‘কালা ফিফড়া মারবি না, হেরা মোসলমান’

We can do itগোধূলি খান: লাল ফিফড়া ফাইলেই সাথে সাথে টিফা দিবি, এমুন টিফা দিবি মাটির সাথে যেন এক্কেবারে ফিইশা যায়, কারণ হেরা হিন্দু। আর কুন দিন কালা ফিফড়া মারবি না, হেরা মোসলমান।

আমি তখন কোন ৮ কি ৯ বছরের। মর্নিং স্কুলে যায়। ১২টার মধ্যে বাসায় চলে আসি। দুপুরের খাবার পরে কিছুতেই ঘুমাতে চাইতাম না। খেলতাম শুধু। সন্ধ্যায় বাসায় পড়াতে মাস্টার আসার আগে আগে ঘুম পেত বা ঘুমিয়েও পড়তাম। তাই আশেপাশের পাড়াত ভাইবোনদের সাথে আমাকেও পাশের পাড়ার মসজিদে পাঠাতে লাগলেন। কায়দা পড়া শেখানোর জন্য।

পাড়ার ৯/১০ জন ভাই-বোনের সাথে আমি মহা উৎসাহে মসজিদে যাই ( তখন এতো বেশি বেশি মসজিদ ছিল না, )। মেঝেতে বসে দুলে দুলে আরবী বর্ণমালা পড়ি। পড়ার থেকে বেশি বড় হুজুর গল্প করেন, আমরা চোখ বড় বড় করে শুনি। (এখন সেই গল্প মনে পরলে হাসি পায়, পুচকি পাচকা আমাদের যে গল্প বলতেন তার সবটাই ছিল, অমুসলিম তরুণদের বীরত্বের গল্প। যারা অমুসলিম পরিবারের হয়েও জানবাজী রেখেছে ইসলাম ধর্ম কবুলের জন্য। পাহাড় টপকে, উত্তাল সুমদ্র সাঁতরে, তিমি মাছের সাথে লড়াই করে বেঁচে ফিরত।)

কোন কোনদিন হুজুর ভাত ঘুম দিতেন, আমাদের বলতেন শব্দ না করে পড়তে। আমরাও নিচু স্বরে আলিফ, বা তা ছা পড়তে পড়তে খেলায় ব্যস্ত হতাম। হাতা-হাতি, মারামারিও করতাম। ঘুমের মাঝে হুজুর বলতেন ‘এই ফড়’। (হুজুর প কে ফ বলতেন।) আমরা তখন খেলা বাদ দিয়ে ‘ফড়তাম’, সরি পড়তাম, এক দুই মিনিট পরে আবার জুটতাম দুষ্টুমিতে। এমন কোন এক দুপুরে মসজিদে আসার আগে, মা হাতে এক প্যাকেট মিস্টি দিয়ে বলল, যারা পড়তে আসে তাদের দিবি আর বাকিটা প্যাকেট ধরে হুজুরকে দিবি। আমার বড় ভাইয়ের ম্যাট্রিকের রেজাল্ট বের হয়েছিল, অনেক মিষ্টি কেনা হয়েছিল। মা ভাইয়ের পাশের মিস্টি খেয়ে হুজুরকে দোয়া করতে বলে দেন আমাকে দিয়ে। আমিও সবাইকে মিস্টি দেই আমাকেসহ। বাকি মিষ্টি্সহ বাক্স হুজুরকে দিলাম। হুজুর টপাটপ ছয়টা মিষ্টি খেয়েই বললেন, হনেক ধোয়া, তোর ভাইয়ের জন্য।

আমাদের খাওয়া মিষ্টির থেকে এক দুই ছোট টুকরা মেঝেতে পড়েছিল। সেখানে পিঁপড়া চলে আসে কিছুক্ষণের মধ্যে কালো পিঁপড়া। দুই চারটা পিঁপড়া আবার আমার বইয়ের মধ্যে ঢুকতেই আমি দুইটা পিঁপড়াকে টিপে মারি। তা দেখে হুজুর হৈ হৈ করে ওঠেন। চিৎকার দিয়ে বলেন কি করলি? কি করলি তুই? আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলি, হুজুর আরবী বইয়ে পিঁপড়া উঠেছিল, তাই পিঁপড়া মারি। হুজুর আমার কান ধরে বলেন, লাল ফিফড়া ফাইলেই সাথে সাথে টিফা দিবি, এমুন টিফা দিবি মাটির সাথে যেন এক্কেবারে ফিইসে যায়, কারণ হেরা হিন্দু। আর কুন দিন কালা ফিফড়া মারবি না, হেরা মোসলমান। কুনদিন ভুলবি? হিন্দু ফিফড়া মারা সোয়াবের।

সবার সামনে কান ধরাই আমার ইজ্জতের প্যাংচার। ছোট হলেও কান ধরাটাকে খুব লজ্জাজনক মনে করতাম। বাসায় ফিরেও মন খারাপ ছিল। রাতে আপাদের সাথে না শুয়ে আব্বা-মায়ের সাথে শুতে গেলাম। মাঝখানে শুয়ে আছি চুপচাপ। আব্বা বলে, কিরে চুপচাপ কেন? কোন গল্প শোনার বায়না নাই আজ? মা কোলের মধ্যে টেনে নিয়ে বলে ভালোই তো, ভোরে স্কুল, গল্প শুনে বেশি রাত জাগার দরকার নাই। আমি তখন মাকে বলি, আচ্ছা মা তুমি জানো কালো পিঁপড়া মুসলমান? মা বলে, সে কি রে পিঁপড়া আবার মুসলমান? আমি বলি, হ্যাঁ। আর লাল পিঁপড়া হিন্দু। তাই হিন্দু পিঁপড়া দেখলেই মারতে হবে, তাইলে অনেক সোয়াব। মা খুব অবাক হয়ে বলেন? এই সব কোথা থেকে শিখলি?

আব্বা শোয়া থেকে থেকে উঠে বসেন, তিনিও জানতে চান কে শিখাইছে এইগুলা। আমি বলি মসজিদের বড় হুজুর। আব্বা মাকে বলেন, কাল থেকে ওকে আর মসজিদে পাঠাবা না। বাসায় মাস্টার রেখে আরবি পড়াও। আর আমাকে বলেন, এই গুলা একদম মনে রাখবা না। পিঁপড়া হল পিঁপড়া, এরা হিন্দু মুসলিম না। আর মনে রাখবে হিন্দু-মুসলিম সবাই ভাল। কেউ ভাল, কেউ খারাপ না। সবাই সমান। কিছুদিন পরে শুনি মসজিদ থেকে বড় হুজুরের চাকরি নাই।

অনেক অনেক বার এমন কিছু শুনেছি, বলেছে আমাদের চারপাশের কিছু মানুষ। আমাদের ঠিক ছয়/সাত বাড়ি দূরের প্রতিবেশীকে মামা ডাকতাম। ঊনার ছয় ছেলে, এক মেয়ে। উনার আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ ছিল। এ কারণে তার ছেলেরা যেকোন নির্বাচনে একেক দলের হয়ে কাজ করত। বড়জন আওয়ামী লীগ,মেঝো জন জামাত, সেজ ও তার পরেরজন বিএনপি। তার পরেরজন জাতীয় পার্টি। আর ছোট জন আমাদেরই বয়সের ছিল বলে কোন দলে ঢুকতে পারত না। সেই মামার মেঝ ছেলে কট্টর জামাতী। আমাদের দেখতেই পারত না।

কখনো কোন ক্ষতি করেনি, কারণ আমাদের বাসা থেকে ওদের জন্য খুব সাহায্য যেত। সেই ভাই একদিন বলল, হিন্দুদের দেখলেই মনে মনে গালি দিবা, আমি বললাম কেন? সে বলল, তাইলে আল্লাহ্‌ অনেক সোয়াব দিবে। আবার কখনো উনার মা যাকে মামি বলতাম, উনি বলতেন লাকিকে দেখলেই বলবা, হিন্দু হিন্দু তুলসি পাতা, হিন্দু খায় গরুর মাথা। এমন অনেক কিছুই আমাদের শেখানো হত। এমনকি এও বলত যে হিন্দুরা শৌচকার্য করে না, সেই হাতে ভাত খায়।

জামায়াত সমর্থিতরা অনেকভাবে অনেক পন্থায়, ছোট থেকে অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি অশোভন আচরণ করতে শেখায়। হিন্দুদের প্রতি বিদ্বেষ বেশি ছিল সব সময়। এক দুই দিনে এই কাজ করেনি, দীর্ঘ দিন ধরে মানুষের মনে বিদ্বেষ ঢুকানোর কাজ করে চলেছে। তৃণমুল পর্যায় থেকে জামায়াতের কাজ শুরু করে। বিভিন্ন সংগঠন গঠন করেছে তারা, এর মাধ্যমে দলে সদস্য বানিয়েছে, ছোট বয়সের ছেলেমেয়েদের লক্ষ্য করে ব্রেনওয়াশ চালিয়েছে। আজ চারপাশে তাকালে ওদের সার্থক সফলতা চোখে পড়ে।

এবার ঢাকা যেয়ে টুপিদাড়ি (মোচবিহীন) আর হিজাবের আধিক্যে অবাক হলাম একাধারে আধুনিক পোশাক তার উপর হিজাব। খুব ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-বন্ধুদের দেখলাম এবার হিজাবে। হিজাব কেন পরছিস জানতে চাইলে প্রথমে বলে, কানে বাতাস লাগলে ব্যথা করে। আরেক বন্ধু বলল, আরে কানে ব্যথা না, বাচ্চাকে মানারাতে ভর্তি করিয়েছে। পরে আমার বন্ধু বলে, স্কুল চালকরা চায় গার্ডিয়ানরাও ইসলামিক জীবনযাপন করুক, ওদের ভাষ্য মুসলমান হলে অবশ্যি নারীকে হিজাবের মধ্যে থাকতে হবে। আমি বললাম, ও আচ্ছা, হিজাব না পরলে আমার মুসলমান না। ধর্ম আমি লালন করব মনে-প্রাণে, না পোশাকে!

আমার বান্ধবী বলে, দেখ বাচ্চাকে ভাল স্কুলে দেবার জন্য হিজাব পড়ছি, আর এখন ভালই লাগে। আমি জিজ্ঞাসা করি, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়িস? বলে না রে দোস্ত, সময় পাইনা, এতো ব্যস্ত থাকি। আমি বলি, তাতো বটে। রাস্তায়, মার্কেটে, পাড়ায়, সিনেমা হলে, স্কুল কলেজ, ইউনিভার্সিটি, অফিসে সবখানে হিজাব আর মোছহীন দাড়ির আধিক্য চোখে পড়ার মত।

১৫ বছর থেকে শুরু করে অনেক পরিণত বয়সের মানুষের কাছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার একটা ফাজলামী। নামি দামি, ভালো মানুষদের অযথা হয়রানি করা। ফেরেশতা তুল্য মানুষদের প্রতি সরকারের এহেন আচরণে তারা দারুণ ক্ষুব্ধ। আমি খালি অবাক হলাম। আগে মানুষ জামায়াত লুকিয়ে চুরিয়ে করত, আজ সদম্ভে করে। জানান দিয়ে করে। আগে জামাতি পাইলে মানুষ ধাওয়া দিত। আজ জামাত নাঙ্গা তলোয়ার নিয়ে সদর্পে গলা কেটে চলে, দেখার কেউ নেই, বলার কেউ নেই। আইন আছে খাতায় পাতায়, আর গরীবের উপর প্রয়োগের জন্য। ক্ষমতার থাকলে যার যা ইচ্ছে করছে, ক্ষমতাবানদের জন্য কোন আইন নেই। আছে ক্ষমতাহীনদের জন্য। ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য সরকার আঁতাত করছে ধর্মবাজ ব্যবসায়ীদের সাথে। আর বিরোধীদল ব্যবসায়ীদের সাথে নিয়ে চাইছে ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করতে।

একদল ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য চক্ষু লজ্জা হারিয়েছে, আরেকদল ক্ষমতায় যাবার আশায় চক্ষু লজ্জার সাথে বোধ বিবেক হারিয়েছে। কেউ কারো থেকে পিছিয়ে না। নিজেদের ক্ষমতায় ধরে রাখার জন্য এই রক্তবীজদের লালন-পালন করেছে। সেই ক্ষমতালোভীরা আজ মুখে কুলুপ এঁটেছে। এদের নাই এগিয়ে আসার সাহস। নাই অন্যায়ের প্রতিকারের। বরঞ্চ অপরাধীদের বাচানোর জন্য উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপাচ্ছেন। আর এর দায়ে দোষ আমরা। কারণ রাজনৈতিক নেতা আমরাই বাছাই করি আমাদের শাসক হিসেবে। দুর্ভাগ্য আমাদের এরা ক্ষমতায় এসে হয়ে পড়ে নপুংসক। যারা ক্ষমতার গদি পাওয়ার জন্য যে কাউকে বলি দিতে পারে। বাতাস নিজেদের দিকে ঘুরাতে নিজেদের মা-বউ কে এক করে ফেলে। নীতিহীন একদল রাজনীতিকদের চাপে বেহাল দেশের অবস্থা। আর এই বেহাল অবস্থায় চেয়েছে বাংলাদেশের শত্রুরা।

যারা চাইনি বাংলাদেশের জন্ম হোক। যারা চাইনি পাকিস্তানকে বাংলার মাটি থেকে দূরে সরাতে। তাদেরই রক্তবীজ এরা, এই কুলাঙ্গারগুলা, মৌলবাদের জারজগুলিই আজ মাথা চাড়া দিয়েছে। বিএনপি’র কাঁধে ভর দিয়ে বেড়ে ওঠা এই আগাছায় আজ মহীরুহতে পরিণত হয়েছে। আর বিএনপি জামায়াতের জি হুজুর, জি হুজুরকারী দল হিসেবে অস্তিত্বের লড়াই করতে গিয়ে দেশের মানুষকে পুড়িয়ে মারছে। হীরক রাজা সরকার দেশে সংগঠিত হয়ে চলা সংঘাতের কোন প্রতিকারে নেই, নেই কোন আইন প্রয়োগে। আছে দোষী বাবাকে না পেয়ে নিরাপরাধ ছেলেকে গুলি করে মেরে ফেলতে।

আছে নিজেদের গদি বাঁচাতে, নিজেদের টিকিয়ে রাখার জন্য ধর্মীয় মৌলবাদী দলগুলিকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে হাতে রাখতে। আর সেই সাহসে ধর্মীয় মৌলবাদীগুলি তাণ্ডব করে চলেছে। আমাদের দেশের ধর্মবাজদের ইসলাম ধর্মীয় প্রেম বা ধর্ম বিশ্বাস এতোই ঠুনকো কেন? এর বিরুদ্ধে কোন কথা বললেই সেই বিশ্বাসে চিড় ধরে, আর চিড় ধরা গোপন করতেই কুপিয়ে মানুষ মারে। এরাই দিন দিন ইসলাম ধর্মকে উপহাসের শামিল করে তুলছে, ধর্মের নামে একদল উম্মত্ত বরাহ, যারা আদৌ ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে পুরো জ্ঞাত নয়। ইসলামের সৌন্দর্য দেখে না। কোরআন শরিফ এরা পড়তে পারলেও এর অর্থ জানে না। সরকার কি পারে না এদের সঠিক শিক্ষাদানের পদক্ষেপ নিতে?

এরা সঠিক শিক্ষা পেলে ধর্মীয় অন্ধ গোঁড়ামি দূর হত। কুশিক্ষার অভিশাপ থেকে মুক্ত হত জাতি। কুশিক্ষিত এই বরাহগুলিকে এদের ধর্মগুরুরা জানতে দেয় না সঠিক ইসলাম, এদের পড়তে দেয়া হয় না বাংলা, ছোট থেকে ভুল ধর্ম শিক্ষা নিয়ে বড় হয়, এরা না জেনে বুঝে, না শুনে মুসলমান। তাই ইসলাম আমাদের কি শিক্ষা দেয়, কি বলে আর এরা কি করে? ইসলাম যা বলে এরা বিপরীত কাজ করে। এরা কি আসলেই মুসলমান ?এরা কি আসলেই ধার্মিক ? না নাকি এরা ধর্ম ধর্ষক, যাদের দারা প্রতিনিয়ত ইসলাম ধর্ষিত হচ্ছে।

প্রকৃত মুসলমান, আল্লাহতালাকে প্রকৃত পালনকারী কাউকে খুন করতে পারে না, কারণ প্রকৃত মুসলমানের কথায়ও মানুষ আহত হয় না, সেখানে হত্যা অনেক দূরের বিষয়। ওহে মৌলবাদী ধর্মবাজ, সঠিকভাবে ধর্মকে জানো, পড়, মানো ও লালন কর। এক হুমায়ুন আজাদ, অভিজিৎ, রাজিবকে মেরে নিজেদের কাপুরষতা, ভীরুতা ঢাকতে পারবে না। পারবে না নিজেদের ধর্মঅজ্ঞানতা লুকাতে। পারলে যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দাও যে ইসলাম সত্যি, আল্লাহ্‌ সত্য। না পারলে দূরে গিয়ে মর।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.