‘আমরাই কী বিষকাঁটা’?

0

Roma Chow 2উইমেন চ্যাপ্টার: দেশে বর্তমানে রাজনীতির নামে যে জ্বালাও-পোড়াও চলছে, তা আর সহ্য হচ্ছে না, এমনটাই বললেন একাত্তরে নির্যাতনের শিকার মুক্তিযোদ্ধা রমা চৌধুরী। বেশ দৃঢ়তার সাথে তিনি বলেন, একাত্তরে নয় মাস যুদ্ধ করেও দেশ স্বাধীন হয়নি, এমনকি গত ৪৩ বছরেও প্রকৃত স্বাধীনতা আসেনি। আমি আমার তিন ছেলেকে হারিয়েছি এই দেশের স্বাধীনতার বিনিময়ে। লাখ লাখ নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা কি আজকের এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম? বাঙালীরা কেন আজ বাঙালীর শত্রু হয়েছে? ছায়ানট মিলনায়তন জুড়ে তখন পিনপতন নিস্তব্ধতা।

রমা চৌধুরী বলে চলেন, সত্যিকার স্বাধীনতা চাইলে দেশকে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে। দেশকে স্বর্গে পরিণত করতে চাইলে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর না করে, বরং কৃষিনির্ভর দেশ গড়ে তোলার আ্হ্বান জানান তিনি।

রোববার ঢাকার ছায়ানট মিলনায়তনে তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা ফারজানা ববির বীরাঙ্গনাদের নিয়ে নির্মিত ‘বিষকাঁটা’ প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে রমা চৌধুরী একথা বলেন। প্রদর্শনী শেষে যে তিনজন বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে এই প্রামাণ্য চিত্রটি তাদের মধ্যে উপস্থিত দুজন চট্টগ্রামের রমা চৌধুরী এবং খুলনার রঞ্জিতা মণ্ডলকে সম্মাননা জানানো হয়।

হালিমা খাতুনও ছিলেন প্রামাণ্য চিত্রটিতে। তিনি এখনও সেদিনের ক্ষত বয়ে চলেছেন তাঁর পায়ে। আসতে পারেননি তিনি। সাক্ষাতকারের একপর্যায়ে তিনি বলেন, দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু নিজেই তাঁদের বীরাঙ্গনা নাম দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি কী পেরেছেন তাঁর কোন ছেলেকে এমন একজন বীরাঙ্গনা বিয়ে করাতে? পারেননি। পরে আলোচনা পর্বে হালিমা খাতুনের এই কথাটিরই পুনরাবৃত্তি করে একজন বলেন, ‘আমরা আসলে নিজেদের বলয় থেকে বেরুতে পারি না, মুখে যাই বলি না কেন’।

প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে রঞ্জিতা মণ্ডল কোন কথাই বলতে পারেননি। প্রামাণ্য চিত্রটিতেই তিনি জানিয়েছেন একাত্তরে তার ওপর নির্যাতনের সেইসব কাহিনী। এতো বছর পরও সেই দু:স্বপ্ন তাকে তাড়া করে ফেরে, তাও জানান। বলেন, যারা সেইসময় নির্যাতন করেছিল, আজও অনেকে বেঁচে আছে তাদের, কিন্তু কোনদিন এসে সেদিনের কুকর্মের জন্য ক্ষমা চায়নি, এটা তাকে ক্ষুব্ধ করে। নিজের কথা বলতে গিয়ে বার বার চোখ মোছেন তিনি, কণ্ঠস্বর আর্দ্র হয়ে আসে। রঞ্জিতা মণ্ডল বলেন, ৪৩ বছর আগে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, সেই যুদ্ধ এখনও চলছে। একদিনের জন্যও শান্তি মেলেনি তার। এখন সংসার হয়েছে, স্বামী সব জানেন, তিনি মেনেও নিয়েছেন, তারপরও তীব্র এক মানসিক যন্ত্রণা তাকেঁ কুরে কুরে খায়।

আজকের ৭৪ বছর বয়সী রমা চৌধুরীর গল্প সবারই জানা। একাত্তরে নির্যাতনের পরপরই তিনি সমাজচ্যুত হন, দুটো ছেলেকে হারান। পরবর্তীতে নতুন করে সংসার গড়লেও সেটাও টেকেনি, সেখানেও এক ছেলেকে তিনি হারান। তিন ছেলেই আজ তার মাটির নিচে শুয়ে আছে বলে তিনি জুতা ছাড়াই চলেন। নিজে বই লিখে নিজেই ফেরি করে তা বিক্রি করেন, কারও দান নেন না, ঋণ তো নয়ই। যা পান তাই দিয়েই চলছেন এতোবছর।

গতকালের অনুষ্ঠানে তাঁকে কিছু বলতে বলা হলে তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। না থেমে একটানা বলে চলেন, ‘১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করেছি। নিজের পড়ালেখা পুঁজি করেই চলছি। নিজের বই বেচে যে কয়টা টাকা পাই, তাতে নিজে চলি, একটা স্কুল চালাই’। দেশ প্রসঙ্গে তিনি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘দেশের যে সম্পদ আছে, তা দিয়েই দেশটাকে সুন্দরভাবে চালানো যায়। ঋণ কেন নেয়া হচ্ছে? এতো এতো শিল্প বানিয়ে কী হবে? এই দেশ তো কৃষির দেশ, কৃষিকে বাঁচালেই দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে’।

তিনি আরও বলেন, ‘আমার বয়স ৭৪ বছর। কিন্তু এতোটুকু মনোবল হারাইনি। দেশের মানুষ যদি চায়, আমি আপনাদের নেতৃত্ব দেব, সাধারণ মানুষেরাই দেশ চালাবে, সবাই সবাইকে সহযোগিতা করবেন শুধু। নরকে থাকতে চাই না, দেশকে সোনার বাংলা করতে চাই। কেউ এইদেশে না খেয়ে, না পরে থাকবে না। এতো লোভ কেন সবার?

প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শনী শেষে আলোচনা অনুষ্ঠানে যোগ দেন সাংবাদিক ও লেখক আফসান চৌধুরী, চলচ্চিত্র নির্মাতা মানজারে হাসিন মুরাদ, শিক্ষক আহমেদ কামাল এবং রেহনুমা আহমেদ। আলোচকদের সবাই একবাক্যে বলেন, নারী মুক্তিযোদ্ধাদের এই গাঁথা আজ সবাইকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। যে বর্বর ধ্বংসলীলা পার হয়ে এসেছে তাঁদের শরীর, মর্যাদা ও জীবন, স্বাধীনতার ৪৩ বছরেও তার শুশ্রুষা হয়নি। বিষকাঁটা চলচ্চিত্র তাঁদের সেই হৃদয়ের জ্বালামুখখানিই তুলে ধরতে চেয়েছে। নীরবতার পাথর ভেঙে মুক্তিযুদ্ধের আরেক ক্ষতমুখ জানার চেষ্টা করেছে।

আহমেদ কামাল বলেন, বার বার এইদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা হয়। কিন্তু প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা এবং নারী মুক্তিযোদ্ধাদের কমই সেখানে স্থান পান। এটাই আমাদের দীনতা, আমাদের ইতিহাসের দীনতা।

আলোচকরা যখন একাত্তরে নির্যাতিতা নারীদের সম্মান জানানোর কথা বলেন, দাঁড়িয়ে তাদের প্রতি সম্মান জানান, একাত্তরের জননী রমা চৌধুরীর তখন শ্বাস-প্রশ্বাস ঘন হয়ে উঠে। গলার কাছে জমাট বাঁধে পুরনো কষ্ট। এই প্রতিবেদক তখন তাঁকে জড়িয়ে ধরলে একফাঁকে রমা চৌধুরী ফিসফিসিয়ে বলেন, ‘এই যে বিষকাঁটা নাম প্রামাণ্য চিত্রের, এই বিষকাঁটা তো আমরাই, তাই না’? প্রতিবেদক তখন বলেন, না মা, বিষকাঁটা আসলে আমাদের সবার গলায় আটকে আছে, কিছুতেই তা নামাতে পারছি না। যেদিন পারবো, সেদিন জাতি কলংকমুক্ত হবে। আমরা সেদিনের অপেক্ষায়। রমা চৌধুরী ম্লান হাসেন প্রতিবেদকের মুখের দিকে চেয়ে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৪০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.