আমার সকল গান- ৫

Shamsশারমিন শামস্: হিজাব নিয়ে ফেসবুকে কোন কিছু লিখলে, সাথে সাথে দুই ভাগে বিভক্ত মানুষের দেখা পাওয়া যায়, যেটা খুবই স্বাভাবিক। আমার বন্ধু তালিকায় হিজাবধারী বন্ধুও আছেন। অতএব, তাদের মনের গোপন বা প্রকাশ্য কথা আমাকে শুনতে হয়। যারা হিজাব করছেন, তাদের অধিকাংশকেই আমি আগে জিনস-টপ কামিজ পরে ঘুরে বেড়াতে দেখেছি। এখন তারা বলছেন, বিভিন্ন বইপত্র পড়ে, নানা লেকচার শুনে আজ তাদের মধ্যে পরিবর্তন এসেছে। তারা আজ আল্লাহর ভয়ে এবং তাকে খুশি করতে হিজাব করছেন।

ভালো! ধর্ম মানুষকে শান্তি দেয়। ধর্মে মতি ফেরে। ধর্মে সহনশীলতা, সহিষ্ণুতা আসে। যার যার ধর্মের প্রতি অনুরাগ বা বিরাগ যার যার নিজস্ব স্টাইলে রয়েছে। ব্যাক্তিগতভাবে আমিও বেশ আস্তিক মানুষ। সৃষ্টিকর্তার প্রতি আমার বিশ্বাস আর আস্থা আছে। জীবনের বড় বড় সংকটে খোদার প্রতি অটল বিশ্বাস রেখেই আমি সব কিছু উৎরে গেছি বলেই আমার ধারণা। যাই হোক। ধর্ম সংক্রান্ত পড়াশোনা একটি বিশাল বিস্তৃত ব্যাপার। আমি চেষ্টা করছি একটু আধটু। কিন্তু এখনও সেই সাগরকূলে নুড়ি কুড়াবার মতই ব্যাপার। আশা করছি দু’একটি বড় পাথর আর প্রবাল জুটবে আমার ঝুলিতে।

যাই হোক, হিজাব নিয়ে ইদানিং অনেক কথাই হয়। পথে ঘাটে বাজারে দোকানে গেলেই হিজাব পড়া মেয়ে দেখি। সেই তুলনায় দাড়িওয়ালা নূরানী চেহারার পুরুষ নগন্য। হিজাবধারীর পাশে দণ্ডায়মান স্বামী বা ভাই অতি আধুনিক পোশাক পরা, এমনই সচরাচর দেখা যায়। তো হিজাব নিয়ে লিখতে বসলাম, কারণ হিজাব নিয়ে না লিখে পারলাম না বলেই। বারবার বিষয়টা সামনে এসে পড়ছে। আমার পরিচিত এ নারী একবার ফোন করলেন আমাকে। তিনি একজন ফ্যাশন সচেতন হিজাব পরা নারী। পাতলা ফিনফিনে শাড়ী আর কড়া মেকাপের সঙ্গে মাথায় জমকালো হিজাব ব্যবহার করেন। হিজাব মাথায় আবার নানারকম পিন এক্সেসরিস অর্নামেন্ট লাগানো থাকে।

তিনি একদিন আমাকে ফোন করে বললেন, তার হিজাবের একটি দোকান আছে, যেখানে অসাধারণ সব হিজাব পাওয়া যায়। তার কথা শুরুই হল এভাবে, ‘হিজাব এখন প্রায় অত্যাবশ্যকীয় একটি অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে আমাদের জীবনে।’ এই কথার পর আর বেশিক্ষণ চুপ থাকা যায় না। আমি ঠোঁটকাটা বেয়াদপ, এটা সবাই বলে।

আমি বললাম, ‘হিজাব অনুষঙ্গ বাঙালি মেয়েদের? কখনোই না। এটা হয়তো আপনার বা আপনার মত যারা, তাদের অনুষঙ্গ।’ শুনে উনি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর আবার বললেন, ‘আমার হিজাবের দোকানের একটু পাবলিসিটি দরকার।  আপনাদের টেলিভিশনে কি কোন ফ্যাশন প্রোগ্রাম হয়, যেখানে আমার হিজাবের দোকানের উপর কোন রিপোর্ট করানো যাবে?’

আমি তাকে বললাম, এধরনের প্রোগ্রাম আমাদের টিভিতেও হয়, অন্যান্য টিভিতেও হয়। তবে মুশকিল হল, আমার বিশ্বাস, দিগন্ত ছাড়া আপনার জন্য আর কোন টিভি এই জিনিস করতে রাজি হবে না। কারণ আমাদের চ্যানেলের আদর্শের সাথে হিজাব সাংঘর্ষিক। কোন মেয়ে হিজাব পড়লে তাকে আমরা ক্যামেরার সামনে আনি না। যদি সে ক্যামেরার সামনে কাজ করতে চায়, তাকে হিজাব খুলে স্বাভাবিক বাঙালি পোশাকে আসতে হবে। অতএব এরকম অবস্থায় হিজাবের প্রচারণা চালানোর প্রশ্নই আসে না। আমার কথাবার্তায় তিনি খুবই বিরক্ত হলেন। যদিও খুব ভদ্রভাবেই কথা শেষ করলেন। আমিও চেষ্টা করেছি যতটা সম্ভব তাকে বুঝিয়ে বলতে। জানি না কতটুকু সফল হয়েছি।

এই প্রসঙ্গে আরেকটি কথা বলে রাখি, আমি সর্বশেষ যে চ্যানেলে কাজ করছি, সেখানে হিজাব পড়া একটি মেধাবী মেয়ে নিউজ পড়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। তাকে নিউজ পড়তে দেয়া হয়েছে, তবে হিজাব খুলেই তাকে বসতে হয়েছে ক্যামেরার সামনে। মেয়েটি এখন ক্যামেরার সামনে হিজাবহীন, ক্যামেরার পিছনে হিজাবধারী। জানি না, এতে তার কোন পূণ্য হাসিল হচ্ছে!

হিজাব কেন পরা হয়? বিপরীত লিঙ্গের সামনে নিজেকে ঢেকেঢুকে রাখার জন্যই তো। আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে মেয়েদের হাত পা মুখ দেখলেও পুরুষের জীবনযন্ত্রণা শুরু হয়ে যেতো আর তারা নারীটির উপর প্রকাশ্যে নির্যাতন করতো। অতএব মহানবী (সাঃ) এর আদেশে নারীর নিরাপত্তার স্বার্থেই তাকে ঢেকে রাখতে বলা হল তার আকর্ষণীয় অংশ। পুরুষকেও দেয়া হলো চোখের দৃষ্টির সংযম সাধনের নির্দেশ। সেই আইয়ামে জাহেলিয়াতে সুদূর আরব দেশে নারী প্রখর রোদে বাইরে পানি আনতে যেত, মরুভূমির তপ্ত বালুর উপর দিয়ে হেঁটে যেতো। ঘরের ভিতরে বাইরে অবর্ণনীয় আবহাওয়া সহ্য করতে হতো তার কোমল চামড়াকে।

পুরুষদের ক্ষেত্রেও আবহাওয়া মোকাবেলা ছিল একটি বড় ব্যাপার। স্বাভাবিকভাবেই সেই যুগে বোরকা বা আবায়া টাইপ পোশাক নারীর জন্য এবং পুরুষের জন্য আলখাল্লা, আবহাওয়া মোকাবেলার জন্য অত্যাবশ্যকীয় ছিল। আরবের নারী ঘর সামলাতো। সেই  ‍যুগে প্লেন আবিস্কার হয়নি যে সে পাইলট হবে, সংবাদপত্র ছিল না যে সাংবাদিক হবে, এনজিও ছিল না বলে তার উন্নয়ন কর্মী হওয়ার সুযোগ ছিল না। ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার কোন কারণ বা সুযোগ তৈরি হয়নি নারী পুরুষ কারো ক্ষেত্রেই। এই পেশাগুলোর বিশেষভাবে উল্লেখ করলাম এই কারণে যে, এই বিশেষ পেশাগুলোয় কীভাবে হিজাব পরে কর্মকাণ্ড পরিচালনা সম্ভব আমার জানা নেই।

জাহেলিয়াতের যুগে, নারীর পুরুষের সাথে কথা বলা, চলা ফেরা, সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। নারীর কণ্ঠ বাইরের পুরুষের কানে যেন না যায়, সে ব্যাপারেও কড়াকড়ি ছিল। আজ যদি হিজাবের পাশাপাশি সেইসব কড়া নির্দেশও মানতে হয়, তবে নারীকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে সেই সহস্র বছর আগের আরবে। আর যদি সেইসব বাদ দেই, আমার প্রশ্ন, শুধু হিজাবটুকু রেখে আর বাকি সব বাদ দেয়া কেন?
নারীকে একটি ভোগ্যপণ্য বলে ভাবা হয় বলেই, পুরুষ নারীর প্রতি নোংরা দৃষ্টি হানতো, আজো হানে। এই দায়ভার সম্পূর্ণ পুরুষের। মজার ব্যাপার হলো, যে পুরুষ রাস্তায় কামিজ, শাড়ি, ফতুয়া পরা নারীর দিকে প্রকাশ্যে বেপরোয়াভাবে লালসার দৃষ্টি হানে, উন্নত দেশের সমুদ্র সৈকতে গিয়ে তার বিন্দুমাত্র সাহস হবে না প্রকাশ্যে সেই একই কাজ করার। ভিতরে ভিতরে ফেটে পড়লেও সংযমী আচরণ করতে বাধ্য হবে সে। তাহলে হিজাবটা আসলে কার প্রয়োজন? আসল হিজাব কোনটি, একখণ্ড রুমাল নাকি নারীর প্রতি সমাজের আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি, রীতিনীতি, সভ্যতা, ভদ্রতা, সঠিক আচরণ?

পুরুষ শুধু নয়, অনেক নারীই নিজেকে ভোগ্যপণ্য বলে ভাবতে পছন্দ করেন। তাই হাত ঢাকেন, মুখ ঢাকেন, মাথা ঢাকেন। যে পুরুষটির সামনে ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে বড় হয়েছেন, পড়াশোনা করেছেন, আড্ডা দিয়েছেন, তার সামনে বিশগজ কাপড়ে নিজেকে জড়িয়ে উপস্থিত হন। বিষয়টি সেই পুরুষটির জন্যও অবমাননাকর। আজ যদি কোন মেয়ে নাচতে চায়, অভিনয় করতে চায়, মডেল হতে চায়, সার্কাস করতে চায়, হিজাব তাকে সেই অনুমোদন দেবে না। কোন মেয়ে যদি সেনাবাহিনীতে বিমান বাহিনীতে নৌবাহিনীতে যায়, পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেয়, হিজাব তার মূল ইউনিফর্মের সঙ্গে নেই। তার মানে এইসব পেশায় তার যাবার সুযোগ নেই।

যদি কোন মেয়ে দারুন টেনিস খেলে, সাঁতার কাটে তার তবে সর্বনাশ। সাঁতারের পোশাক, টেনিসের পোশাক তো হিজাবের সাথে রীতিমত সাংঘর্ষিক। সে যদি খুব ভালো সাঁতারু বা টেনিস প্লেয়ার হয়, তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গিয়ে খেলার জন্য, সাঁতারের জন্য তাকে পড়তে হবে ছোট পোশাক। যাহ, তখন সে কী করবে?

এই ২০১৫ সালের এই বিশ্ব প্রেক্ষাপটে হিজাব কেন আবার নতুন করে যুক্ত হলো সাড়ম্বরে? আবার ধারণা ফ্যাশন ট্রেন্ড নামের বিষয়টিকে কাজে লাগিয়ে ঘটনাটি ঘটিয়েছে একটি বিশেষ মহল। হিজাবকে আকর্ষণীয় কাপড়ে তৈরি করে, নানারকম অ্যাক্সেসরিজ লাগিয়ে, ঝলমলে করে তুলে, কিছু ডাকসাইটে মার্কা সুন্দরীর মাথায় চড়িয়ে, সাথে কড়া মেকাপ আর অলঙ্কারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সহাবস্থান ঘটিয়ে, হিজাব এদেশের একশ্রেণীর মূর্খ নারীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে।

হিজাব পরলে দেখতে সুন্দর লাগছে, আবার সবাই বেশ ভালো মেয়ে বলছে, এই বাসনা থেকেও অনেকে হিজাব মাথায় চড়ায় আজকাল। হিজাবের বিক্রি বাড়ছে হু হু করে। সাথে পিন, ক্লিপ কত কী। দামও নাগালের মধ্যে। টাইট জিন্সের সাথেও হিজাব পরতে দেখলাম সেইদিন। পহেলা ফাল্গুনে বাসন্তী হলুদ হিজাবের উপর হলুদ ফুল লাগানো। হায়রে বাঙালি। হায়রে বাঙালি ললনা। মানুষ হয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলে বলেই হয়তো কোন এক বিশেষ মহলে হৈ রৈ পড়ে গিয়েছে। তারা তাই সুকৌশলে ঢুকে পড়েছে তোমাদের ওয়্যারড্রোবে। তারই ধারাবাহিকতায় ছাড়তে হবে তোমাকে অনেক কিছু। সীমিত হয়ে আসবে তোমার পৃথিবী।

হায়রে বাংলাদেশের মেয়ে। মুক্তির গানে দেখা সেই সাহসী নারী। ছোট হাতা ব্লাউজ আর রঙীন সুতি শাড়ী, লাল কালো টিপ, বড় খোঁপায় শাহীন সামাদ। মিষ্টি মুখের সেই তারা, মাতৃভূমির জন্য লড়াইয়ে এগিয়ে আসা সাহসী নারীরা। ৫২ এর ভাষা আন্দোলনের সেই মিছিলে হিজাবহীন নারীরা! সেই ৬০ বা ৭০ এর দশকের আন্দোলনের ছবিগুলোতেও হিজাবহীন নারীরা। একাত্তরে রণাঙ্গনে নারীদের যে দৃশ্যটি সব জায়গায় দেখা মেলে, সেই পোস্টারেও হিজাব নেই নারীদের মাথায়-শরীরে-মননে।

তখন কোথায় ছিল এতো হিজাব! কেন ছিল না? আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে!

লেখক- সাংবাদিক

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.