তোমাদের মৃত্যুর জন্য তো আমিও দায়ী!

কিশোয়ার লায়লা:

রুনির সাথে আমার বন্ধুত্ব ছিল। কিন্তু সেটা মাখামাখি পর্যায়ে ছিল না। তুমি সম্বোধন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। মানে প্রতি সপ্তাহে দেখা হওয়া বা ঘুরাঘুরি এসব হতো না। কিন্তু দু’জনের মধ্যে আন্তরিকতা ছিল অনেক। আমরা সাংবাদিকতা শুরু করেছি একই সময়ে। তাই অ্যাসাইনমেন্টের মধ্য দিয়েই আমাদের আলাপ-পরিচয়, সখ্যতা আর আন্তরিকতা।

রুনি জ্বালানি বিষয়ক রিপোর্টিংয়ে জ্ঞান রাখতো বেশি। তাই এ বিষয়ক অ্যাসাইনমেন্টে গেলে প্রতিবেদন বুলেটিনে প্রচার হওয়া পর্যন্ত তাকে ফোন দিয়ে বিরক্ত করেই যেতাম। বলা যায়, পুরোপুরি রুনি’র সহায়তাতেই আমি প্রতিবেদনটি তৈরি করতাম। দিন শেষে একটা ধন্যবাদ লিখে ক্ষুদে বার্তা পাঠাতে ভুল হয়নি কখনো।

মনে পড়ে অ্যাসাইনমেন্টে বসে এমন কোন বিষয় নেই যে আমরা আলোচনা করিনি। পারিবারিক, অফিস, সৌন্দর্যচর্চা ইত্যাদি সব বিষয়ে কথা হতো। সাগর ভাইয়ের সাথে পরিচয়, ভালবাসা, সংসার সব কিছু নিয়ে কত যে উচ্ছসিত হয়ে কথা বলতো রুনি।

আমি এনটিভি ছেড়ে বাংলাভিশনে চলে আসি। রুনি এটিএন। জেনারেল বিট ছেড়ে রাজনৈতিক আর সংসদ বিটের সংবাদের পেছনে দৌড়ানো শুরু করি। তাই রুনির সাথে অ্যাসাইনমেন্টে দেখা হওয়া একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। এরপর কালেভদ্রে দেখা বা কথা হতো।

২০১০ সাল। আমি নেদারল্যান্ডস এ একটা ফেলোশিপে গেছি। হঠাৎ একদিন ফেসবুকে ইনবক্সে দেখি, রুনি।

লিখেছে, ‘কিশোয়ার, আমি সব ছেড়েছুড়ে চলে এসেছি জার্মানি। সাগরের কাছে। এতোদিনের ক্যারিয়ার ছেড়ে চলে এলাম। বলল, মেঘ বড়ো হচ্ছে। বাবা’কে খুব মিস করে।’ আমিও তাকে আশ্বস্ত করলাম।

বললাম, ভালই করেছো। এরপর যতদিন নেদারল্যান্ডস ছিলাম প্রায়ই কথা হতো ফোনে আর ফেইসবুকে। জার্মানীতে বেড়াতে যেতে বলতো। যাওয়া হয়নি। দেশে ফেরত চলে গেলাম।

রুনি, এখন তোমাকে জানাই, আমিও সব ছেঁড়েছুঁড়ে চলে এসেছি। এতোদিনের ক্যারিয়ার- সবকিছু। তোমার ক্ষণিকের প্রবাস জীবনে আমাদের আলাপে তোমার কিছুটা সময় হয়তো কাটতো। কিন্তু আমার প্রবাস জীবনে আর তোমাকে পেলাম না। ভাল থেকো।

তোমাদের মৃত্যুর দায় তো আমারও

জার্মানী থেকে দেশে ফেরত যাওয়ার কিছুদিন পর রুনির ফোন পেলাম। আমি তখন অফিসে। ও বলল, কিশোয়ার আমি তোমার বাসায়- ইন্দিরা  রোডে। তোমার মা’র সাথে কথা হচ্ছে। আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম। কিভাবে?

বলল, তোমার পাশের খালি ফ্ল্যাট দেখতে এসে দারোয়ানের কাছে জানলাম পাশেই তুমি থাক। ফ্ল্যাটটা পছন্দ হয়েছে। কিন্তু আমার কাছে যখন জানতে চাইলো, ভাড়া নেবে কিনা। বিদ্যুতের সংযোগে কিছুটা ঝামেলা থাকায় আমি সম্মতি দিলাম না। বিদ্যুতের বেশি লোড হলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ও আর ফ্ল্যাটটা ভাড়া নিল না। কিন্তু পশ্চিম রাজাবাজারে মা’র কাছে মেঘকে রেখে সাগর ভাই আর রুনিকে অফিস করতে হবে বলে ঐ এলাকাতেই তাদের বাসা ভাড়া নিতে হবে।

নিলও তাই। আর সে বাসাতেই নৃশংসভাবে খুন হতে হলো। আমি এখনো ভাবি, আমাদের বিল্ডিংয়ে থাকলে হয়তো এভাবে খুন হতো না। আমাদের দারোয়ান এতটাই কড়া। তাই দুর্বল মন মাঝে-মাঝে নিজেকেও এই মৃত্যুর জন্য দায়ী ভাবে।

শেষ দেখা:

হত্যার প্রায় দেড় মাস আগে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পত্রিকা আর টেলিভিশনের সাংবাদিকদের একটা অনুষ্ঠানের কথা জানতে পারলাম সন্ধ্যাতেই। সেই অনুষ্ঠানেই রুনির সাথে আমার শেষ দেখা। অনুষ্ঠান শেষ করে ফিরলাম এক গাড়িতে। ওকে নামিয়ে দিলাম নভোথিয়েটারের সামনে। খুব অল্পসময়ে কথাতে বলল, ভাল নেই। এখনো সিনিয়র রিপোর্টার পদ থাকায় একটু মন খারাপের কথা জানালো।

ব্যাস, ঐটুকু স্মৃতিই এখনো তাড়িয়ে বেড়ায়। মনে হয়, আরেকটু বেশিসময় পেলে কি ও আরো কিছুবলতো? মন খারাপের আরো কথা কি শেয়ার করতো?

দেখতে দেখতে তিন বছর হয়ে গেলো। এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরে তোমাদের খুনিরা। এমন আরো অনেক অনেক বছর চলে যাবে। ধরা পড়বে না হত্যাকারিরা। তোমাদের বন্ধু, সহকর্মী ফেইসবুকে যার যার আবেগ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে! ১১ ফেব্রুয়ারি এলে পত্রিকা আর টিভি নিউজ গুলোতেও হত্যাকাণ্ডের ফাইল ছবি দিয়ে একটা ফলোআপ স্টোরি হবে।

আমি নিশ্চিত যে ক্রাইম রিপোর্টাররা দুই তিনদিন আগেই নিজ নিজ চিফ রিপোর্টারকে তারিখটা মনে করিয়ে দিয়ে একটা ফলোআপ স্টোরি করার তাগিদ দেবেন। র‌্যাব আর পুলিশের কোন বড় কর্মকর্তার সাক্ষাতকারও নেয়া হবে! গত তিন বছর ধরে এমনটাই হচ্ছে।

আর যারা শ্রদ্ধেয় খুনী, তারা হয়তো এসব মরাকান্না আর নিউজ-ভিউজ দেখে মুচকি হাসবেন! বলবেন, চালিয়ে যাও তোমরা। বছরের একটি দিন তোমরা আমাকে/আমাদের বিনোদন দিয়ে যাও! তোমরা আমার/আমাদের কিচ্ছুটিও করতে পারোনি আর পারবেও না।

আসলেই তো। ফেইসবুকে আবেগ, কষ্ট, দু:খ আর ক্ষোভ প্রকাশ ছাড়া আমরা কিছুই করতে পারবো না। আমাদের হাত বাঁধা, মুখও বাঁধা। মনটাকে তাই শক্ত করা ছাড়া আমরা আর কীইবা করতে পারি বলো!

ভাল থেকো তোমরা যেখানেই থাকো।

কিশোয়ার লায়লা

টরন্টো, কানাডা

শেয়ার করুন:
  • 186
  •  
  •  
  •  
  •  
    186
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.