স্বপ্ন দেখি

amar bhashaতানিয়া মোর্শেদ: পৃথিবীতে সাড়ে ছয় হাজারেরও বেশি ভাষার মধ্যে বাংলা ভাষার স্থান সপ্তমে, কতজন এ ভাষায় কথা বলেন সে বিচারে। প্রতিদিন অনেক ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাবে। বাংলা ভাষা হারাবার ভয় নেই। প্রথমত জনসংখ্যার জন্যেই। অন্তত একটি উপকারিতা পাওয়া যায় অতিরিক্ত জনসংখ্যার!

কিন্তু এখানে একটা “কিন্তু” আছে! আজকের শিক্ষিত বাংগালী সমাজ কি বাংলায় কথা বলেন? উচ্চবিত্ত সন্তানরা ইংরেজী মাধ্যমে পড়ে অনেক আগে থেকেই। এখন মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তানও একই পথের পথিক। ইংরেজী মাধ্যমে কেন পড়ে, পড়লে কি ক্ষতি না লাভ এসবে আমি যাচ্ছি না। আমার শুধু প্রশ্ন বাংলাদেশে বাস করে বাংগালী ঘরের সন্তান কেন শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে পারে না? পড়তে জানে না? লিখতে জানে না? কারা ইংরেজী মাধ্যমের স্কুলের পাঠ্যসূচি তৈরি করেন? সেখানে কি বাংলা একটি আবশ্যিক বিষয় নয়? যদি না হয় তবে কেন নয়? আর যদি আবশ্যিক হয় তাহলে ছাত্র-ছাত্রীদের এমন করুণ অবস্থা কেন? কেন তারা এমন বিকৃত উচ্চারণে বাংলা বলে? অংক, বিজ্ঞান, ইংরেজী ইত্যাদি বিষয়ে কম জ্ঞান নিয়ে কি কেউ সফল হয় স্কুলে? না স্কুল বা অভিভাবক খুশী থাকেন? তাহলে বাংলার এমন করুণ অবস্থা কেন কাউকে বিচলিত করে না? এখানে কি স্কুল, অভিভাবকদের উন্নাসিকতাই প্রধান নয়? যে দেশের মানুষ মাতৃভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে সে দেশে কিভাবে এই উন্নাসিকতার জন্ম? আর এর সাথে আছে, টিভিতে সারাক্ষণ হিন্দী চ্যানেল দেখা। আবার যোগ হয়েছে আরবী শব্দ ব্যবহার কথায় কথায়! ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো কি বাংলায় যায় না? কেন খিচুড়ি ভাষায় কথা বলা?

আমার সন্তান আড়াই বৎসর হবার আগেই প্রিস্কুলে দিয়েছিলাম। সমবয়সীদের সাথে সময় কাটানোই প্রধান কারণ। ক্লাসের শিক্ষিকা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ও কি বাড়ীতে মাতৃভাষায় কথা বলে? আমরা হ্যাঁ বলেছি। বলেছি ওর সাথে কোনো ইংরেজী বলি না। শিক্ষিকা খুশী হয়ে বলেছিলেন, ঠিক করেছো। সব সময় ওর সাথে তোমাদের ভাষায় কথা বলবে। ও শিখবে তাহলে। তার নিজের সন্তানরা তিন ভাষায় কথা বলে। বাবার ভাষা, মায়ের ভাষা আর ইংরেজী। অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, ছোট ছেলে-মেয়েরা এক সাথে তিনটি ভাষা শিখতে পারে, অসুবিধা ছাড়াই। যারা একাধিক ভাষায় কথা বলে, তাদের ব্রেইন অন্যদের থেকে অনেক কিছু ভালোমত চিন্তা করতে পারে। এগুলো বিভিন্ন সময়ে গবেষণায় জানা গেছে।

আমার সন্তানের সাথে এখনো বাংলায় কথা বলি। কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনায় যদি সে বা তার বাবা একটু বেশী ইংরেজী বলে, আমি মনে করিয়ে দেই। বাংলাদেশে গেলে যখন অচেনা কেউ জানতে চায় ও বাংলা বোঝে কিনা, খুব আহত হয়। ওর উলটো প্রশ্ন (আমাদের, অচেনা মানুষকে নয়), “কেন ওরা অবাক হয় আমি বাংলা বলি শুনে?” আমি তখন নির্মম সত্য বলি বাধ্য হয়ে, “অনেক বাংলাদেশী ছেলে-মেয়ে ভালো বাংলা বলে না (বাংলাদেশে জন্মে, বাস করে) তাই তারা অবাক হয় তোমার কথায়।” কিন্তু তার মন খারাপ থাকে।

কখনো হয়ত আমি আর তার বাবা কিছু বলছি, যা তাকে বলতে চাই না, এসে জিজ্ঞাসা করবে কি বলছো? যদি বলি তুমি বুঝবে না (বয়স বা অভিজ্ঞতা না থাকবার জন্য), সে ভীষণ আহত হয়, “বলে আমি কি বাংলা বুঝি না?” তখন বলি, ভাষার কথা বলিনি। বিষয়বস্তুর জন্য তোমাকে বলতে চাইছি না। আরো বড় হও, ইত্যাদি।

অনেক ছোটবেলা থেকে বাংলাদেশ, দেশের ইতিহাস জানা তার আগ্রহ। বাংলা পড়া-লেখা শিখতে চেয়েছে। বেশ কয়েক বৎসর আগে বাংলা স্কুল করতাম। তখন প্রায় বৎসর দুয়েক শিখেছিল। আর শেখা হয়নি। কিন্তু মাঝে মাঝেই দেখি বাংলা পড়বার চেষ্টা করে। বিশেষত বাংলাদেশে গেলে। রাস্তার সাইনবোর্ড পড়তে চায়, বই-এর দোকানে বই-এর নাম পড়তে চায়। বুঝি নিয়মিত নিয়ে বসলে শিখে যাবে পড়তে। কিন্তু সময় নেই তার। ভাবি, বাংলা স্কুলে সময় ও এনার্জি (স্বেচ্ছাসেবা) না দিয়ে যদি নিজের ছেলেকে পড়াতাম! এতদিনে অনেক ভালো মত শিখে যেতো।

স্কুলে দ্বিতীয় ভাষা স্প্যানিশ শিখছে। অনেক ভাষা শেখার ইচ্ছে, জাপানিজ শিখতে চায়! স্প্যানিশ ভালো মত শিখবার পর অন্য কিছু শিখতে বলেছি। আর বাংলা তো শিখতেই হবে। রবীন্দ্রনাথ, লালন, জীবনানন্দ, সুকান্ত, মানিক, বিভূতিভূষণ, নজরুল কিছুই পড়বে না, জানবে না?! আমি স্বপ্ন দেখতেই পারি!

একবার একজনকে বলেছিলাম, জীবনের না করা কাজ বা ভুলের হিসেব করতে বসে ভাবি, কেন আমি এই সব মানুষদের লেখা, কাজ অনুবাদ করবার চেষ্টা করলাম না? পৃথিবীর মানুষ জানতে পারলো না কী তারা পেলো না, পাচ্ছে না! তার কথায় ধাক্কা খেলাম! সে বললো, বিদেশীদের কথা ভাবছো? কয়জন বাংলাদেশী তাঁদের লেখা পড়েছে, পড়ে? আমি নিশ্চুপ!

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.