ভয়া’কে দায়ী করে ধর্ষণের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া মুকেশ বলেছে, ‘‘মেয়েটির ধর্ষণে বাধা দেয়া ঠিক হয় নি৷ ওর উচিত ছিল চুপ করে থেকে ধর্ষণে সহায়তা করা৷’’

মুকেশের এ সাক্ষাৎকারটি শুনে অনেক মানুষ হতবিহ্বল হয়ে পড়েছেন। অনেক মানুষ তাকে অমানুষ, বর্বর এবং সভ্য দুনিয়ার কলঙ্ক বলেছেন। অনেকে বলেছেন, মুকেশ একজন সাইকি। কিন্তু আমি মুকেশের সাক্ষাৎকারটি পড়ে এবং শুনে মোটেও অবাক হইনি। কারণ আমি নতুন কিছু শুনিনি। আমি সেইসব সামাজিক মিথ বা অতিকথা শুনেছি, যা চারদিকে হরহামেশা বলা হয় ব্যক্তিগত পরিসরে আলাপচারিতায়, আড্ডায়; জনপরিসরের আলোচনায়, সংলাপে, ধর্মীয় সভায়, গণমাধ্যমে, এমনকি নতুন যুগের সামাজিক দেওয়ালে। সাক্ষাৎকারে মুকেশ যা বলেছে, অধিকাংশ পুরুষ তাই বিশ্বাস করেন। শিক্ষিত বলুন, নিরক্ষর বলুন, গণতন্ত্রী বলুন, সমাজতন্ত্রী বলুন, ধার্মিক বলুন, সেক্যুলার বলুন, এমনকি নাস্তিক বলুন- বহু মানুষই মুকেশের বক্তব্য ধারণ ও লালন করেন। তা তাদের দেশ ভারত হোক, বাংলাদেশ হোক, পাকিস্তান হোক বা এ ভূমণ্ডলের অন্যকোনো দেশ হোক।

‘‘ভদ্রঘরের মেয়েরা রাত ন’টার পরে বাড়ির বাইরে থাকে না৷ এটি কি শুধু মুকেশের একার বয়ান? এটি কি আমাদের বাংলাদেশের বা ভারতীয় বা পাকিস্তানী সমাজের অধিকাংশ পুরুষের বয়ান নয়? মুকেশ মনে করে, রাত-বিরেতে ঘরের বাইরে গেলে মেয়েরা ধর্ষণের শিকার হবে। এটি কি শুধুমাত্র মুকেশ একা মনে করে, নাকি এপারের ও ওপারের- এ উপমহাদেশের বহু পুরুষ তা মনে করেন? সংখ্যাগরিষ্ঠ পুরুষ মন এই মিথ বলে ও প্রচার করে কি যথার্থতা দেয়ার চেষ্টা করে না যে- মেয়েরা ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয় তাদের ‘অশালীন-উচ্ছৃঙ্খল’ পোশাকের কারণে। অধিকাংশ পুরুষ মন ও দেহ  কি দেখে না, উপভোগ করে না নারীকে যৌনবস্তু ও সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র হিসেবে? আমাদের বা ভারতীয় সাহিত্য, চলচ্চিত্র, নাটক, গণমাধ্যম, বিজ্ঞাপন, সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান-প্রথা প্রতিনিয়ত কি নারীকে যৌনতার-ভোগের বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করে না? আর অধিকাংশ পুরুষের মন তা উপভোগ করে কি তৃপ্ত হয় না?

মুকেশ বলেছে, ‘‘মেয়েটির ধর্ষণে বাধা দেয়া ঠিক হয় নি৷ ওর উচিত ছিল চুপ করে থেকে ধর্ষণে সহায়তা করা৷’’ আমাদের সমাজের বিবাহিত পুরুষ কি ভাবেন না- আমার ‘স্ত্রী̒’ শুধুই আমার। সে আমার ব্যবহারের-ভোগের রক্তমাংসের বাকহীন এক নিরেট বস্তু। আমি যখন যৌনসঙ্গ চাইব, তখনই আমার  ‘দায়িত্বসম্পন্ন স্ত্রী’ তাতে সাড়া দিতে বাধ্য থাকবে। তাতে তার শরীরের সায় থাকুক বা না থাকুক, তার মনের বা আবেগের সায় থাকুক বা না থাকুক। এটি কি বাধাহীন ধর্ষণের একটি প্রকরণ নয়? এমন অভিজ্ঞতা কি লক্ষ লক্ষ্ বিবাহিত ‘নির্ভয়া’-দের হয় নি বা হচ্ছে না, আমাদের সমাজে বা ভারতীয় সমাজে বা পৃথিবীর অন্যকোনো সমাজে? সকল ‘নির্ভয়া’র কাহিনী কি ব্যক্তিগত পরিসর ছাপিয়ে জনপরিসরে আসে?

আসলে মুকেশ যা বলেছে, তা শুধু মুকেশের একার কথা নয়। এ কথা অধিকাংশ পুরুষের। আমাদের সমাজের বা ভারতীয় সমাজের বা অন্যকোনো সমাজের অধিকাংশ পুরুষের মনস্তত্বে, আচরণে ও বচনে ‘একজন মুকেশ’-এর বসবাস। কারণ, যে পুরুষতন্ত্র নারীর গোটা জীবন, জীবিকা, শ্রম, যৌনতা, শরীর ইত্যাদির ওপর আধিপত্য তৈরি করে, সেই পুরুষতন্ত্রই পুরুষের মাঝে ধর্ষকামিতার ও সহিংস বলপ্রয়োগের মনস্তত্ত্ব-আচরণ-বচন তৈরি করে। আবার সেই পুরুষতন্ত্রই ধর্ষণের-সহিংস বলপ্রয়োগের যথার্থতা প্রদানের মনস্তত্ত্ব এবং বয়ানও তৈরি করে। প্রকৃত পক্ষে মুকেশ পুরষতন্ত্রের তৈরি ধর্ষকামিতার ও সহিংস বল প্রয়োগের মনস্তত্ত্বের, আচরণের ও বচণের ধারক, বাহক ও সঞ্চালক, যেমনটি অন্যান্য পুরুষ। সামাজিকায়নের মধ্য দিয়ে তাই হয়ে ওঠে পুরুষের প্রধান মনস্তাত্ত্বিক প্রলক্ষণ, যার প্রতিফলন ঘটে জনপরিসরে বা ব্যক্তিপরিসরে নারীর প্রতি নানা ধরনের নিপীড়ন, যৌন নির্যাতন এবং সহিংস আচরণ-এ।

Mukesh-Singh_3216205b
মুকেশ সিং

মুকেশকে ভাতীয় আদালতের কাঠগড়ায় তোলা হয়েছে। ফাঁসির মধ্য দিয়ে হয়তো মুকেশ সিং-এর জীবনের ইতি ঘটবে। নারী ‘নির্ভয়া’র বিদেহী আত্মা হয়তো শান্তি পাবে। তার পরিবারের বেদনা, হতাশা ও ক্ষোভ হয়তো কিছুটা হ্রাস পাবে। কিন্তু যে পুরুষতন্ত্র ভারতে বা বাংলাদেশে বা পৃথিবীর সবদেশে কোটি কোটি মুকেশের মধ্যে নারীর প্রতি ধর্ষকামিতার ও সহিংস বলপ্রয়োগের তথা নিপীড়নের মনস্তত্ত্ব ও আচরণ তৈরি করে, এবং এর যথার্থতা দেয়- তাকে কাঠগড়ায় তোলা কি অধিক জরুরি নয়? এই প্রথিবীর কোটি কোটি ‘নির্ভয়া’-র জন্য একটি মানবিক, অধিকারসম্পন্ন, মর্যাদাকর ও স্বাধীন তথা সকল ধরনের সহিংসতা-নিপীড়ন-নির্যাতন-শোষণমুক্ত জীবন কি জরুরি নয়?

‘ভারত কন্যা’ নিষিদ্ধের দাবিতে নয়, পুরুষতন্ত্র এবং তার তৈরি নারীর প্রতি ধর্ষকামিতা ও সহিংস বলপ্রয়োগের মনস্তত্ত্ব-এর বিরুদ্ধে লড়াই অনেক জরুরি। কারণ এই মনস্তত্ত্বই প্রকাশিত হয় পুরুষের আচরণে ও বচনে। তবে এ লড়াই ব্যাপক, বিস্তৃত, বহুমাত্রিক এবং নিরন্তর। এ লড়াই শুধু নারীর একার নয়। এ লড়াই পুরুষেরও। নারীর লড়াই মূলত তার সুরক্ষার, স্বাধীনতার, মর্যাদার ও ক্ষমতায়নের।

আর পুরুষের লড়াই প্রথমতঃ  ‘মুকেশ’ এর মতো একজন ধর্ষক-নিপীড়ক বা একজন আধিপত্যশীল পুরুষ না হয়ে ওঠার লড়াই। দ্বিতীয়তঃ প্রকৃতই একজন মানবিক ও সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে নারী মুক্তি-র লড়াইয়ে সহভাগী হওয়ার লড়াই।

মোহাম্মদ রিয়াজুল হক, [email protected]

 

 

শেয়ার করুন:
  • 6
  •  
  •  
  •  
  •  
    6
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.