সাহেরা কথা- ২৬

Woman-depressed-500x368লীনা হাসিনা হক: সাহেরা’র মেয়ের বিয়ে! চমকে উঠলাম, সাহেরার বড় মেয়েটির বয়স পনের হবে, রংপুরের গ্রামে সাহেরার বাবা মায়ের সাথে থাকে, ক্লাস নাইনে পড়ে। সাহেরার ইচ্ছে মেয়েকে এসএসসি পাশ না করিয়ে বিয়ে দিবে না। কিভাবে কি হলো জানতে চাইলাম।

সাহেরার বাবা নাতনীর বিয়ে ঠিক করে ফেলেছেন পাশের গ্রামের এক ছেলের সাথে। ছেলে কাঠ মিস্ত্রির কাজ করে, বয়স ১৭। ছেলে পক্ষ এসে মেয়ে দেখে গেছে, তাদের খুব পছন্দ হয়েছে। বিয়ের কথা পাকা। ছেলেকে বিয়ের পোশাক আশাক, একটি সাইকেল আর সত্তর হাজার টাকা নগদ যৌতুক দিতে হবে। কুড়ি হাজার টাকা বিয়ে পড়ানোর সময়, আর বাকী টাকা ধানের মৌসুমে। সামনের শুক্কুরবারেই বিয়ে, আজ রবিবার! সাহেরাকে গত রাতেই তার বাবা ফোন করে এই সুসংবাদ জানিয়েছে! সাহেরা যেন হাজার কুড়ি টাকার ব্যবস্থা করে বুধবার রাতের গাড়ীতে রওনা হয়!

জিজ্ঞ্যেস করলাম, সাহেরা কি করবে এখন? মলিন মুখে সে বলে, ‘আফা, তোমরাই কহেন, মুই কি করিম?’  বললাম, মেয়ের বয়স ১৫, পাত্রের বয়স ১৭, আইনত তো এই বিয়ে হয় না। সাহেরা জানালো, এটা সে জানে। তাহলে? বাবা কথা দিয়ে ফেলেছে, সেই কথার নড়চড় করবে না বলে জানিয়েছে। এতো টাকা এই মুহূর্তে সে জোগাড় করবে কিভাবে? সাহেরা চোখে আঁচল চাপে।

মেয়ে কি বলে? মেয়ে আছাড়ি পিছাড়ি কাঁদছে, সে বিয়ে করতে চায় না, পড়তে চায়। সাহেরার মেয়ের সাথে কথা বলতে গিয়ে নিজের চোখের জল ধরে রাখতে পারি না, টেলিফোনের ওপার থেকে মেয়ের ফোঁপানো গলা শুনি, ‘খালামনি, কিছু করো তোমরা, আমি বিয়া করতে চাই না। আমি গোল্ডেন জিপিএ পাবো ম্যাট্রিক পরীক্ষায়। তুমি না বলেছ মেয়েদের পড়াটাই আসল শক্তি!” আমি উত্তর দিতে পারি না, নিজের বলা কথা নিজের গলায় ফাঁস হয়ে লটকে থাকে!

আমি আর আমার বোন অনেকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলাম। সাহেরাকে দিয়ে তার বাবার সাথে কথা বলালাম, অন্তত পক্ষে আকদ করে রাখুক, মেয়ে না হয় পরে উঠিয়ে দিবে, মাত্রই ১৫ বছরের মেয়ে। আইনী কথাও জানানো হল, সবই ঠিক আছে, কিন্তু নাতনীর বিয়ে সে দেবেই যেখানে কথা দিয়েছে।

শেষ পর্যন্ত আমি নিজেই কথা বললাম সাহেরার বাবা-মায়ের সাথে। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, এই রকম পাত্র আর পাওয়া যাবে না।  তাঁরাও বুড়ো হয়েছে। দেশের পরিস্থিতি ভালো নয়। মেয়ের মা-বাবা থাকে ঢাকায়। মেয়ে স্কুলে যায় প্রায় দেড় কিলোমিটার হেঁটে। রাস্তায় ছেলেরা নানা রকম মন্তব্য করে। কোনদিন কোনও অঘটন ঘটে গেলে কে সেই দায়িত্ব নেবে আর মেয়েটারই বা কি হবে! কিন্তু এই বিয়ে রেজিস্ট্রি হবে কিভাবে, ছেলে-মেয়ে দুজনেই তো অপ্রাপ্তবয়স্ক! সেই ব্যবস্থাও পাকা, ছেলে পক্ষ কাজী নিয়ে আসবে, সেই-ই যা করার করবে।

যৌতুকের টাকার বিষয়ে বললাম, এতো টাকা সাহেরা কোথা থেকে দেবে! আর এতই যদি মেয়ে পছন্দ তাদের, তাহলে যৌতুক চাইছে কেন? শুনলাম, যৌতুক ছাড়া কোনও বিয়েই দেশ গেরামে হয় না। তাও এক লাখ টাকা থেকে সত্তর হাজারে নামানো হয়েছে।

ছেলের বাবার সাথে কথা বললাম। নাহ, বিয়ে ঠেকানো গেলো না দফায় দফায় কথা বলেও, তবে যৌতুকের টাকা ষাট হাজারে নামলো।

নিজেকে এতো অসহায় লাগছিল। আমার ভাইয়ের সাথে কথা বললাম, সে পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। বলল, আপা, ওই থানায় ফোন করে বিয়ে ঠেকিয়ে দিতে পারি এখুনি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এরা লুকিয়ে বিয়ে দিবেই। তুমি বরং চেষ্টা করো, যাতে মেয়েকে পড়ালেখাটা করতে দেয়।

জানতে চাইলাম, সাহেরা, তোমার স্বামী কি বলে? সাহেরা মুখ বেঁকায়, ‘আফা, ওর কথা আর না কহেন, ওমায় (সে) মাছেও নাই, গোসেও নাই! মানে কি? মানে হল সে এক টাকাও দিতে পারবে না, আর মেয়ে যেহেতু নানা নানীর কাছেই বড় হয়েছে তাই এটা নানা-নানীরই দায়িত্ব। সাহেরা কপাল চাপড়ায়, ‘স্বামী যদি ঠিক থাকতো আফা, তাইলে কি আমার এই দশা হয়? তুমি তো জানেন সগি (সবই)’। জানিতো সবই, কিন্তু এখন এই মুহূর্তে সাহেরার এই টাকার জোগাড় কিভাবে হবে আর বিয়েটাই বা ঠেকানো যায় কিভাবে?

আবার কথা বলি সাহেরার বাবার সাথে, মেয়ে মাত্র পনের বছর বয়স, একেতো আইনে দণ্ডনীয়, তার উপরে যৌতুক আরেক অপরাধ। এদিকে এই ছোট্ট মেয়েটা বিয়ের একবছরের মাথায়ই গর্ভধারণ করবে। সাহেরার বাবা বিয়েটা অন্তত একটা বছর পিছিয়ে দিক! সাহেরার বাবার কথা টেলিফোনের অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে, ‘মায়ও (মাগো) তোমরা যাহা কহেছেন সগি সত্য, কিন্তু হামার ঘরের ( আমাদের) কথাটাও চিন্তা করেন। মাইয়া ডাঙ্গর হইছে। গাও গেরামে অঘটনের কোনও বাপ-মাও নাই। কিছু যদি এই মাইয়ার হয়, হামরা কি করিম? মাইয়ার বাপের তো কুন তালবেতাল নাই। এখন মাইয়ার বিয়া হইলে সাহেরাও নিসচিন্তি হইবে। তোমরা আর কিছু না কহেন বাহে, আমার অনুরোধ!’

ফোন কানে বধির হয়ে বসে থাকি! কি করতে পারি আমি, কি করতে পারবো আমি এই ছোট্ট মেয়েটার জন্য, যে স্বপ্ন দেখে স্কুল পাশ করে কলেজে পড়বে!

আমার নিজের মেয়ে এসে পাশে বসে, আমাকে বোঝায়, মা তুমি তো ওদেরকে বোঝাতেই চেষ্টা করেছো, ওরা নিজের ভালো না বুঝলে কি আর করা। তুমি বরং পুলিশে খবর দাও। বুঝতে পারি না কি করবো।  সাংবাদিক বন্ধু লাইলীর সাথে ফোনে কথা বলি, সে থাকে কুড়িগ্রামে।

সে শোনায় আরও মর্মান্তিক কথা। এখনো গ্রামে শতকরা ৮০ ভাগের বেশী মেয়ের ১৪ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে বিয়ে হয়ে যায়। আর যৌতুক! যৌতুক বিরোধী আইন একটি বিশাল কৌতুকে পরিণত হয়েছে। কিছু বাল্য বিবাহ যে রোধ হচ্ছে না তা নয়, কিন্তু তার সংখ্যা হাতে গোনা যায়। আবার সেই সব আপাত রোধ করা বিয়েও কিছুদিন পরেই লুকিয়ে দিয়ে দেয়া হয়। সরকারের জন্ম নিবন্ধন আর বিবাহ নিবন্ধন বরং সংশ্লিষ্ট লোকজনের টাকা রোজগারের উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কিছু টাকা জোগাড় করে দিয়েছি, সাহেরা রওনা হয়ে গেছে বাড়ীর উদ্দেশে। যাওয়ার আগে সে অনেক কাঁদল, আমি শুকনো জ্বালা ধরা চোখে বসে রইলাম। অক্ষমতার যন্ত্রণা আর মেয়েটির হাহাকার ভরা কান্না আমাকে তাড়িত করতে থাকলো। তবু আমি বসেই রইলাম।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.