নারীকে একাই লড়াইটা চালাতে হয়

Canada Tribalsরওশন আরা বেগম: হঠাত একটা কলিং বেলের শব্দ। খুব নীরবতার মাঝে শব্দটি বিরক্তকরই নয়, কিছু একটা থামিয়ে দিল মনে হলো। ছুটির দিনে এই দুপুরে কে হতে পারে? মাঝে মাঝে ভেন্ডর ও ধর্ম প্রচারকেরা এই অসময় এসে এই কাজগুলো করে থাকে।

ভাবতে থাকি, ঠিক এর মধ্যেই বেলের আওয়াজটি আরো তীব্র হতে থাকে। কিছুতেই বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছা করছে না। এই মূহূর্তে বাসায় কেউ নেই। তাই আমাকেই উঠতে হলো। দরজা খুলতেই কেচী বলে উঠলো কি ব্যাপার তোমার টেলিফোনটি অনেক সময় ধরে বিজি দেখছি। তাই চলে এলাম। ফোন সেটটি চেক করতেই দেখা গেল ফোনটি অন করে রাখা হয়েছে। অনেক সময় যাবত ফোনটি অন করে রাখা ছিল বুঝি। হ্যাঁ তাই তো মনে হয়েছে,কেচী উত্তর দিলো।

নাইজেরিয়ার থেকে আগত এই নারী, বয়স ৩৩ বছর। তিন সন্তানের জননীও বটে। প্রথম দর্শনে যে কেউ ভয়ে পালিয়ে যেতে উদ্যত হবে। তার কথাবার্তা চাল-চলন দেখার পর সেই ধারণাটি একেবারেই পাল্টে যাবে। ঠিক গরিলার মুখছবি তার বিশাল দেহে বসানো। কন্ঠস্বরটি বেশ ভারী। অসাধারণ এই নারীর সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়েছে প্রায় ৫-৬ বছর হতে চলছে। একই ভবনে থাকায় প্রায় আসা যাওয়া চলে। তার স্বামীটি দেখতে শুনতে তার থেকে অনেক ভাল মনে হলেও সে আসলে এক মানসিক ভংগুর লোক। এই কেচী তাকে বিয়ে করে একটু একটু করে সুস্থ্ করে তুলছে।

খুব মানবিক সম্পন্ন মানুষের অকৃত্রিমতার গন্ধ তার গায়ে সব সময় লেগে থাকে। তার হাসির মধ্যে আমি দেখতে পাই অকৃত্রিম ভালবাসায় আবিষ্ট এক জ্বলন্ত মানবতার প্রতীক। যে মানবতা সে ছড়িয়ে দিয়েছে চারিদিকে। এই কানাডায় এসেছে প্রায় সাত বছর হতে চলছে। এর মধ্যে তিন সন্তানের মা হয়েছে, স্বামীকে সুস্থ্ করে তুলেছে, নিজে বিশ্ববিদ্যালয়ে নার্সিং এর উপর পড়াশোনা করছে। অনেক তার অর্জন। তাকে দেখলে কোন এক কারণে যদি কেউ দূরে সরে যায় তাহলে বুঝতে হবে মানুষের বাহ্যিক চেহারা দেখে প্রথম সিদ্ধান্তে আমরা মস্ত বড় ভুল করে থাকি। প্রথম আলাপেই আমি তার মধ্যে অন্যকিছু দেখেছিলাম।

প্রচণ্ড এই সাহসী কেচীকে কেউ দমাতে পারেনি। বাহ্যিক চেহারা দেখে তাকে অনেকেই অবজ্ঞা করেছে, ছুঁড়ে ফেলার চেষ্টা করেছে অনেকেই। আর সেই সব না-বলা কথাগুলো আমাকে বলে তার দৃঢ়চিত্তকে আরো সাহসী করে তোলে। এই কানাডায় থেকেও অনেক জায়গায় সে বর্ণ বৈষম্যের শিকারও হয়েছে। এমনি কি ক্লাসরুমের শিক্ষকের কাছ থেকেই নানা অবজ্ঞামূলক ব্যবহার পেয়ে থাকে। কিন্তু কোন কিছুই তাকে হার মানাতে পারেনি।

তার স্বামী দেখতে বেশ হ্যান্ডসাম। নাইজেরিয়ার এক গরিব পল্লীতে তার জন্ম হয়। মাত্র তিন বছর বয়সে সে তার পিতা মাতাকে হারিয়ে ফেলে। দাদীর কাছে লালিত পালিত হয় অভাব অনটনের মধ্যে। সেই ছোটবেলায় অভাবের সংসারে চলে প্রচণ্ড অবহেলা। কোন রকম হাইস্কুল শেষ করেই পাড়ি জমায় মিশরে। সেখানে শ্রমিক হিসাবে ছয় বছর কাজ করে কিছু পয়সা জমিয়ে সেখান থেকে দালালের মাধ্যমে পাড়ি জমায় মেক্সিকোয়। সেখানে দুই বছর কাটিয়ে গোপনে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আমেরিকায় প্রবেশ করে।

এইভাবেই আমেরিকায় এসে উন্নত জীবনের সংস্পর্ষে আসার সুযোগ পায়। দীর্ঘ ১০ বছর পরেও সেখানে বৈধ কোন কাগজ না পেয়ে অবশেষে কানাডায় টুরিস্ট ভিসা নিয়ে প্রবেশ করে। শেল্টারে আশ্রয় নিয়ে কারখানার শ্রমিক হিসাবে কাজ শুরু করে। অবশেষে পরিচয় হয় এক কানাডিয়ান নারীর সাথে। তাকে সব সমস্যার কথা খুলে বলে। কানাডায় থাকার বৈধ কাগজ না মিললে তার আত্মহত্যা ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না। তার সব কথা শুনে ভদ্রমহিলার মনে দয়া জন্ম হয়। সে তাকে প্রস্তাব দেয় আমি তোমাকে কাগজ তৈরি করে দিবো। কাগজ কলমে আমি তোমাকে বিয়ে করলেই তোমার কাগজ হয়ে যাবে। বিনিময়ে আমাকে সামান্য কিছু টাকা দিলেই হবে। এভাবেই কেচীর স্বামী কানাডায় থাকার বৈধ কাগজপত্র পেয়ে যায়। পরে কাগজ-কলমে ডিভোর্স দিয়ে সমস্যা মিটিয়ে ফেলে।

কাগজ পেয়েই নাইজেরিয়া গিয়ে কেচীকে বিয়ে করে নিয়ে আসে। শুরু হয় এখানে আরেক ধরনের জীবন সংগ্রাম। তার স্বামীর যাযাবর জীবনের অবসান হলেও মনের ভিতরের যাযাবর ভাবটি মাঝে মাঝে জেগে উঠে। আর কেচী অত্যন্ত

দক্ষতার সাথে সেই সংগ্রাম চালিয়ে যায়। সুস্থ্ একটা পারিবারিক জীবনের স্বপ্ন দিয়ে তাকে মানসিকভাবে সুস্থ করে তোলে। স্বামীর সংসারে এসে প্রথমে বুঝতে পারেনি যে তার স্বামী মানসিক ভঙ্গুর মানুষ। হাতে টাকা-পয়সা না থাকলে মাথা খারাপ হয়ে যায়। আর যখন টাকা-পয়সা থাকে তখন তার মত সুখী মানুষ আর কেহ নেই। তবে এই সুখ খুব অল্প সময় থাকে। কারণ ছেলেমেয়ে নিয়ে বাইরে গিয়ে সেই সব টাকা উজার করে দুই হাতে খরচ করে অতীতের অভাবের যন্ত্রণাময় কষ্ট ভুলে থাকার চেষ্টা করে। এতে আবার এক নতুন দারিদ্রের জালে আটকা পড়ে। এই ভাবে নতুন নতুন দারিদ্র বানিয়ে সংসারে নানা অশান্তি ডেকে আনে। অতীতের দুঃস্বপ্ন তাকে প্রায় তাড়া করে। কেচী আমার সাথে এই বিষয়ে অনেক আলাপ করে।

তার স্বামীর বাল্যকালের সংগ্রামময় জীবনের কাহিনী শুনেই বুঝতে পারলাম তার স্বামীর কি অসুবিধা। এই অবস্থায় আমি তাকে কিছু উপদেশ দেই। সংসারের আয় ব্যয়ের হিসাব এখন সে নিজেই করে। এখানেই শেষ নয়। মাঝে মাঝে বাচ্চাদের মত এমন সব কাজ কাম করে ফেলে যার ভুক্তভুগি কেচী একাই। তার পড়াশুনায় অনেক বাধার সৃষ্টি করে।  কেন করে জানেন? পড়াশুনার শেষে কেচী অনেক ডলার কামাই করবে। আর এই টাকা পয়সার ভাগিদার সে হতে পারবে না। তাকে এক কৃতিম অভাবের মধ্যে রাখা হবে। এই ভয়ে তার স্বামী তার পড়াশুনা বন্ধ করে দিতে চায়। তার স্বামীর এই অসুস্থ্যতার  কারন হলো ছোট বেলার এক বৈরী পরিবেশ। অবশেষে কেচী ঠিক করলো এই লোকটিকে পড়াশুনা করিয়ে মানুষ করতে হবে। এক ধরনের হীনমনতা তার স্বামী সব সময় ভুগতো। এখন তা আর নেই। দুই বছরের একটা ডিপ্লোমা কোর্স করে একটা ভাল চাকুরী পেয়েছে তার স্বামী। কেচীকে নিয়েই অনেক সুখী। আর কেচীও বুঝতে পেরেছে তার স্বামীর দুর্বলতা কোথায়।

অনেক সময় আমরা মানুষ চিনতে পারি না। ভুল করে অনেক বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি। কেচী সেই ভুল কাজটি করে নাই। সে তার স্বামীকে নিয়ে অনেক সমস্যায় পড়েছিল। পরে সে বুঝতে পারে তার স্বামীর মানসিক দীনতাটা কোথায়। কেচী নিজেই চেষ্টা করে স্বামীকে সুস্থ করে একটা মানবিক অবস্থায় দাঁড় করিয়েছে। এই কৃতিত্ব কেচীর একার হলেও তার সুফল পরিবারের সবাই ভোগ করছে। এক মানবিক মানুষের কাছে অসুস্থ মানুষ গেলে সেও আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠে। তার প্রমাণ এই কেচী। অনেক লেখাপড়া জানা ছেলে দেখে অনেক পিতামাতাই মেয়ের বিয়ে দিয়ে থাকে। আর ঐ মেয়ে্র যদি কোন দুর্বলতা থাকলে তো কোন কথাই নেই, ঢোল পিটিয়ে তাকে বাড়ির থেকে বের করে দেওয়া হয়। যদি তা না পারে তাহলে মানসিক অত্যাচার করে উন্মাদ পাগল বানিয়ে ফেলে। এই চিত্রটি আমাদের ভদ্র সমাজে অহরহ দেখা যায়। কোন মানুষটি পারে একজন মানসিক ভংগুর মানুষকে সুস্থ করে একটা সুস্থ জীবন দান করতে? কেচী পেরেছে। খুব বেশী লেখা পড়া জানা মানুষ সে নয়, তবে একজন খাঁটি মানবিক মানুষ বটে।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.