মাতৃত্বকালীন ছুটি ও আমাদের মানসিকতা

Women Riseতামান্না কদর: আমরা চাকুরীবিধি অনুযায়ী জানতে পেরেছি ছুটি কোন অধিকার নয়, সুবিধে। আমি ব্যক্তিগতভাবে এ বিষয়ে একমত নই, বিশেষত অসুস্থতা এবং মাতৃত্বজনিত ছুটির বেলায় তো নয়ই। ২০১২ সালের ১০ জুলাই এ প্রথম আলোয় প্রকাশিত হল ”মাতৃত্বকালীন ছুটি বাড়লে জন্মহার বাড়বে”। এমনটি মনে করে বিজিএমইএ।

মানসুরা হোসাইন শিরোনামটিতে ’(!)’ চিহ্ন জুড়ে দিয়ে যথার্থই করেছেন। বিদ্যমান ১৬(৮+৮) সপ্তাহ থেকে বাড়িয়ে ২৪ সপ্তাহ করার প্রস্তাব শ্রম মন্ত্রণালয়ে জমা আছে। বিজিএমইএ এই প্রস্তাবের পক্ষে তো নয়ই, বরং ভারতের মতো বাংলাদেশেও ৮৪ দিন ছুটি যৈাক্তিক মনে করছে। আমাদের একটি স্বভাব হল- উন্নত দেশের সাথে তুলনা করা। একবারও এর যৈাক্তিকতা, আমাদের দেশের সংস্কৃতির সাথে এর সমন্বয় হবে কীনা, মানবতা অটুট থাকবে কীনা তা ভেবে দেখি না। বিজিএমইএ অবশ্য তাদের পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছে, এ যুক্তি আবার কেটে দিয়েছেন শ্রমসচিব মিকাইল শিপার, ‘বাজে যুক্তি’ বলে। তাকে ধন্যবাদ।

তিনিও ছয় মাস ছুটির পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছেন, তার যুক্তির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে বলতে চাই ”মাতৃত্ব নারীর একার ব্যক্তিগত কোনও বিষয় নয় যে মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস করলে ‘নারীবান্ধব সরকার’ বলে সরকারকে বাহ্বা দেয়া যাবে। নারীবান্ধব হবার জন্যে সরকারকে আরো অগ্রবর্তী কাজ করতে হবে, যেখানে সংবিধান কর্তৃক স্বীকৃত নারী-পুরুষের সমান অধিকার অনুযায়ী নারী জীবনের সকল ক্ষেত্রে সমানাধিকারী হবে।

বলে রাখি- ’নারীবান্ধব’ সরকার তখনই বলা যাবে, যখন যে সরকার মা-বাবার সম্পত্তিতে মেয়ে ও ছেলের সমান প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে পারবে।

প্রসঙ্গক্রমে আবার আসি- বিজিএমইএ তাদের যে যুক্তিগুলি দেখিয়েছে তা যে শুধু অমানবিক তাই-ই নয়, অকৃতজ্ঞ মনোভাবের ও বহিঃপ্রকাশ। সরকার সরকারী কর্মজীবি নারীদের জন্যে মাতৃত্বকালীন ছুটি ৬ মাস করেছে। আমি যতদূর জানি- বেসরকারী প্রতিষ্ঠান, এম.পি.ও ভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছয় মাসের ছুটি কার্যকরি বা অনুমোদিত নয়। ভাবতে অবাক লাগে। কোন নারীর বেলায় চার মাস, কোন নারীর বেলায় ছয় মাস। কেন? কোন নারীর শরীর নরম মাংস দিয়ে তৈরী, কোন নারীর শরীর কী শক্ত কোন বস্তু দিয়ে তৈরী ? সামান্য হেরফের ব্যতীত ( যেমন পুষ্টি, অস্ত্রোপচার) সকল নারীরই প্রসবজনিত যন্ত্রণা একইরকম।

বিজিএমইএ এর যুক্তির বিপক্ষে বলতে চাই- ৬ মাসের মাতৃত্বজনিত ছুটিটি কেবল প্রসবজনিত জটিলতার কথা বিবেচনা করেই করা হয়নি, এখানে শিশুকে মায়ের দুধ পান করানোর কথা বিবেচনা করা হয়েছে। আমি মানবাধিকারকে সম্পূর্ণ অগ্রাধিকার দিয়ে বিবেচনা করে বলতে চাই, এই ছুটি অন্তত এক বছর করা হোক সবেতনে। সবেতনে এক বছরের ছুটির কথা শুনে বিজিএমইএ এর কর্তাব্যক্তিদের চোখ কপালে উঠতে গিয়ে খসে যাবে হয়ত। যাক। তবু চাই। কেননা এটি শুধু নারী অধিকার নয়। এটি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের অধিকার। নারী যে শুধু মেয়ে শিশু প্রসব করে তা তো নয়। তাহলে এখানে শিশু (মেয়ে/ছেলে) , নারী নিজে, নারী যাকে দিয়ে গর্ভবতী হয়েছে সে পুরুষ , সকলের স্বার্থ জড়িত।

শিশু মানে ভবিষ্যত। জীবনের জন্যে কাজ, কাজের জন্যে জীবন নয়। কাজের জন্যে জীবনকে অবজ্ঞা করে ব্যবসায়ী মুনাফা লুটতে লোভী হয়ে উঠতে পারে কিন্তু আমরা সাধারণ মানুষেরা জীবনকে সুন্দর করে তোলতে জীবনের সবগুলি অধিকার অর্জন করতে চাই।

‘২০০৬’ সালে শ্রম আইন সংশোধনীতে এই ছুটির মেয়াদ ছয় মাস করার প্রস্তাব করা হলেও দুঃখজনকভাবে সত্য, পুরো বাংলাদেশে এখনো এই বিষয়ে প্রস্তাব, উপপ্রস্তাব, আলোচনা চলছে। কেন? এখনো কেন এর চূড়ান্ত ফল আমরা এই দেশের নাগরিকেরা ভোগ করতে পারিনি!! এ দায় কার? দায়টা তাদেরই, যারা মানুষের অধিকারগুলিকে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে তুচ্ছ মনে করে নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যে।

বিজিএমইএ কর্তৃক পাঠানো প্রস্তাবের বিপরীতে বলতে চাই- জন্মনিয়ন্ত্রণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কাজও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সেইসাথে গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যত সুস্থ মেধাবী প্রজন্ম। নাকী বিজিএমইএ মনে করে যে, শ্রমজীবি নারীর শিশুরা মেধাবী হতে পারে না! শিশু তার মাকে নিবিড় করে পাওয়াটা একান্ত জরুরি। একজন নারী যখন সন্তানের মা হন, তখন তার কাছে সবচে প্রাধান্য পায় যে বিষয়টি তাহলো তার শিশু। অনেক নারী তার শিশুর নিরাপত্তার কথা ভেবে কাজ ছেড়ে দেন। আমাদের তা কাম্য নয়। কাজও প্রয়োজন, কিন্তু আমরা সেই পরিবেশ আজো তৈরী করতে পারিনি। নারীর শিশুটিকে একান্ত নারীরই ভাবি অসভ্যের মতো, ভাবি না- এ শিশু সমাজের, রাষ্ট্রের তথা মানবজাতির।

বিজিএমইএ এর অকৃতজ্ঞ মনোভাব সম্পর্কে এভাবে বলতে চাই যে – ওনারা বেশীরভাগই তো পুরুষ, উনারা ভুলে গেছেন যে তারাও কোনও না কোন নারীর গর্ভে জন্মেছেন, তাদের দুধ পান করে শরীর টিকিয়ে রেখেছেন, তাদের পরম মমতায় আশ্রয় খুঁজে নিয়েছেন। যদি সম্ভব হতো তাহলে বিজিএমইএ এর কর্তাব্যক্তিদের বলতাম, ভূমিষ্ঠ হবার পর থেকে ১ বছর বয়স পর্যন্ত আপনাদের পৃথিবী কেমন ছিল- তা ভাবতে। আমি নিশ্চিত আপনাদের পৃথিবী ছিল মায়ের দুধ, মায়ের ওম, মায়ের আশ্রয় আর মায়ের শরীরের গন্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এ ছাড়া অন্য কোন জগৎ ছিল না অন্যসব শিশুদের মতো আপনাদেরও। না হয় তিন বছর বয়স থেকে ১০ বছর বয়স পর্যন্ত মনে করার চেষ্টা করুন। কেমন ছিল আপনাদের পৃথিবী ? মা ছাড়া আর কোনও বিষয়কে কী আপনি একান্ত আপন ভাবতে পারতেন ? পারতেন না। আজ নিজের জীবনের দায়িত্ব নেয়ার ক্ষমতার্জন করে ভুলে গেলে তো চলবে না ’উৎস’।

পোশাক শিল্পের কাজের ধরণ সম্পর্কে আমরা জানি। এখানে প্রতিটি কাজ অত্যন্ত ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়। এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় একজন বা দুজন বিচ্ছিন্ন হলে কাজের গতি কমতে পারে, উৎপাদনমাত্রায় হেরফের হতে পারে। তবে কঠোরভাবে বাধাগ্রস্থ হবে না, এটা নিশ্চিত। শুন্য স্থানে নিয়োগ দিলে তাদের জটিলতা বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করেন তারা। তাহলে দেখা যাচ্ছে শিশুর অধিকার থেকে, মানুষের অধিকার থেকে উৎপাদনের মাত্রা নিয়েই বেশী চিন্তিত বিজিএমইএ এর কর্তাব্যক্তিরা। তারা একবারও ভেবে দেখেন না, তাদের কারখানাগুলি কারা সচল রাখে, কাদের নিম্ন মজুরীতে খাটিয়ে বিত্তবান হন, সমাজে গণ্যমান্য ব্যক্তি হন। নারীরা তাদের শ্রমের পুরোটাই , জীবনধারনের অনুপযুক্ত মজুরীতে, অনিশ্চিত পেশায় দিয়ে দিচ্ছেন আর বিজেএমইএ এর কর্তা ব্যক্তিরা অতিঅল্প ছয় মাস ছুটি দিতে চান না। লজ্জাকর, অবমাননাকর।

দয়া করে সভা-সেমিনারে মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলবেন না, নারী অধিকার নিয়ে তো নয়ই। মাতৃত্বজনিত ছুটিকে একান্ত নারীর বিষয় না ভেবে মানবজাতির বিষয় হিসেবে ভাবুন তাহলে ছয় মাস ছুটি দিতে আপনাদের দ্বিধা হবে বলে মনে করি না। মাতৃত্ব শুরুর সময়ে নারীর শরীর ও মন দুই-ই অত্যন্ত অস্থির এবং অসহায় থাকে, এটি পুরুষের শরীর ও মন দিয়ে বোঝা খুব দুরূহ, কিন্তু বর্তমান পরূষও তো একদিন শিশু ছিল যেমন আপনারাও ছিলেন। এভাবে ভাবুন, তাহলেও ছয় মাস ছুটি দিতে দ্বিধা থাকবে না।

আর বিজিএমইএ এর এই যে যুক্তি -ছুটি বেশী হলে জন্মহার বাড়বে। এও হাস্যকর। মাত্র দুমাসের ব্যবধানে , দুমাসের ছুটি বেশী পাবে বলে শ্রমিকের মানসিকতা এমন পরিবর্তিত হবে না যে সে কেবল সন্তানধারণেই উৎসাহী হবে বা সন্তান সংখ্যার চাহিদা বাড়াবে। বরং একজন নারীর জীবনের সকল দিক, অর্থনৈতিক, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রিক সকল অধিকার এবং সুবিধে নিশ্চিত করতে পারলেই জন্মহার কমানো সম্ভব হবে। আর জন্মহার কমানো বা বাড়ানোর বিষয়ে শুধু নারীকেই দায় দিচ্ছেন কেন তারা ? এটি বুঝতে পাচ্ছি না। এও হাস্যকর। কেননা নারী এখনো পর্যন্ত গর্ভধারণে পুরুষের শুক্রাণু ব্যবহার করে। প্রযুক্তি এখনো অতটা এগোয়নি বা সহজলভ্য হয়নি যে নারী , পুরুষ ছাড়াই তার নিজের অনুলিপি তৈরী করবে। জন্মহার কমানোর অজুহাতে কী একদিন বিজিএমইএ এর কর্তাব্যক্তিরা শ্রমজীবি নারীর গর্ভধারণেও বাধা দেবেন! ভুলে যাচ্ছেন কেন দুটির বেশী মাতৃত্বকালীন ছুটি তো দিচ্ছেন না। তাহলে জন্মহার বৃদ্ধির অজুহাতে কোনওক্রমেই এই ছুটির মেয়াদ বাড়তে না দেয়া যৈাক্তিক নয়, বরং হাস্যকর।

মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, কোরিয়া, চীন, ভারত, ফিলিপিন এর ছুটির মেয়াদ উল্লেখ করেছেন তারা। বিবেচনা করবেন কী সে দেশগুলি কতদরে শ্রম কেনেন ? তুলনাই যদি দেবেন তো শ্রমের সাথে পারিশ্রমিকের কথাটিও মাথায় রাখবেন। শ্রম সচিব মিকাইল শিপারকে আবারো ধন্যবাদ জানাই এজন্যে যে- তিনি খুব ঠিক কথাটি বলেছেন” মা হবার পর আর বিভেদ করার উপায় নেই, সবার প্রয়োজন একই থাকে।”

বিজেএমইএ এর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বললেন” পোশাকশিল্পের নারী শ্রমিকেরা সন্তান প্রসবের আগে ছুটি নিচ্ছেন। তাই ৪ মাস বা তার চেয়ে কিছু কম দিনের জন্যে যে ছুটি পাচ্ছেন তা যথেষ্ঠ।” সিদ্দিকুর রহমান সাহেবকে বলি আপনার শরীর ও মন দিয়ে বিবেচনা করলে তো হবে না, এইটুকু ছুটি যথেষ্ঠ কী যথেষ্ট নয়। জানতে হলে সংশ্লিষ্ট নারী এবং সংশ্লিষ্ট শিশুর (মেয়ে/ছেলে) শরীর ও মনকে বুঝতে শিখুন, জানতে চেষ্টা করুন এইটুকু ছুটি কতোটা যথেষ্ট!

মানুষকে যদি মানুষ ভাবতে না পারি, মুনাফার চেয়ে শিশুর চাহিদা তথা ভবিষ্যতকে গুরুত্ব না দিতে পারি তবে অত উৎপাদন আর অর্থ-উন্নতি দিয়ে কি হবে ? কোন সম্পদ কী মানুষের একান্ত নিজের বলে হয় ? হয় না। তার প্রমাণ আমরা প্রত্যহ পাই। কিছু নিতে পারেনি সাথে করে যারা প্রকুতির শক্তির সাথে নিজমৃতদেহের শক্তিকে, শক্তির অবিনাশিতাবাদ সূত্রানুযায়ী রূপান্তর করে দিয়েছে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.