আমার সকল গান-৪

Terrorismশারমিন শামস্: আমার মেয়ে ঘুমালে আমি মাঝে মাঝে খুব চুপিসারে ওর শ্বাসপ্রশ্বাস পরীক্ষা করে দেখি। ‘মায়ের মন’ নামক জিনিসটা সারাক্ষণই আমাকে সতর্ক আর তটস্থ রাখে। মেয়ে দিব্যি ঘুমায়। মেয়ে জাগলে সারা বাড়ি ঝলমল করে ওঠে। জাগতিক বিষয়-আশয়, স্বার্থচিন্তা, প্রতিযোগিতা, গতি, জীবন যাপন—এর কোনটাই স্পর্শ করেনি তাকে।

শিশুরা তাই এরকম অনিন্দ্য সুন্দর, এত ভালো লাগে শিশু। তাই আমি মাঝে মাঝেই ভাবি, একদিন সংসার নামক বিশাল সমুদ্রে ওকেও খাবি খেতে হবে, জীবনের নোংরা কদর্য রূপ দেখতে হবে প্রতিদিন। এসব ভেবে প্রায়ই আমার একটু বিমর্ষ লাগে। পরমূহূর্তে ভাবি, এই তো স্বাভাবিক। জীবনের বিশাল কর্মযজ্ঞে ওকে তৈরি করে ছেড়ে দেয়ার পর ও নিজেই নিজের পথ করে নেবে। সুন্দরভাবে বাঁচার জন্য নিজের জীবনযুদ্ধ নিজেই করবে ঠিকঠাক। শুধু যে কটা দিন ওকে আমার প্রতিটা পদক্ষেপ চিনিয়ে দেয়ার বুঝিয়ে দেয়ার আছে, আমি তা করে যাবো আমার সবটুকু দিয়ে। অনন্তপক্ষে আমার তাই ইচ্ছে।

আমি তাই ওকে রবীন্দ্রনাথ শোনাই, নজরুল শোনাই, ছবিওয়ালা বই তুলে দেই ওর হাতে। তুলতুলে বেড়ালছানার গায়ে হাত বোলাতে শেখাই। রাস্তায় ফুল বিক্রি করা কোন শিশু ওর দিকে চেয়ে মিষ্টি করে হাসলে আমি আমার মেয়েকে তার দিকে তাকিয়ে হাসতে শেখাই। এসবই আমার চেষ্টার অংশ।

আমার খুব ইচ্ছে ছিল, বইমেলায় নিয়ে যাব কন্যাকে। আমার হাত ধরে হাঁটবে, আশেপাশের মানুষ আর ছোট বাচ্চাদের দেখবে। হাজার হলেও আমার মেয়ে আমার মতই আড্ডাবাজ আর ঘুরুনি হয়েছে। খুব ভালোবাসে এইসব। তো হরতালের প্যাঁচে পড়ে এসবের কিছুই করা হয়নি। পত্রিকার পাতায় রোজ আগুনে ঝলসানো শিশুদের ছবি দেখে আমার বুক কাঁপে। আমি মেয়েকে নিয়ে বের হবার কথা কল্পনাই করতে পারি না।

পেট্রল বোমা নামের যে জিনিসটা আমাদের জীবন, সমাজ, আমাদের রাজনীতি, আমাদের দেশাত্ববোধ আর প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের প্রতি একটা নোংরা কদর্য্ বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন, তাকে এড়ানোর সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে। আগে দেশে হরতাল হতো,কারফ্যু হত, মারামারি কাটাকটি, ভাংচুর হত,  জঙ্গি হামলা হত। আমরা অস্থির, আতংকিত থাকতাম। ভয় পেতাম। কিন্তু এইবার সব যেন অন্যরকম। এবার যেন একটা কী গভীর কালো অন্ধকার চারপাশে একবারে ঢেকে দিচ্ছে আমাদের।

২০০৫-০৬ সালের দিকে এরকম এক আতংক ভর করেছিল, বাসে ট্রেনে উঠলে সবাইকে জঙ্গি মনে হত। মনে হত এই বুঝি বোমাসহ আসলো আত্মঘাতী হামলাকারী। সেই ভয় ধীরে কাটলো। এবার এই পেট্রোল বোমা। এই আগুন, এই পোড়া পোড়া শরীর… এই ঝলসানো মুখ। আমার বন্ধুকন্যা তিন বছরের রাই। পত্রিকা দেখিয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করেছে, এই মানুষটাকে মেরেছে কেন? বন্ধু আমার কন্যার প্রশ্ন শুনে শোকে পাথর। উত্তর জানা নাই। কী বলবে মেয়েকে? বড়জোর পত্রিকাটা তুলে রাখতে পারে হাতের নাগালের বাইরে।

আমিও মাঝে মধ্যে ভেবেছি। পাঠিয়ে দেবো মেয়ে বড় হলে দেশের বাইরে। রাখবো না এই পোড়ার দেশে। নিজের সব ক্ষমতা দিয়ে রক্ষা করবো ওকে। এই পৃথিবীতে ও এসেছে আমাদের ইচ্ছায়। তাই ওকে রক্ষার দায়িত্ব তো আমাদের। এইসব ছাইপাশ ভাবি। পলায়নপর ভাবনা। জানি এর মূল্য নেই কোন। যাওয়ার থাকলে মেয়ে তো যাবেই দেশে বিদেশে। তাতেই বা কি?

রাশিয়া, জাপান, জার্মানী, ফিলিপাইন, ভারত, ইরান, ইরাক, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র… কোনটি সেই নিরাপদ নিবাস? আইএস, তালিবান, আল কায়েদার হাতে জিম্মি সারা পৃথিবীর মানুষ। যেকোন জায়গায় যেকোন মূহূর্তে নেমে আসতে পারে বিপদ। পত্রিকার পাতায় জর্ডানের মানুষকে পুড়িয়ে মারার ছবি। গলা কেটে নেয়ার বীভৎস সংবাদ। আমার সারা শরীর হিম হয়ে আসে।

আগে নিত্যকার সংবাদ ছিল- পাকিস্তানে ইরাকে আফগানিস্তানে আত্মঘাতি বোমা হামলা। শতশত হাজার হাজার নিহত আহত। এখন নিত্যদিন দেশে পেট্রল বোমার আঘাত। প্রতিদিন। একটা দিনও বাদ নেই। পোড়া শরীর দেখতে দেখতে গা সওয়া হয়ে গেছে আমাদেরও। বড় বেশি গা সওয়া জাতি আমরা। পোড়া মাংসের গন্ধের মধ্যেই ভ্যালেন্টাইস ডে’র ক্যান্ডেল লাইট ডিনার চলছে। যে যার মত ব্যস্ত। আগুনের আঁচ যতক্ষণ না লাগছে আমাদের গায়ে ততক্ষণ সব ঠিকঠাক।

কিন্তু আজকাল ভাবনা আসে বারবার, ঠেকিয়ে রাখতে পারছি কি এই আগুন? বাসে হোক, ট্যাক্সি হোক, প্রাইভেট কার হোক, নিজের জীবন বাজি রেখে বেরিয়ে পড়তে তো হচ্ছেই রোজ রোজ। অবরোধ হরতালের মুখে আমাদের সামনে ক্ষমতায় যাবার মূলা ঝোলানো নাই। আমাদের প্রত্যেকের জীবনের ভাত রুটি উপার্জনের জন্য একটি কোন নির্দিষ্ট পথ খোলা আছে। সেই পথে আমাদের হাঁটতে হয় প্রতিদিন। টানা দুই মাস অবরোধ দিয়ে ঠেকিয়ে রাখলে আমাদের ঘরে ভাত ওঠে না, রুটি ফোলে না। আমরা তাই বেরিয়ে আসি। আমার সন্তানকেও বেরিয়ে আসতে হয়। দুই মাসে তার টিকার তারিখ পড়েছে। ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পড়েছে। পেট্রোল বোমার আতংক মাথায় নিয়ে লক্ষ লক্ষ শিশু প্রতিদিন বাবা মায়ের সাথে যাচ্ছে স্কুলে বাজারে আত্মীয়-স্বজন-বন্ধুর বাড়িতে।

Shams
শারমিন শামস

আমাদের কিছু করার নেই। আমাদের জীবন আমরা সঁপে দিয়েছি ঐসব রাজনীতিবিদদের হাতে। তাদের হাতে নাটাইয়ের সুতো। আমরা ঘুড়ির মত পতপত উড়ি। একদল ক্ষমতায় যেতে চায়। নানা অপকর্মের পরেও তাদের কোন বিচার হয়নি বলে তারা আজো বেপরোয়া। দূরে বা কাছে বসে রিমোট কন্ট্রোলে তারা আগুন ছড়ায়। আর কোটি কোটি মানুষের জীবনের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়ে বসে থাকা সরকার বারবার শোনায় আশ্বাসের বাণী। টেলিভিশনে সেই জ্বালাময়ী বক্তব্য দেখে আমরা পথে বের হই। ফিরি দগ্ধ হয়ে। অথবা ফিরিই না।

আমাদের ফেরা বা না ফেরায় কিছু যায় আসে না তাদের। কিন্তু আমি যদি না ফিরি, আমাদের সন্তানের অনেক কিছুই যায় এসে যায়। আমি না থাকলে তাকে খাওয়ানোর কেউ নেই। তাকে বড় করে তুলবার কেউ নেই। আমি সুস্থ সবল সক্ষম না থাকলে তাকে যত্ন করার কেউ নেই। আমার সন্তান মালয়েশিয়া বা লন্ডনে থাকে না। আমেরিকাতেও না। সে এই দেশের আলো ছায়ায় জন্মেছে। এই দেশে নিরাপদে বড় হবার পূর্ণ অধিকার তার আছে। সেই অধিকার নিয়ে সে ঘরে বসে থাকে। আমি না পারলে তাকে নিয়ে রাস্তায় বের হই না।

আমার কেবলি সেই ছোট্ট মীমের কথা মনে পড়ে। সেই যে পাঁচ বছরের শিশু ছোট্ট মীম। বাবার সাথে বের হয়েছিল রাস্তায়, তারপর সন্ত্রাসীদের গুলিতে বাবার কোলেই ঢলে পড়েছিল মৃত্যুর কোলে! আর সেই মহামান্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ বলেছিলেন, আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছেন! তারপর বহু আলোচনা সমালোচনায় দিন পার হয়েছে।

বিএনপি আ্ওয়ামী লীগ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকার…এসবের কিছুতেই মীমের মায়ের কিছু যায় আসে না। আমি জানি এখনও বুকের ভেতরে তীব্র তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা আর ক্ষোভের আগুন নিয়ে তিনি বেঁচে আছেন। এরকম শতশত হাজার হাজার মীমের মায়ের অভিশাপ জমা হচ্ছে কোন এক গোপন ব্যালট বাক্সে। একদিন কোন এক শুভ মূহূর্তে সেই অভিশাপের আগুনে পুড়ে ছাড়খার হয়ে যাবে ঐসব রাজনীতিবিদদের সন্তান প্রিয়জন, আমি নিশ্চিত জানি। দেশে হোক, দেশের বাইরে হোক, সুদূর অ্যান্টার্টিকায় বসেও তারা আর পার পাবেন না সেইদিন। আমি যেন সেই দিনটা দেখে যেতে পারি।

লেখক- সাংবাদিক

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.