অভিজিৎ রায়ের নৃশংস হত্যার বিচার চাই

Abhijit 2শিপ্রা বোস: গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে যে নৃশংসভাবে লেখক ও ব্লগার অভিজিতকে হত্যা করা হয়েছে, তার স্ত্রী বন্যাকে আহত করা হয়েছে তা কি প্রতিরোধ করা যেতো? যদি দেশে বর্তমানে সন্ত্রাস প্রতিরোধের যে পদ্ধতি, প্রক্রিয়া চালু রয়েছে সেদিক থেকে তাকাই তাহলে এক মিশ্র অনুভুতি হয়; আবার বর্তমান সরকারের আইসিটি অ্যাক্ট ব্যবহারের যে নিদর্শন দেখেছি গত কয়েক বছরধরে সেখান থেকে যদি এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজি তাহলেও চিন্তার দিগন্তে তেমন আশাব্যঞ্জক কিছু দেখতে পাইনা।

ফেসবুকে ফেক পোস্টকে কেন্দ্র করে রামুতে কি তান্ডব চালানো হয়েছিলো ২০১২ তে। আমাদের ঐতিহ্য রামু ও তার আসেপাশের বৌদ্ধ মন্দিরগুলি গুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। উত্তম বড়ুয়া এখনো নিরুদ্দেশ। তার পরিবারের যা হবার হয়েছে–বারোটা বেজে গিয়েছে অনেক আগেই। আর এ ঘটনার বিচার? সেতো ছোট গল্প হয়ে আছে।

২০১৩ তে পাবনার সাঁথিয়ায় হিন্দুদের ওপর আক্রমণ একই স্টাইলে। আর তার বিচার? এ প্রশ্ন করে সরকার বাহাদুর, প্রশাসন বা বিচার বিভাগকে লজ্জা দেবেন না।

কিন্তু সত্যি সত্যিই কি অভিজিতের ওপর আক্রমণ এবং তার মৃত্যু অপ্রতিরোধ্য ছিল?

যদি এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজি রাষ্ট্রের কাঠামোর দিকে তাকিয়ে, সংবিধানের দিকে তাকিয়ে তাহলে এই প্রশ্নের উত্তরে পাল্টা প্রশ্ন জাগে মনে, আমাদের সরকার, প্রশাসন কেনো পারলো না, কেন ব্যর্থ হলো অভিজিতের এই মৃত্যু ঠেকাতে?

অভিজিতের হত্যাকারী প্রকাশ্যে ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে জানিয়েছে যে তারা প্রস্তুত। শুধুমাত্র সময়ের অপেক্ষা। অভিজিত বিদেশে অবস্থান করছিল বলে তাদের অপেক্ষা করতে হয়েছিল একটি সুযোগের; অভিজিত দেশে এলেই তাকে হত্যা করবে।

করেছেও ঠিক তাই।

অভিজিৎ দেশে ফিরেছে তার অনেক সতীর্থ ব্লগার, বন্ধু, গুনমুগদ্ধরা না জানলেও তার ঘাতকেরা ঠিকই জেনেছিল। তার ঘাতকের কাছে ঠিকই তথ্য ছিল। তারা ঠিকই তাকে খুঁজে বের করে তাদের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করেছে।

এখানে দুটি প্রশ্ন রেখে যাই।
১. যারা প্রকাশ্যে, শপথ করে অভিজিৎকে হত্যার জেন্যুইন হুমকি দেয় ফেসবুকে তখন তাদেরকে আইন ও বিচারের মুখোমুখি কেন করা হয়নি?

রাহী, উল্লাসদের কিন্তু গ্রেফতার করা হয়েছিল ফেসবুকে তাদের স্টেটাস নিয়ে, ফেক ইস্স্যু নিয়ে; তাদেরকে জেলে পোরা হয়েছিল। তাদের পড়ালেখার তোয়াক্কা না করে, তাদের আগামীর দিনগুলির কথা না ভেবেই তাদের জেলে পোরা হয়েছিল।

২. অভিজিতের হত্যাকারী কি করে তার দেশে আসার খবর, তার ঢাকায় চলাচলের সব খবর জানলো? আর তারা জানলো কিন্তু দেশের আইন-শৃংখলা বাহিনী কিছুই জানতে পারলো না–বিদেশ থেকে যখন কেউ দেশে আসে তখনতো ইমিগ্রাশনের কাছে খবর থাকে, কিছুই করতে পারলো না? কেন? ওদের হাত কি আইনের চেয়েও লম্বা?

আসলেই কি দেশে উগ্রবাদী, ধর্মান্ধদের নেটয়ার্ক এমনি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে আমাদের প্রশাসন, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ওদের সঙ্গে পেরে উঠছে না? নাকি আমি ভুল প্রশ্ন করছি?

অভিজিতের মৃত্যু, আততায়ীর হাতে দেশের অগ্রসর, মুক্ত চিন্তার মানুষের পরিকল্পিত ও নৃসংশ হত্যার সূচনা নয়। উগ্রবাদী, ধর্মান্দ, মৌলবাদীদের হাতে সুপরিকল্পিত ও নৃশংস হত্যার নজীর নিকট অতীতেই রয়েছে। ফেব্রুয়ারী ২০১৩ ব্লগার রাজীব হায়দার। ফেব্রুয়ারি ২০০৪, অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ ।পরিকল্পিত হত্যার শিকার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ইউনুস, অধ্যাপক তাহের। হত্যার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত আক্রমন হয়েছিল ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিনের ওপর।

অভিজিতের ময়না তদন্তের রিপোর্টে ডাক্তার নাকি বলেছেন, যেভাবে অভিজিতের মাথায় আঘাত করা হয়েছে তাতে আক্রমনকারীর দক্ষতার প্রমান মেলে; মনে করেছেন তাদের এই বিষয়ে প্রশিক্ষণ রয়েছে।

উগ্রবাদী, ধর্মান্ধ, পরমত অসহিষ্ণু, সুপ্রশিক্ষিত এবং চিহ্নিত খুনিদের হাতে এমন নৃশংসভাবে খুন হয়ে যাওয়ার নজীর অনেক থাকলেও এদের বিচারের কোনো নজীর নেই। রাজীবের খুনীরা জামিনে মুক্ত জীবন উপভোগ করছে। অভিজিৎকে ফেসবুকে প্রকাশ্যে মৃত্যুর হুমকিদাতারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়।

আজ অভিজিৎ হত্যার প্রতিবাদ ও বিচারের দাবী নিয়ে যারা রাজপথ বা কলমে সোচ্চার তাদের অনেকেই সন্দিহান এই বিচার হবে কিনা। অভিজিতের খুনীদের আদৌ কখনো আইন ও বিচারের মুখোমুখি হতে হবে কিনা। অনেকে তাদের সংশয়, ক্ষোভ আর হতাশা প্রকাশ করছেন, অনেকে প্রকাশ্যে তা ব্যক্ত করছেন না। দেশে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতির সৃষ্টি হয়েছে, রাজনীতিতে যে সুবিধাবাদ ও আপসকামীতার সংস্কৃতি লালিত হয়ে আসছে তাতে সরকার, প্রশাসনের ওপর মানুষ আস্থা রাখবেই বা কি করে? আর এই আপসকামী, সুবিধাবাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিমন্ডলে অভিজিতের মৃত্যুকে কি আসলেই প্রতিরোধ করা যেত? আর আজ তার মৃত্যুর পর তার হত্যাকারীর বিচার কি আসলেই নিশ্চিত করা যাবে?

শেষ প্রশ্ন রেখে যাই, যদি আপসকামীতা, ও সুবিধাবাদের জন্য সরকার ও কার্যত অকার্যকর প্রশাসন অভিজিতের হত্যার বিচার করতে ব্যর্থ হয় তাহলে তার দায়ভার কার ওপরে বর্তাবে?
যদি সরকার ও প্রশাসন অভিজিতের খুনীদের বিচারের মুখোমুখী না করে, তাহলে কি বরাবরের মত এবারও আপনি, আমি সেটা মেনে নেবো? নির্বিচারে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে জিইয়ে রাখতে সহায়ক হবো?
অভিজিৎ রায়ের নৃশংস হত্যার বিচার চাই।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.