অভিজিৎ একজন মালু, নাকি তোর খালু?

Godhuly
গোধূলী খান

গোধূলি খান: খ্যাচাখাচ চাপাতি কি শুধু ড. অভিজিৎ রায়ের মাথায়ই চালিয়েছে জঙ্গি? চাপাতির আঘাতে অভিজিৎ রায়ের মাথাই কি শুধু ফাঁক হয়ে মগজ বের হয়ে গেছে?
কয়েকদিনের পত্র-পত্রিকা, টিভি নিউজ, অনলাইন নিউজ সাথে টুইটার, ফেসবুক ঘুরে মনে হলো জঙ্গিদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে শুধু মি. রায়ের মাথাই ফাঁক হয়ে যায়নি, আমাদের মুখের আগলা মুখোশও ফাঁক হয়ে গেছে, আর সেই ফাঁকে বের হয়ে গেছে আমাদের চরিত্রের নানান দিক।
হুমায়ুন আজাদ, রাজীব হায়দার ও ড. অভিজিৎ রায় একজন একজন করে মারা যায় আর আমাদের লুকানো চরিত্র বের হয়ে আসে বারবার। সেই ১১ বছর আগে যা হয়েছে। দুই বছর আগে তাই হয়েছে, এবারও হচ্ছে।

আমরা একদল আছি যারা এই খবর দেখামাত্র বিরক্তি দেখিয়ে পৃষ্ঠা উল্টে চলে যাই বিনোদন পাতায়, বলে উঠি, উফ আবারও এই খুনোখুনি ভাল্লাগে না ছাই। ৭০ জন লঞ্চডুবিতে মারা গেছে দেখে বলি, যাক বাবা লাস্ট টাইমের থেকে তো এবার অনেক কম, বলে পাতা উল্টে চলে যাই খেলার পাতায়, কেঁদে উঠি বেদনায়, বুক ভরে গালি দেই খেলোয়াড়দের, বলি, হয় ভাল করে খেল, নয়তো ছেড়ে দে। একের পর এক আউট শালাদের লাত্থি দিয়ে টিম থেকে বের করে দেয়া দরকার।

ফেসবুকে এসে লিখি, যেমনই কর, হার-জিত যাই হোক, তোমাদের পাশে আছি হামেশা, লাবিউ টিম।
পেট্রোল বোমায় পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া নারী বা শিশুর ছবি ও সংবাদ দেখে চোখ মুখ কুঁচকে বলি, আহ্ সাত সকালে আবার কুৎসিত ছবি, দিনটাই না খারাপ যায়, ঝটপট পাতায় উল্টিয়ে মুখ গুঁজি সানি লিওনের সুঁড়সুঁড়ি দেয়া ছবিতে, বুকের মাপ আর ছবিতে সে কতটা নগ্ন হয়েছে পড়তে পড়তে শক্ত হয়ে ওঠে অঙ্গ। ফেসবুকে, টুইটারে লিখি, মানবিকতা অবহেলিত। জনজীবন দুর্বিষহ। আমাদের মৌলিক অধিকার বলে কিছু নেই দেশে।

আমরা নিজের দোষ ঢাকার জন্য প্রতিনিয়ত অন্যকে দোষারোপ করি। নিজে কিছু না করলেও আশাকরি অন্য কেউ করে দেবে। সেই আশা পূরণ না হলেই শুরু করি কদাকার আক্রমণ। আর নারী হলে তো কথাই নেই। কোথায় গিয়ে এই আক্রমণ শেষ হবে তার কোন সীমা নেই।
পেট্রোল বোমায় পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া দেহের ছবি দেখি, আবার হাসতে হাসতে বার বি কিউ ডিনার পার্টি করি, নৌকাডুবির নিউজ দেখতে দেখতে সি-ফুড খাই। এই আমরাই আবার বোমা হামলায় নিহত রিক্সাওয়ালার আহাজারিরত বউয়ের ছবি দেখে ব্যথিত হই।

ঘরে অসুস্থ পঙ্গু প্রায় বউকে পিটিয়ে রেখে, অন্যের বউয়ের মান ভাঙ্গাতে যাই। নবজাত শিশুর মুখ দেখার সময় পাই না, পরস্ত্রীকাতরতায়।  কিন্তু ফেসবুকে লিখি, ‘বধুয়া আমার চোখে জল এনেছে হায়, বিনা কারণে’।

আমরা বলি এক, করি আরেক। হরতালে হামলা, জ্বালাও-পোড়াও হলে দোষ দেই সরকারকে, আবার শান্তিপূর্ণ হলে খোঁচা দেই হরতাল সমর্থকদের। এক নিউজে দেখলাম, কয়েকদিন পেট্রোল বোমা হামলা হয়নি তেমন, হরতালে চরম যানজট, যা বাবা গতকালই হামলা চলল, গাড়ি ভাঙ্গা, পোড়ানো, সবই হলো, তো এবার খুশি? আজব জাতি আমরা, নিজেরাই জানি না কি চাই। শুধু কি আমরা, আমাদের সরকারও মনে হয় বোঝে না কি চায় তারা, কি বলে তারা আর কি করে?

যায় হোক ফিরে আসি আবার ড. অভিজিৎ রায়ের কথায়। অভিজিৎ রায়ের হত্যাকে কেন্দ্র করে আমরা নানান মুনির নানান মতে ভরে ফেলেছি বিভিন্ন মিডিয়া, বিশেষ করে সামাজিক মিডিয়া। আমরা একদল কিন্তু, তবে, যদি, মানে, হয়ত ইত্যাদি ছাড়া কড়া ভাষায় এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করি। আবার কেউ হত্যাটা ঠিক হয়নি কিন্তু, তবে, যদি, হয়ত বা মানে দিয়ে পাশ কাটিয়ে যাই। আবার আমরা বিশাল একটা জনগোষ্ঠী এই ব্যাপারে কথাই বলি না। কারণ এই সব নিয়ে কথা বলা ব্যাকডেটেড। নিজেদের লাইফ ‘কুল’ বোঝাতে সেলফি আপলোড করি। নিজেদের সুখি, আনন্দময় জীবন নানান ভঙ্গিমায় তুলে ধরি। স্বামী-স্ত্রী, বাচ্চা-কাচ্চা, বন্ধু-আত্মীয় নিয়ে হুল্লোড়ময় মূহূর্তগুলো ক্ষনে ক্ষনে তুলে ধরি সেলফি দিয়ে।

চাপাতির আঘাতে অভিজিতের মাথা ফাঁক হয়ে যাওয়া ছবি দেখে অনেকে আবার মনে মনে বলে উঠি, ‘ঠিকই হইছে শালা নাস্তিক। বেশি বেড়েছিলে বাওয়া, এখন ঠেলা বোঝ’। আবার কেউ কেউ লিখেই ফেলি ‘নাস্তিকের শাস্তি এটাই, আমার আল্লাহ্‌ ও নবী রাসুল নিয়ে ফাজলামি’।  মজার কথা হইল, যারা নাস্তিক বলে গালি দিলাম, তারা জানিও না সে কি লিখছে। পড়িওনি অভিজিতের লেখা একটা বই। এমনকি তার ব্লগেও ঢুঁ মারা হয়নি।

শোনা কথা শুনেই আমাদের রক্ত ফুটে ওঠে টগবগিয়ে। কেউ কেউ আবার আমরা কাঁদা ছুঁড়ছি, ব্যক্তিগত আক্রমণ করছি। কারণ তারা অভিজিতের পক্ষে কথা বলছে, হত্যার বিচার চাইছে। আমরা গাজা হামলার সময় লিখেছি, বলেছি, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে একই বা সমধর্মের না হলেও চলে। মানুষ যদি হও, তবে প্রতিবাদ কর।
তাহলে কেন আজ আমরা লেখক হুমায়ুন আজাদ, প্রকৌশলী রাজীব ও ড. অভিজিতের খুনিদের শাস্তি শর্তহীনভাবে চাইছি না। দুই পাঁচ মিনিটে প্রতিভাধর মানুষটিকে হত্যা করা হলো, কিন্ত দুই পাঁচ যুগে কি এমন মেধাবী মানুষ আবার আসবে?

তিনি দোষী হলে তাকে বিচারের আওতায় আনো। না হলে তাকে বোঝাও তাঁর ভুল হচ্ছে।  তার যদি নিজের মতবাদ প্রকাশ করার অধিকার না থাকে, তাহলে তোমাকে কে দিয়েছে তাকে হত্যা করার অধিকার? আমার ধর্ম তো দেয় না সেই অধিকার। তোমার কোন ধর্ম? কিসের ধার্মিক তুমি? কিসের ভালবাসা তোমার ধর্মের প্রতি? তুমি তো মিয়া তোমার আল্লাহ্‌ রসুলের আদেশ নিষেধই মান না, তাহলে তোমাকে বা তোমার মতবাদ কে মানবে রে জঙ্গি ভাইয়া? ফ্যান্টাসি না রে ভাই?
আমাদের ভাবার সিদ্ধান্ত নেবার চরম সময় আগত, আমরা কাদের জন্য চুপ করে আছি? চুপ থেকে কোন পক্ষ নিচ্ছি? জঙ্গিরা কি আমাদের নাস্তিক-আস্তিক বেছে মারছে? ধর্ম-অধর্ম বেছে মারছে কি? ওরা আমাদের মেধাকে শেষ করছে। ওদের প্যাটার্নটা আমাদের এতো পরিচিত তারপরও কেন আমরা জোর দিচ্ছি না। আর আমাদের রাষ্ট্রপক্ষও কেন মিন মিন করছে। কেন আমাদের মেধা শূন্য করতে দিচ্ছে?

রাজনীতির কোন মার প্যাঁচে ওরা দিনে দিনে এতো শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, সরকার প্রধান কেন বুঝেও বুঝছেন না, নীতিহীন মানুষ যখন রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকে তখন সুবিধাবাদীরা আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
আবারও অন্য পথে চলে গিয়েছি, ফিরে আসি আবার গত কয়েক দিনের সামাজিক মিডিয়াতে। ফেসবুকে লিখেছিলাম, ‘ওরে ধর্মান্ধ উন্মাদ জানোয়ার কতবার, কতজনকে কতভাবে মারবি আর, আমরা জন্ম নেব, লিখবো বারবার। তীব্র প্রতিবাদ। আমাদের বন্ধুসম একজন বলল, কিরে, কাঁদছিস নাকি? সে আমায় বলল, ‘মুসলমান হয়ে একটা নাস্তিকের জন্য মরে যাচ্ছিস দেখি। আমি বললাম, যা অনুভব করেছি তাই লিখেছি। আমায় বলল সে, ‘কাঁদছিস? অভিজিৎ একজন মালু, নাকি তোর খালু’? ওর সাথে কথা বন্ধ করে দিলাম। দেখলাম ফেসবুকে তার ওয়ালে লিখেছে, হিন্দু পোলার বউ মুসলমান মাইয়া, ছি শরমে যাই মইরা, কি মুসলিম পোলারে ভাল লাগেনি?

আবার দেখলাম আরেকজন লিখেছেন, ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করা ভাল না, নিজ নিজ ধর্ম নিয়ে থাকো, অন্যের ধর্ম নিয়ে ভ্যানতারা কিসের? মরলি তো। কেউ আসলো বাঁচাতে? শাল্লা ফান্ডা নিস, জ্ঞান দিস, দে এবার জ্ঞান।

কেউ বা অভিজিৎ হত্যায় তীব্র প্রতিক্রিয়াকারীদের প্রগতিশীলতার পাঠ পড়ছি। কাঁদা ছুড়ছি, ডান-বাম উপর-নীচ এক হয়ে যাচ্ছি ক্ষেত্র বিশেষ। নিজে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার প্রয়াসে নিজের রক্তের সাথে বেইমানি করতে দ্বিধা করছি না। গোষ্ঠী লড়াই করছি। এও বলছি ধর্ম বা অভিজিৎ বিষয়ক লেখালেখি এসাইলাম পেতে করছি কেউ কেউ?
কি আমাদের মনোভাব? কি আমাদের রুচি?

আসলেই কি আমরা বুঝছি না জঙ্গিদের টার্গেট নাস্তিক-আস্তিক না। জামায়াত, তালেবান, আল-কায়দা, বোকো হারাম,আইএসআইএস, এই সব ইসলামি জঙ্গি গ্রুপের হামলার প্রধান শিকার এই আমরা মুসলিমরাই। আমাদের ধীরে ধীরে ঘিরে ধরছে। ওদের অধীনে নেয়ার খেলা খেলছে, একবার ওদের হাতের মুঠোই চলে গেলে আর দেখতে হবে না। সময় থাকতে, কিন্তু, যদি, তবে, হয়ত বাদ দিয়ে একসাথে এক হয়ে আমাদের প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে। না হলে, আপনি-আমি মারা গেলে কেউ এগিয়ে আসবে না।

তখন কিন্তু, তবে, হয়ত, মানে যদি বলে পিছিয়ে যাবার লোকের অভাব হবে না। বার বার পূর্ণিমা, মেহেরজানরা এদের হাতে ধর্ষিত হবে, যশোর-সাতক্ষীরাতে মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াবে ইসলামী জঙ্গি হামলার ভয়ে, আর আমরা সুখে আছি ভেবে, নিরাপদে আছি ভেবে ফ্যান্টাসির দুনিয়াতে বসবাস করবো।
হলফ করে বলতে পারি, আমরা আরো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ব যদি না এক হয়ে হাতে হাত রেখে দাঁড়াই। আমাদের মধ্যের সব বিভাজন ভুলে, এগিয়ে আসতে হবে সামনে। তীব্র প্রতিবাদ করতেই হবে,  এছাড়া সামনে অন্য কোন পথ খোলা নেই।

লেখক-সাংবাদিক।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.