সাংবাদিকরা কী নীতি-নৈতিকতার ঊর্ধ্বে?  

W#Question 3উইমেন চ্যাপ্টার:  বুধবার সকালেই বিমানে বাংলাদেশি সাংবাদিকের একজন কিশোরীকে উত্যক্ত করার খবরটি পাই। আর সন্ধ্যায় শুনি, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের তিন বছর উপলক্ষে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির এক সভায় সিনিয়র সাংবাদিক শাহেদ চৌধুরী নাকি তার বক্তৃতায় বার বার বলেছেন, ‘বিশ্বসুন্দরী সাহারা খাতুন’। তাঁর এই কথার প্রতিবাদ করতে গেলে সিনিয়র সাংবাদিক সুমি খানকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেছেন, একশ বার বলবেন, দুইশ বার বলবেন। অন্য কিছু পাতি সদস্য সাংবাদিক আবার সুমি খানের দিকে তেড়েও এসেছিল বাদানুবাদের এক পর্যায়ে।

অভিযোগটা শোনার পর সত্যি বলতে কী, আমার কোন প্রতিক্রিয়াই হয়নি। কেন জানি বীতশ্রদ্ধ আজ সবার প্রতি। এটা সাংবাদিক বলে না, কোন পেশার মানুষের প্রতিই আর শ্রদ্ধাবোধ কাজ করে না। কেবলই মনে হয়, যে নষ্ট সময়ের বাসিন্দা আমরা, তার ছোঁয়া তো সব জায়গাতেই পড়েছে। আর প্রতিটি মানুষের ভিতর পর্যন্ত আজকাল সহজেই পড়ে ফেলা যায়। কাজেই আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। তারপরও মানুষ যখন অভিযোগ করে, সে আহত বোধ থেকেই করে, সমাজটাকে পাল্টে দেয়ার স্বপ্ন থেকেই করে। সেখানে আমরা নেহায়েতই কীট-পতঙ্গ মাত্র, যারা হাত-পা ছোঁড়াছুঁড়ি করা ছাড়া আর কোন উপায় দেখি না। দেখতে গেলে চাকরি খোয়াতে হয়। বদনাম দেয়া হয় নামের পাশে। এই পেশায় লক্ষী মেয়েটি হয়ে থাকলেই বরং বড় ভাইয়েরা পিঠ চাপড়ে, মাথায় হাত বুলিয়ে, ‘বড় হও’ বলবেন, আর অসুবিধাও হবে না ওপরে উঠার সিঁড়ি পেতে।

দেশের ভিতরে যখন ঘটনার সীমা-পরিসীমা নেই, ঠিক তখনই সীমানার বাইরে গিয়ে ঘটলো আরেক অঘটন এবং রীতিমতোন নারী কেলেংকারি। এর আগেও অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস যখন নোবেল শান্তি পুরস্কার পান, তখন অসলোতে গিয়ে একজন সাংবাদিক সুপারমলে ধরা পড়েছিলেন চুরি করতে গিয়ে। তার ক্ষেত্রে পরে কী হয়েছে আর জানা যায়নি। চাকরি নিয়ে সমস্যা হয়েছে বলেও শুনিনি।

এবার ঘটলো আরেক কাঠি সরেস ঘটনা। বিমানে এক বিদেশি কিশোরীর শ্লীলতাহানির অভিযোগে বাংলাদেশের এক ক্রীড়া সাংবাদিককে আটক করেছে সিডনি পুলিশ!  এ নিয়ে ব্যাপক হৈ চৈ হচ্ছে অনলাইন জগতে। ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের ওই সাংবাদিক বিশ্বকাপ ক্রিকেট উৎসব কভার করতে বুধবার সকালে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে সিডনিতে নামার পর আটক হন।

সফররত সাংবাদিকদের একজন জানান, অভিযুক্ত ওই সাংবাদিকের পাশের আসনেই ছিলেন কোরিয়ান এক কিশোরী মেয়ে। মেয়েটি অভিযোগ করে, তার পাশের আসনের ওই যাত্রী ঘুমন্ত অবস্থায় তার গায়ে হাত দেয়! আরেক সাংবাদিক বলেন, বিমানে তারা ঘুমিয়ে ছিলেন। উচ্চৈঃস্বর বাদানুবাদ শুনে ঘুম থেকে তারা জেগে ওঠেন। অন্ধকার ফ্লাইটে এর বাইরে তারা কিছু দেখেননি।

ওই একই ফ্লাইটে বাংলাদেশ থেকে আরও অনেক ক্রীড়া সাংবাদিক গেছেন অস্ট্রেলিয়ায়। এই ঘটনায় প্রথমে হতভম্ব হলেও তারা সিদ্ধান্তে আসেন, ‘ইন্ডিপেন্ডেন্টের এই সাংবাদিক অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি, তার দ্বারা এমন কাজ হতেই পারে না। নিশ্চয়ই কোথাও ভুল হয়েছে’। আপত্তিটা এখানেই। ‘সজ্জন’ মানে সৎ যে জন, তার সততা মাপা হয়েছে কোন ব্যারোমিটারে? কে মেপেছে? একজন পুরুষ আরেক পুরুষের সততার সার্টিফিকেট কিসের ভিত্তিতে দেয়? আমরা যারা সাংবাদিকতা করি, আমরা তো জানি একেকজনের ভিতরের কুৎসিত-কদাকার চরিত্রটি। এবং সেই চরিত্রটি অন্য সহকর্মীরা কিভাবে চেপে যায়, তাও নিজ চোখেই দেখা। নিজে রোষানলে পড়তে চাই না বলে সেটিকে ফলাও করে প্রচারের প্রয়োজন দেখি না বলেই চেপে যাই।

তবে কেবল যে সাংবাদিকদের জীবনেরই নানারকম কাহিনী আমাদের সামনে আসে, তাতো না, অন্যান্য পেশার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। যদিও সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড নিয়ে যে রমরমা ব্যবসা হয়ে গেল দেশে, এরপর আর কোনো আদর্শ এই পেশাটাতে আছে বলে আমার মনে হয় না।

বুধবার সকালে এই খবরটি জানার পর থেকে অনেক প্রশ্ন মাথায় ভিড় করছে। প্রথমত, এতো আলোচনা-নিউজ-আন্দোলনের পরও নারীর প্রতি একজন সাংবাদিকের আচরণ; দ্বিতীয়ত, দেশের বাইরে গিয়ে প্রথমেই বিমানে পাশাপাশি আসনে বসার সুযোগ পেয়ে সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে চাওয়ায় তার ভিতরের নিহিত বা অবদমিত যাই বলি না কেন, সেই ইচ্ছাটারই প্রতিফলন ঘটলো। তৃতীয়ত, এই সাংবাদিক যে দেশের একটি সম্মানিত পেশার প্রতিনিধি, তা বেমালুম ভুলে কেবলই একজন পুরুষ হয়ে উঠলো।

তার মানে এই যে আমরা যে মেয়েরা সাংবাদিকতায় আছি, তারা আসলে মোটেও নিরাপদ নই কোথাও। পাশের ডেস্কের সহকর্মী যেকোনো সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে চাইতে পারে। তার কাছে আমি সহকর্মী না হয়ে কেবলই নারী? আর আমার পেশার প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে তৈরি যে মূল্যবোধ, যে নীতিবোধ, সেগুলো কি আজকাল উঠে গেছে সব জায়গা থেকে?

কিছুদিন আগেই ভারতের একটি বিমানে একটি মেয়েকে উত্যক্ত করার ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল ফেসবুকে। আমরা তা দেখেছি, বাহ্বা দিয়েছি। অভিযুক্ত আজকের সাংবাদিকও নিশ্চয়ই তা দেখেছিলেন। কিন্তু উনি আমলে নেননি।

বিমানে আমরা যারা চড়ি, তারা জানি, এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটে যে, পাশের সিটের ব্যক্তিটি ঘুমে ঢলে পড়েন। এরকম ঘটনার বহু সাক্ষী আমি নিজে। এক্ষেত্রে যা হয়, সেই ব্যক্তিটিকে সজাগ করে তার ভুল ধরিয়ে দিই আমরা। এরপরও তা অব্যাহত থাকলে কড়া ধমক দেই, নইলে আসন পরিবর্তনের জন্য বলি। কিন্তু ঘুমে ঢলে পড়া এক জিনিস, আর ঘুমের মধ্যে দুটো হাত পাশের সহযাত্রীর শরীরের কোন জায়গায় এসে পড়বে, তা নির্দ্দিষ্ট করে কেউ বলতে না পারলেও, বিশেষ জায়গা খুঁজে খুঁজে পড়ে না। কাজেই এই ঘটনার কড়া তদন্ত হওয়া উচিত। দেশের যা বদনাম তাতো হয়েছেই, এখন ওই অভিযুক্তের শাস্তি নিশ্চিত করাটাই একমাত্র দাবি, যেন আর কেউ এমন সুলভ না ভাবে মেয়েদের।

যদিও এই বিচারের ব্যাপারে এরই মধ্যে সন্দেহ জেগেছে। কারণ ঢাকায় ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের পক্ষ থেকে অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশ হাইকমিশনের সাথে যোগাযোগ করে তাদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে। আটক সাংবাদিককে এর মাঝে ইন্টারপ্রেটার নেয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছে। তারা আশাবাদী যে তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ গঠন করা হবে না। এই আশাবাদী শব্দটা নিয়ে আমার বেজায় আপত্তি। যদি সে অন্যায় করে থাকে, তবে বিচার না হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী হবে কেন তার প্রতিষ্ঠান? পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে ওই সাংবাদিককেই সমর্থন জানিয়ে যাওয়া নয় কী?

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.