বহুকোণের সম্মিলন চতুষ্কোণ

Godhuly
ফারজানা খান গোধূলী

ফারজানা খান গোধূলী: অনেকদিন কিছু লিখিনি, লিখিনি না আসলে সময় করে উঠতে পারি না। যদিও চারদিকে বিষয়ের ছড়াছড়ি। পলিটিক্স, সাগর-রুনি, দেশ, দুর্নীতি, প্রেম-ভালবাসা, হতাশা, বন্ধু, হিংসা, লোভ, হাসি-কান্না, যুদ্ধ-সন্ধি ছাড়াও অনেক কিছু আছে বলে শেষ করা যাবে না। অনেক দিন ধরে একটা সিনেমা দেখার অপেক্ষায় ছিলাম তা কলকাতার পরিচালক সৃজিতের “চতুষ্কোণ”। অটোগ্রাফ, বাইশে শ্রাবন, মিশর রহস্য, হেমলক সোসাইটি ও জাতিস্মর দেখে পুরাই ফিদা। ইচ্ছে ছিল এবার মাল্টি ডেসটিনেশন টিকিট কেটে কলকাতা হয়ে ঢাকা যাব। কলকাতা ছুঁয়ে যাবার ইচ্ছে ওই সৃজিতের নতুন সিনেমা “চতুষ্কোণ”, একটা মুভি দেখার জন্য সাড়ে তিন মাসের বাচ্চাকে নিয়ে এতো ট্রাভেল বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে দেখে আর যাওয়া হয়নি। ঢাকা থেকে ফিরেও নানান ব্যস্ততায় মুভিটি দেখতে পারিনি।

দুদিন আগে হঠাৎ করে পেয়ে গেলাম অবসর, আর যায় কোথায়, অনলাইনে দেখলাম চতুষ্কোণ। আর আজকে মনে হলো লেখি কিছু চতুষ্কোণ নিয়ে।
সৃজিতের বানানো মুভি মানেই নতুন কিছু আর সাসপেন্স থ্রিলার বলে কথা। প্রত্যাশা দারুণ কিছুর যদিও আজকাল কোনো ছবি দেখার আগে তার প্রিভিউ-রিভিউ-দর্শক ফিডব্যাক-কাগজের রেটিং-সেলেবস্তুতি ইত্যাদি গুষ্টির পিন্ডি নিয়ে সবাই মাথা ঘামান। সে কারনে জানা হয়ে গিয়েছিল যে এই ছবি চারজন পরিচালক এবং তাদের ছোটগল্প নিয়ে। মজার ব্যাপার হল সব গল্পের থিম হল মৃত্যু। আর এই চারটি গল্পই শেষে মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে।

আসলেই অনেক দিন পর আবার ভাবনার খোরাক জোগানোর মত মুভি। শুধু তাই নয় সপরিবারে বসে দেখার মত মুভি। ছবিতে দুটি সময়ের গল্প সমান্তরাল ভাবে চলেছে পাশাপাশি। গল্পটা ফাটাফাটি না হলেও চিত্রনাট্য অসাধারণ।

আসলেই কিন্তু গল্পটা আসল নয়, আমার কাছে আসল হলো সৃজিতের দুর্দান্ত, ঝক্‌ঝকে চিত্রনাট্য। সিনেমায় দুটো মূল ঘটনা, কয়েক দশকের ব্যবধানে। বেশিরভাগ ভারতীয় পরিচালকই এক্ষেত্রে ফ্ল্যাশব্যাকের সাহায্য নিতেন। সৃজিত সেটা অনায়াসে করতে পারত, কিন্তু ঐ, বাঙালির মাথায় পোকা নড়লে যা হয় – দুটো সমান্তরাল গল্পের রাস্তায় গেল। কাজটা কঠিন ছিল, কিন্তু সৃজিত চ্যালেঞ্জটা নিয়েছে। আর পরীক্ষায় বেশ স্টার মার্ক্স সমেত উতরে গেছে। দুটো সমান্তরাল গল্প ছাড়াও চতুষ্কোণ-এ কয়েকটা ছোটখাট গল্প আছে (বলে দিলে মজা নষ্ট হয়ে যাবে), সেগুলোও বেশ সুন্দরভাবে বলা। সবথেকে বড় কথা, গল্পগুলো – মূল আর পার্শ্বিক – এত সাবলীলভাবে একে অন্যের সঙ্গে বিচরণ করেছে যে সব মিলে একটা চমৎকার সিনেমা হয়েছে।
এ মুভির আসল চমক এর কাস্টিং-এ, অপর্ণা সেন, চিরঞ্জিত চক্রবর্তী, গৌতম ঘোষ, কৌশিক গাঙ্গুলী ও পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়।

“শুরুর খানিক মৃণাল-মানিক, অন্তে সুভাষ ঘাই” না হয়ে বরঞ্চ খানিক উল্টোটাই হয়েছে এক্ষেত্রে। প্রথমে একটি আত্মহত্যার চমক এবং ধীরে ধীরে গল্প বোনার কায়দাটা বেশ দর্শনযোগ্য লেগেছে আমার। সাসপেন্স ছবির কোনদিক থেকে আসছে বুঝতে পারবেন না ছবির প্রথম ৬০ মিনিট, পাশাপাশি সত্তরের দশকে ইন্দ্রাশিস আর রাহুলকে যারপরনাই দুর্দান্ত লেগেছে, দুজনেই তুখোড় অভিনেতা। ইন্দ্রাশিস অনেকদূর যাবেন বলে আমার ধারণা, রাহুল এমনিতেই অনেকদূর এগিয়ে গেছেন। সমান্তরাল প্লটের দুটি গল্পের যোগাযোগটা অনেকটাই আন্দাজ করা যায়, কিন্তু তাতে কী?
এক ছবির ভিতর চার পরিচালক। চার জনেই আলাদা আলাদা ছবির গল্প দেবেন। চার কিসিমের কল্পনায় তৈরি হবে ছবির শরীর।কিন্তু চতুষ্কোণের পরিচালক তাঁর চরিত্রের মুখেই বলিয়ে দেন, এ ধরনের কাজের স্মৃতি বাংলা ছবির বাজারে তেমন সুখকর নয়। তবু চার পরিচালকের কনসেপ্ট থেকে বেরিয়ে আসেননি সৃজিত। কেননা এখানে পরিচালকের নামতাটা একটু অন্যরকম। চার এক্কে এখানে এক পরিচালক। ছবিতে চারজন পরিচালক আছেন ঠিকই। আছেন চরিত্র হয়ে। প্রযোজকের শর্ত মেনে সেই চার চরিত্র একটি করে ছবির গল্প ভাববেন। চারটি গল্পই বাঁধা থাকবে মৃত্যুর থিমে। কিন্তু সেখানে থেমে গেলেন না আসল পরিচালক। কোন মৃত্যুটা সেই সুতো হয়ে আদ্যোপান্ত ছবিকে ঘিরে থাকবে, সেই তাসটি তিনি তুলে নিলেন নিজের হাতে। ফলে চেনা চারের ছক থেকে বদলে গেল এ ছবির ঘরানা।

পরিচালক নিশ্চয়ই এমন দুর্বোধ্য কিছু দেখাতে চাননি যেটা কোনো দর্শকই বুঝবেন না। তিনজন পরিচালক চরিত্রের বলা তিনটি গল্প ভিন্ন স্বাদের।
ছবিতে দীপ্ত (চিরঞ্জিত চক্রবর্তী), শাক্য (গৌতম ঘোষ), তৃণা (অপর্ণা সেন) এবং জয়ব্রত (পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়)সেই চার পরিচালক হলেও, আসল পরিচালক একজনই। এ ছবিতেও তিনি ন্যারেটিভকে নিয়ে খেলেছেন নিজস্ব খেলা। তবে এবারের খেলাটা ছিল বোধহয় সবচেয়ে কঠিন। অথচ মা নানিদাদিরা যেমন অনায়াসে নানা রঙের উলের বুননে গড়ে তোলেন পোশাক, সৃজিতও যেন তেমনয়ই নিপুণ দক্ষতায় ইন্টারটেক্সচুয়ালিটির কাজ। tandem narrative এর ব্যবহার তাঁর কাজে আগেও এসেছে। এবার তাঁর fractured tandem এর ব্যবহার যে কোন সিনেমাপ্রেমীর কাছেই লোভনীয়। এই দিয়েই সৃজিত তৈরি করেছেন তাঁর কাঙ্খিত সাসপেন্স। দর্শক আগাগোড়া ছবির ভিতরে মগ্ন থেকে দেখতে থাকেন কীভাবে পরিচালক তাঁর লাটাই থেকে সুতো ছেড়ে আবার গুটিয়ে নিচ্ছেন। কোনও আওয়াজই ‘ডিস্ট্র্যাকশন’ আনে না, থ্রিলারের ধর্ম মেনে নে যেটুকু যা দৃষ্টি ঘোরানোর কাজ, তাও পরিচালকই সমাধা করেন। আর এখানেই সৃজিতের জিত। তত্ত্ব কিংবা টেকনিক তো নয়, ছবির এসেন্স দিয়েই তিনি পৌঁছে যান দর্শকের কাছে। সমস্ত বিশ্লেষণের চেষ্টা সেখানে নিছকই কলমের খেয়াল হয়ে দাঁড়ায়, যখন টোন বদলে বদলে পরিচালক পালটে দেন ছবির রঙ। দর্শকের অনুভবেরও।

স্বপনচারিণীকে চিনিতে না পারার বাঙালি বেদনা তার একান্ত প্রেম। সৃজিতের ছবিও থ্রিল, সাসপেন্স, সংগীত যে বিষয়ের কাঠামোর উপরেই দাঁড়িয়ে থাক না কেন, নিপুণ সাজের মতো তার শরীরে থাকে প্রেম। স্বভাবে তা উচ্চকিত নয়, মেজাজে আবেগসর্বস্ব নয়, বরং ফুরিয়ে আসা বিকেলের মতো মায়াময়। গাঢ় সংলগ্নতা সত্ত্বেও তা যেন জারি রাখে তার আলগোছে ভাবখানা। ফলে ছবি এগোয়। দর্শক মজে যান রহস্য উদ্ধারে কিংবা গানে। আর এ সবের আড়ালে একেবারে সন্তর্পণে সে এসে দাঁড়ায় জানলাটির কাছে। নিরুচ্চারে বলে, ভালোটি বাসিব। এ অটোগ্রাফ সৃজিতের নিজস্ব। নানা ঘরানার ভিতরেও সেলুলয়েডের কপালে তিনি পরিয়ে দিতে প্রেমের কাঁচপোকা টিপ। এ ছবিতেও তা আছে চোখের তারায় আয়না ধরে। হয়তো কাছে থেকেও দূরে। এক মুহূর্তের সত্যিকে সম্বল করেই চরিত্রের মুখ দিয়ে পরিচালক তাই শুনিয়ে দেন- সমুদ্র কাছেই ছিল, আমরাই বুঝতে পারিনি।

অনেকের সাথে আমিও একমত যে চিরঞ্জিতের বলা গল্পটা সবচেয়ে ভাল লেগেছে চিরঞ্জিতের নিজস্ব গুণে। এই ছবিটা ভদ্রলোকের কামব্যাক হবে কিনা জানিনা, তিনি আদৌ কলকাতার বাংলা ছবিতে ফিরে আসতে চান কিনা তাও জানিনা, তবে যদি আসেন, তাঁকে এইরকম কোনো অবতারেই মানাবে – চূড়ান্ত স্মার্ট এবং সাবলীল অভিনয়ে। চতুষ্কোণে অন্ততঃ আমার সেরা প্রাপ্তি চিরঞ্জিত ও অনুপমের গান। গৌতম ঘোষের চরিত্রটা এখানে দৈর্ঘ্যে বড় হলেও গভীরতায় ‘বাইশে শ্রাবণে’র থেকে একটু কমা, তাও তিনি দিব্যি ব্যাট করে গেছেন।
অপর্ণা সেনকে নিয়ে কিছু ব্লা অতিরিক্ত হয়ে যাবে। তবুও তাকে বোধহয় খুব বেশি অভিনয় করতে হয়নি এখানে, একজন অভিনেত্রী-পরিচালক হিসেবে মোটামুটি নিজের মত বিচরণ করে গেছেন। পরমব্রতর অভিনয় আমার ভাল লেগেছে, বেশ ভালই, তবে কোথাও মনে হয়েছে বোকার রোলে তিনি একটু টাইপকাস্ট হয়ে যাচ্ছেন। ছবির শেষের টুইস্টটায় তার অভিনয় দারুন হয়েছে। পার্শ্বচরিত্ররা নিজেদের প্রতিভার একদম যথাযথ ব্যবহার করেছেন – নীল মুখার্জি, অর্পিতা, বরুণ চন্দ, কনীনিকা এবং অনিন্দ্য। পায়েলও পিছিয়েছিল না কোন অংশে যেটা আমার একেবারে ভাল লাগেনি তা হল অনিন্দ্য আর কনীনিকার সাবপ্লটটা। ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ হয়ে গেল, ঠিক মন ছুঁয়ে যেতে পারল না।

ন্যারেটিভের ভাঙাগড়া, থ্রিল, সাসপেন্স, ‘ঘরে বাইরে’ থেকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’র ক্রস রেফারেন্স ব্যবহার এহেন বহু পরিচালন মুন্সিয়ানার সাক্ষী থাকা তো বটেই, আলাদা করে উল্লেখ করতে হয় এ ছবির সিনেমাটোগ্রাফির কথা। আফ্রিকা বা মিশর না পেলেও যে লেন্সের নন্দনতত্ত্ব বজায় থাকে তা দেখিয়েছেন সুদীপ চট্টোপাধ্যায়। ওর ক্যামেরা এই ছবিতে কথা বলেছে … এক একটি ফ্রেম মনের মধ্যে জায়গা করে নেয়। অবাক লাগে কি করে এক একটা দৃশ্য জাদু আনেন সুদীপ নান্দকিতা যেন ঝরে ঝরে পরে আর সম্পাদনাতে সেই নান্দনিকতাকে গতি দিয়েছেন রবিরঞ্জন মৈত্র।
ক্লাইম্যাক্স সবচেয়ে ভাল লেগেছে দুটো ব্যাপার – এক হলেন কৌশিক গাঙ্গুলী, যত শুনেছিলাম তার চেয়েও ভাল, একেবারে অসীম ভাল কিছু দৃশ্য ফুটিয়েছেন শেষে; দ্বিতীয়টা হল ‘সেটাই সত্যি’।
অনুপমের সঙ্গীত সেই অটোগ্রাফ থেকেই ব্যাপক লাগে, মূলতঃ গানের কথার জন্যে। চতুষ্কোণের অন্যতম সেরা প্রাপ্তি অবশ্যই চিরঞ্জিত ও অনুপম – বোবা টানেল দিয়ে, বসন্ত এসে গেছে, এটা মনে পড়ার গান। চিরসখা হে, সেটাই সত্যি।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.