আয়শানামা-২

Crocodile tearsশুচি সঞ্জীবিতা: সকালে হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকলো আয়শা। প্রতিদিনই তার কোন না কোন ‘কাহিনী’ থাকে, তাই খুব একটা গা করিনি ‘কি হয়েছে’ জিজ্ঞাসা করার। বারান্দা থেকে ধোয়া কাপড় নিয়ে বাথরুমের দিকে যেতে যেতে দেখলাম নিজের মনেই ধরা গলায় কথা বলছে।

এবার বললাম, আজ আবার কী হলো? ‘খালাম্মা, রুবেল রাইতে ফিরে নাই বাড়িতে’। মানে? ফিরে নাই মানে কী? ‘ওই যে কাইল গার্মেন্টসে গেছিল, আর আহে নাই, কী যে করি পোলাডারে নিয়া, মাঝে মাঝে মনে হয়, গলা টিইপ্যা মাইরা ফালাই, আমার অন্তরডা জুড়ায় তাইলে’।

কী যে বলেন না খালা…..আমি বলি। কিন্তু আমার মনের মধ্যেও কু ডাক ডেকে উঠে। চারদিকে দেশের যে অবস্থা, তাতে করে একটা ১৮-১৯ বছরের ছেলে রাতে বাসায় না ফিরলে কোন মায়েরই শান্ত থাকার কথা না, তো, সেই মা  বড়লোকই হোক, বা দরিদ্রই হোক। সন্তান জন্মদানের কষ্ট সব মাকে একইরকম পোহাতে হয়, সন্তান বড় করতেও একইরকম বেগ। তার ওপরে সন্তান যদি হয় ছেলে, আর সেই ছেলে যদি থোরাই কেয়ার করে মা’কে, তখন অশান্তি ভর করে চারপাশ থেকেই।

আয়শার ছোট দুইটা ছেলের একটাকে কিছুদিন আগেই কুকুরে কামড়েছে। একদিন পর পর এই হরতাল-অবরোধ মাথায় নিয়ে টেম্পোতে করে মোহাম্মদপুর থেকে মহাখালী নিয়ে যায় ইনজেকশন দিতে। যে টাকা আয়শা মানুষের বাড়িতে কাজ করে পায়, প্রতিমাসেই এমন কোনো না কোনো বাহানায় তা বেরিয়ে যায়। একরুমের ঘর ভাড়া তার সাড়ে চার হাজার টাকা। সেখানে বিয়ের উপযুক্ত মেয়ে, যে কিনা গার্মেন্টসে কাজ করে, সে ছাড়াও থাকে আরও চার সন্তান এবং আয়শা নিজে। মেয়ের টাকা দিয়ে ঘর ভাড়ার খরচ জোগায়। তার নিজের আর ছেলের টাকা দিয়ে সংসার চলে। প্রতিমাসেই পুরনো খালা আর নতুন খালাদের কাছে হাত পাততে হয় আয়শার। কেউ বিমুখ করে না। পুরনো মানুষ। আর তার মুখভরা খালাম্মা ডাক, কেউ ফেরাতে পারে না। একদিন কাজে ব্যাঘাত ঘটলে পরদিন এমন মুখ করে সে বাসায় ঢুকে যে, কিছু বলারই ফুরসত পাওয়া যায় না।

সেই আয়শার বড় ছেলে রুবেল কাল রাতে বাসায় ফেরেনি। কয়েকদিন ধরেই আয়শা বলছিল, রুবেলকে গার্মেন্টসে আসতে-যেতে বেশকিছু ছেলে ‘ডিস্টাব’ করে। বলে, তাদের সাথে যেতে, যেখানে অনেক টাকা আছে। রুবেল তাদের অনুনয় করে বলে, ‘ভাই, আমি গরীব মানুষ, আমার অত টেকার দরকার নাই। গার্মেন্টসের টাকা দিয়াই আমার চলে। আমারে ডাইকেন না’। কিন্তু ওরা নাছোরবান্দা। কাজ শেষে গার্মেন্টসের নিচে বসে থাকে, পথে তার পথ আগলে দাঁড়ায়, বলে, চল, আমাদের সাথে। রুবেল যায় না। ওরা বেশ কয়েকদিন ধরে ওকে শাসিয়ে গেছে, এমনও বলেছে, তোর বোনকে তুলে নিয়ে যাবো। ভয়ে সেঁটিয়ে থাকে আয়শা-রুবেলের পরিবার। রুবেলের বাবা ভ্যাগাবন্ড। গ্রামের বাড়িতে গিয়ে পড়ে থাকে, কোনদিন দায়িত্ব নেয়নি ছয়-ছয়টা সন্তানের সংসারের। মাঝে-মধ্যে এসে ছেলেমেয়েকে পিটিয়ে নেশার টাকা নিয়ে আবার চলে যায়। রুবেল অনেকদিন ভেবেছে, বাপকে সে পুলিশে দিয়ে দেবে, কিন্তু আয়শার কারণে পারেনি।

আয়শার যুক্তি হলো, ‘বিদেশের মাটিতে থাকি, মেয়েডারে বিয়া দিতে অইবো, একজন পুরুষ মানুষ না থাকলে কি চলে?’  আমি কতদিন বলেছি, আয়শা, তুমি ওদের বাবার কথা মাথা থেকে সরাও। কাজে আসেনি। উল্টা বলে, ‘খালাম্মা, আমি মুখ্যু মানুষ, আপনাদের মতো পড়ালিখা থাকলে তো কবেই বাদ দিতাম’। জিজ্ঞাসা করি, ওইরকম বীভৎস-নোংরা একটা চেহারা নিয়া যখন সামনে আসে রুবেলের বাপ, তোমার ঘেন্না লাগে না?’ বলে, ঘেন্না লাগলেই কী! ওই অবস্থাতেই তার শারীরিক চাহিদাও মেটাতে হয়। যে কারণে তিন মাস পরপর কোথা থেকে ‘সুঁই’ দিয়ে আসে আয়শা, দুইদিন কোমর নাড়াতে পারে না এরপর। আমি আয়শার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি, বুঝতে পারি না ও কিসের আশায় ওই লোকটাকে ঘরে ঢুকতে দেয়, আবার শুতেও দেয় সাথে। আমার গা রি রি করতে থাকে রাগে-ক্ষোভে-ঘেন্নায়। কিন্তু ভাবি যে, এভাবেই চলে এইদেশের শতকরা ৯০ ভাগ মেয়ের জীবন। আয়শা একা না।

আজ রুবেলকে নিয়ে আমিও চিন্তায় পড়ি। বলেই ফেলি, ‘খালা, চারদিকে পেট্রোলা বোমা মারা হচ্ছে। কেউ যদি রুবেলের হাতে একটা বোমা ধরিয়ে দেয়, আর সে যদি ধরা পড়ে, তাহলে কিন্তু সমূহ বিপদ’। মূহূর্তেই আয়শার মুখ ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে যায়। একদিকে ঘরে বিয়ের উপযুক্ত মেয়ে, অন্যদিকে সন্ত্রাসীদের তালিকাভুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় ছেলে। এই দুইজনের চিন্তায় আয়শা ক্রমেই মিইয়ে যেতে থাকে। জানুয়ারিতে তিনজনকে স্কুলে ভর্তি করিয়েছিল পড়া শেখানোর আশায়,  সেই স্বপ্নও ফিকে হয়ে আসতে থাকে। অথচ প্রতিবছর সে বিপুল উদ্যম নিয়ে স্কুলে ভর্তি করায় ছোট তিনজনকে। আমি তাদের ভর্তির টাকা দেই। দুই-তিন মাস পর ওরা আবার ঝরে পড়ে। মাদ্রাসায় দিয়ে দিতে চায়, আমার আপত্তির মুখে পারে না। কিন্তু আমি নিজেও বুঝি, এই বাচ্চাগুলো শেষপর্যন্ত মাদ্রাসাতেই যাবে, যেখানে তাদের থাকা-খাওয়া নিশ্চিত হবে। ওরা গড়ে উঠবে আল্লাহর বান্দা হিসেবে, ইহজাগতিক জীবনের চেয়ে পরজাগতিক জীবনই তখন তাদের আরাধ্য হবে। রুবেলও হয়তো একসময় ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে কোন দলে ভিড়ে যাবে। আর মেয়েটাকে যে একটা  হাত কাটা সন্ত্রাসী বউ করতে চাইছে অর্ধেক জমি লিখে দেবার প্রতিশ্রুতিতে, সেও হয়তো সেখানেই পা দেবে।

ফেরাতে পারবো না আমি আয়শাকে, সেই সাধ্য আমার নেই। (চলবে)

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.