‘ভারতকন্যা’ পুরুষতান্ত্রিকতারই মুখোশ খুলে দিয়েছে

India Rapeউইমেন চ্যাপ্টার: ‘মেয়েরা হচ্ছে ফুলের মত, দেখতে সুন্দর, নরম-কোমল, ফুলকে সবসময় যত্ন করে রাখতে হয়। অবহেলায় নষ্ট হয়ে যায়, আর মন্দিরে তারা পূজ্য। অন্যদিকে পুরুষরা হচ্ছে কাঁটার মতো, শক্তিশালী, কঠোর। ফুলকে সবসময়ে সুরক্ষা দিতে হয়।’ ‘…ভারতের সংস্কৃতি বিশ্বসেরা সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতিতে নারীর কোনও স্থান নেই’- কথাগুলো আর কেউ নয়, বলছিলেন আইনজীবী এম এল শর্মা, যিনি দিল্লির বহুল আলোচিত নির্ভয়া ধর্ষণ মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামী মুকেশ সিংয়ের পক্ষে আদালতে লড়েছেন।

তবে এসব কথা আদালতে নয়, তিনি বলেছেন বিবিসি সাংবাদিক লেসলি উডউইনকে। নির্ভয়া ঘটনার ওপর তার তৈরি ‘ইন্ডিয়াজ ডটার’ তথ্যচিত্রে এমন কথা উঠে আসে। তথ্যচিত্রটি এখন বিশ্বজুড়ে তুমুল আলোড়ন তৈরি করেছে, বিশেষ করে ভারত সরকার সেটির প্রদর্শনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে এটি ভাইরাল হয়ে গেছে।

যারাই দেখেছেন তথ্যচিত্রটি, কেউই বুঝে উঠতে পারছেন না, এটি নিষিদ্ধ করার পিছনে কারণটা কি মূলত? এখানে ধর্ষক যেভাবে অকপটে স্বীকার করেছে তার অপরাধের কথা, তেমনি ধর্ষকের পক্ষে লড়া আইনজীবীদের ভাষ্যেও উঠে এসেছে একজন নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একটি মেয়েকে কত ধরনের প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা এই এক ঘন্টার তথ্যচিত্রেই উঠে এসেছে। আবার এখানেই কেউ কেউ বলেছেন, ভারত বিশ্বের চতুর্থ শক্তি হলেও নারীর প্রতি তার মনোভাব এখনও সেকেলে।

ধর্ষক মুকেশ সিংয়ের কথামতোই নারীর কাজ হচ্ছে ঘরে থাকা, সংসারের কাজ করা। আর কেউ তাকে ধর্ষণে উদ্যত হলে প্রতিবাদ না করে তাতে সম্মতি জানানো।

একজন আইনজীবীর নিশ্চয়ই অধিকার আছে কারও পক্ষে লড়ার। কিন্তু তাই বলে একটি ঘৃণ্য অপরাধকে বৈধ করার জন্য এমন নির্লজ্জভাবে বলতে পারেন তা ভাবতে গিয়েই শিক্ষিত সমাজের গা শিউরে উঠার কথা। এতে কিছুটা পরিচয় পাওয়া যায় একটি তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ, শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজের পুরুষদের মানসিকতার। তথ্যচিত্রটিতে এই অবস্থার পরিবর্তনে শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হলেও, এটা সত্যি যে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়েও মানুষের মানসিক শিক্ষার কথাই হয়তো এখানে বোঝানো হয়েছে। নারীর প্রতি সম্মান জানাতে হলে প্রথমে একজনকে ‘মানুষ’ হতে হবে, এর বিকল্প নেই। আর হচ্ছে সিস্টেম পাল্টাতে হবে। যে সিস্টেম যুগের পর যুগ নারীর পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে তা পরিবর্তন না হলে কোনো আন্দোলন, শিক্ষাই নারীর সত্যিকার মুক্তি দিতে পারবে না।

এর আরও ভয়ানক প্রমাণও মেলে বিবিসির প্রকাশিত তথ্যচিত্রটিতে। ধর্ষক মুকেশ সিংয়ের বিস্তারিত সাক্ষাৎকারে দেখা যায় এক পর্যায়ে অনুতাপহীন স্থির দৃষ্টিতে তিনি বলছেন, ‘আমরা ছয়জন মাতাল ছিলাম,  মনে মনে ‘ফান’ করার  মুড ছিল। জ্যোতি (নির্ভয়া) ও তার বন্ধুকে বাসে তোলার পরই আমরা তাদের নিয়ে ‘ফান’ করবো বলে ঠিক করি।’ মুকেশ ওই বাসের ড্রাইভার ছিল।

মুকেশ আরও বলে, ‘ঘটনার পর পরবর্তীতে মেয়েটির কী হয়েছিল, আমি জানি না, আমি ওর  সম্পর্কে জানতাম না। পরে শুনেছি, সে মেডিকেল ছাত্রী ছিল।’

তথ্যচিত্রে মুকেশকে এমনও বলতে শোনা যায়, ‘মেয়েটির আমাদের বাধা দেয়া ঠিক হয়নি। তার উচিত ছিল চুপচাপ সহ্য করা, তাহলে তাকে আমরা যা করতে চেয়েছিলাম তা শেষ করে ছেড়ে দিতাম।’ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মুকেশ আরও জানায়, এ ঘটনায় তাদের ফাঁসি দেয়া হলে অপরাধ কমবে না, বরং বাড়বে। আগে যাও ধর্ষণের পর মেয়েটিকে হয়তো কাউকে কিছু না বলার কথা বলে ছেড়ে দেয়া হতো। ফাসিঁ হলে মেয়েটিকে এরপর থেকে মেরে ফেলা হবে’।

রাজ্যসভার মনোনীত সদস্য এবং সমাজকর্মী অনু আগা বলেন, ‘তথ্যচিত্রে মুকেশ যা বলেছে তা থেকে ভারতের অনেক পুরুষের মনোভাব প্রতিফলিত হয়। তা নিয়ে আমাদের এত লজ্জা কীসের? ভারতকে মহান করে দেখিয়ে বিতর্কিত প্রশ্নগুলি থেকে দূরে সরে যাওয়া কি খুব যুক্তিযুক্ত?’

একই কথা বললেন পুরো ভারতে সমাদৃত গীতিকার জাভেদ আখতার। তিনি বলেন, ‘এমন তথ্যচিত্রকে সাধুবাদ জানাই। যাঁদের এতে আপত্তি রয়েছে, তাঁদের মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন।’

তবে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান নিয়েছে সরকার। তারা এটাকে সাধুবাদ না জনিয়ে কেন ধর্ষকের সাক্ষাৎকার নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হলো তা খতিয়ে দেখে জড়িতকে শাস্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে।

এদিকে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভারতের এমন পদক্ষেপ দেশটির সংবিধানের মূলনীতি গণতন্ত্র ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর অনেক বড় আঘাত হবে। গত তিন-চারদিন ধরে তথ্যচিত্রটি ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংবাদ হয়ে আসছে। বিবিসি বাংলার এক খবরে বলা হয়েছে, ভারত সরকার এটিকে নিষিদ্ধ করার পরও বিবিসি এটি সম্প্রচার করায় তারা বিবিসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা ভাবছে।

এদিকে দিল্লিকে ধর্ষণের নগরী হিসেবেই অভিহিত করা হয়। এখানে প্রতি ২০ মিনিটে একজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়। কিন্তু পুলিশ কমিশনারের মুখে শুনি, এটা খুবই নিরাপদ একটি শহর।

তথ্যচিত্রটিতে একইভাবে জ্যোতির মা-বাবা, তার গৃহশিক্ষকের কথা উঠে এসেছে। তুলে ধরা হয়েছে ধর্ষকদের পরিবারের কথাও। কোন পরিবেশে তাদের বাস, দারিদ্র্য, অশিক্ষা, সংস্কার সবই চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন নির্মাতা। শেষের দিকে জ্যোতির বাবা যেমন বলছিলেন, মেয়ের নাম প্রথমে কোথাও ব্যবহার না হলেও, তাকে নির্ভয়া নাম দেয়া হলেও তিনি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নন। কারণ জ্যোতি আজ পুরো ভারতবর্ষের নারীদের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। সেইসাথে এই প্রশ্নও উঠে এসেছে যে, নারী শব্দটির প্রকৃত অর্থ আসলে কী? সন্তানকে হারিয়ে, দরিদ্র পিতামাতা শুধু একটা স্বপ্নকেই হারাননি, হারিয়েছেন একমাত্র অবলম্বনকেও।

এককথায় জ্যোতি বা নির্ভয়া নির্যাতনের পর ভারত জুড়ে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তাতে আইনের পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছিল তৎকালীন কংগ্রেস সরকার, পুলিশ দিয়েও দমাতে পারেনি সেই আন্দোলন। কিন্তু বর্তমানে এ নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্রটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এটাই প্রমাণ করে যে, নারীর প্রতি সমাজের অসহিষ্ণুতা আসলে কতখানি! আরও দীর্ঘপথ আমাদের হাঁটতে হবে বৈকি নারীর মুক্তি অর্জনে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.