আমরা যারা একলা থাকি-৪২

উইমেন চ্যাপ্টার: কতগুলো অধ্যায়ই তো লেখা হলো একলা থাকা নিয়ে, তারপরও শেষ হয় না। বন্ধুরা বলে, তুমি তো আমার কথাটাই লিখলে না। ইনবক্সে অচেনা মানুষগুলো তাদের জীবনের গল্পের ‘টাচ’ দিয়ে যায়, বলেন, এটা কি আপনার লেখার বিষয় হতে পারে না? অবাক হয়ে সেগুলো পড়ি, আর ভাবি, প্রতিটি মানুষ কত আলাদা, প্রতিটি মানুষের আলাদা আলাদা গল্প, জীবন দেখার অভিজ্ঞতা আলাদা, জীবনকে উপভোগ করার ক্ষমতাও আলাদা। সেজন্যই সবাই প্রায় একইরকম গল্প নিয়েও ভিন্ন ভিন্ন কষ্ট পায়, সুখও হয় তাদের ভিন্নতায় ভরা।

পয়লা ফাল্গুনে হলুদ বর্ণে সেজে বন্ধুরা ছবি দিচ্ছে ফেসবুকে, তাদের হাসিমুখ আমায় মুগ্ধ করে। কিন্তু যখনই মনে পড়ে যায়, এই একেকটি হাসিমুখের পিছনে কতটা দু:খময় একটা যাপিত জীবন আছে, তখন ছবিটি কেবল ছবিই হয়ে থাকে, প্রাণ ফিরে পায় না। কাউকে কাউকে জিজ্ঞাসা করি, এতো রং কোথায় পাও জীবনে? উত্তরে বলে, রংটাই তো দেখেছো, এটা নিয়েই বাঁচা, ভিতরের ক্ষরণের রং তো আর দেখতে পাও না।

সত্যিই পাই না, বা পেতে চাই না। কেমন আছি জিজ্ঞাসার উত্তরে বলি, চলে যাচ্ছে, কাটছে না, রক্ত ঝরছে না। এটাই সত্যি। আ্পাতত এই আ-কাটা, আ-ঝরা রক্ত নিয়েই তো বেঁচে আছি। যতদিন এভাবে চলে যায় জীবনটা, যাক না।  জটিলেশ্বরের গান শুনছিলাম ফাগুনের প্রথম দিনে, ‘কেউ বলে ফাল্গুন, কেউ বলে পলাশের মাস, আমি বলি আমার সর্বনাশ’। ফাল্গুন কি করে সর্বনাশ হয়, এই অভাগা-অতিআবেগী বাঙালীর আসলে এরকম সর্বনাশই প্রাপ্য। যে জাতি রং দেখে প্রেমে পড়ে, আওলা বাতাসে মাতাল হয়, একলা লাগে, একাকিত্বে ভূগে হাজার মানুষের ভিড়েও, তার সর্বনাশই হওয়া উচিত।

আমরা মেয়েগুলোও হয়েছি একেকটা মুর্খের দল। নিজেরটা ষোল আনা বুঝে নিতে পারলে তো এই  বসন্তের ঝিরিঝিরি সমীরণে মনটা উচাটন হয় না। অত সমষ্টিকেন্দ্রিক হওয়ার কী দরকার বাবা, ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়েই কাটিয়ে দিই না কেন জীবন? একেকজনের ভিন্ন ভিন্ন একাকিত্ব নিয়ে বলতে গিয়ে মনটা ভারাক্রান্ত করে দিলাম তো!

আমার এক সময়ের বন্ধুকে দেখতাম খুব ফিটফাট হয়ে চলতো। লম্বা হাতার জামা আর মাথায় ঘোমটা টানা থাকতো সবসময়, আর কথায় কথায় ইনশাল্লাহ, মাশাল্লাহ বলতো। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের একটাও কামাই হতো না। সেই বন্ধুটিকে প্রথমে বাসায় দেখে অবাক হয়েছিলাম, হাফ প্যান্ট পরা, স্লিভলেস টপস। এটা ওর ব্যক্তিগত অভিরুচি, কি পরবে আর কি পরবে না। কিন্তু আমার চোখে লেগেছিল তার ডাবল স্ট্যান্ডার্ড। ও বলেছিল, দুটো মেয়ে নিয়ে যেহেতু সে একা থাকে, বাইরের পোশাকটা তাই তার সাইনবোর্ড, ওটা আই-ওয়াশ। ঠিক এই শব্দটাই সে আমাকে বলেছিল। পরে মিশতে গিয়ে জেনেছি তার অনেক ছেলেবন্ধু থাকার কথা, এমনকি মেয়ে দুটিও বাসায় ছেলেবন্ধু নিয়ে এসে দরজা বন্ধ করে দিতো।  পুরো বিষয়টাই আমার খুব খারাপ লেগেছিল। সবশেষ ঘটনাটি সে ঘটিয়েছিল আমারই এক বন্ধুকে সে বিছানায় টেনে। এরপর আর কোনদিন তার সাথে আমার আর কথা হয়নি। রুচিতে বেঁধেছে। ভাবি, সেও তো সেই একলাই থাকলো, মাঝখানে এমন জীবন কেন যাপন করা?

আসলে এই মেয়েটার প্রসঙ্গ এখনও মনে হলে খেই হারিয়ে ফেলি। নিজে ঘৃণা করি এই জীবন, কেউ যাপন করলে সেটাও নিতে পারি না। কষ্ট হয়। মনে হয়, নারী হিসেবে নিজেকে অপমান করা হয় এতে করে।  কেন যে বোকা মেয়েগুলো একথা বোঝে না! কেন যে ওরা এতো নিচে নামায় নিজেকে!

জনা-কয়েক বন্ধু-ছোটবোন আছে, যারা একলা থাকে। ওদের অনেক কষ্ট, বয়স কম, শরীর বলে একটা জিনিস আছে। সামাজিক নিয়মকে অস্বীকার করলেও প্রাকৃতিক নিয়ম চলে নিজের নিয়মেই। সেই শরীরে জোয়ার-ভাটা আছে। ওরা অস্থিরতায় কাটায় সেইসব দিন। একদিকে সন্তানের দায়িত্ব, অন্যদিকে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টার মধ্যেই ওরা এসব যন্ত্রণা নিয়েও বেঁচে থাকে, অন্তত ডাবল স্ট্যান্ডার্ড জীবন তাদের নয়।

সাফ কথা বলি তাদের। পছন্দ হলে, মন চাইলে শেষপর্যন্ত যাবি, নইলে ওই কড়া নাড়া পর্যন্তই সীমিত থাকিস। আমাদের দেশে এখন সম্পর্কের কমিটমেন্টের জায়গায় আস্থাহীনতা বাসা গেড়ে বসেছে, মূল্যবোধ পরাজিত আজ, কোথাও কোন বিশ্বাসের বালাইটুকুও নেই। সেখানে ক্ষণভঙ্গুর সম্পর্ক নিয়ে টানাপোড়েনের কীইবা প্রয়োজন! জটিল জীবনকে জটিলতর করার কোনো মানে নেই। তার চেয়ে বরং এই বেশ আছিস, চলছিস, ফিরছিস, হাসছিস, প্রয়োজনে কাঁদছিসও।

(চলবে)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.