নো ওয়ান কিল্ড সাগর-রুনি

Sagor-Runi-1417505625উদিসা ইসলাম: মাঝে মাঝে খুব অস্বস্তি হয়। কোথায় যেন কে বলে বত্রিশ দাঁত বের করে বলছে- ‘কেমন মারলাম বলো। কেউ ধরতে পারলো না’। অস্বস্তি হয় যে কাউকে দেখলে- ‘সাগর রুনিকে সে মারেনি তো!’

তথ্যহীন জীবন সবচেয়ে সঙ্কটের। আর সেই সঙ্কটে আমরা পড়ে আছি গত তিন বছর ধরে। অবিরাম। হ্যাঁ। আমাদের সহকর্মী সাগর সরোয়ার ও মেহেরুন রুনির হত্যাকাণ্ডের তিনবছর হয়ে গেলো। আমরা তথ্যহীন। নতুন নতুন কতকিছু শিখলাম- কিভাবে ভুলিয়ে দিতে হয়, কিভাবে আন্দোলন জমজমাট হয়েও ফিকে হয়ে যায়,  ভেসেল টেস্ট,  ডিএনএ টেস্ট কতকিছু। অনেক তথ্য, তবুও তথ্যহীন- জানি না আজও কি হয়েছিল, কিভাবে, আর কেনই হয়েছিলো!

হ্যা!, ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজারে নিজেদের বাসায় খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রুনি। সেই কথাই বলছি। গত তিনবছরে পেশাগত দায়িত্বপালনে যেখানেই গিয়েছি, এই প্রশ্নের মুখোমুখি হননি এমন সাংবাদিক কেউ আছেন কিনা সন্দেহ।

কী উত্তর দেন তারা? ‘আসলে এটা অন্য হত্যাকাণ্ডের মতো না, ‘আসলে অনেক কিছু হতে পারে’, ‘আসলে তদন্তাধীন বিষয়ে আলাপ না করা ভাল, ‘আসলে আমি জানি না, ‘আসলে আমরা চেষ্টা করেছি জানতে, কোন না কোনদিন জানা যাবে। এই আসলে শব্দটা বারবার কথার আগে ব্যবহার করা দেখলেই বুঝবেন সেটা ‘আসলে’না; নকলে। মানে হলো যেটা আমার জানা নেই সেটার উত্তর যখন দিতেই হবে আমাকে তখন এই আসলে শব্দের লেবাস নিতে হয় আমাকে।

কিন্তু যে প্রশ্নের উত্তর আপনি জানেন না সেটার উত্তর কেন করতে হবে? করতে হবে কারণ, সাংবাদিক হিসেবে আপনার অবস্থান যাতে নড়বড়ে না হয় মাঠে-ঘাটে সে চেষ্টা আপনাকে আমাকে করতে হয়। আপনি কোন অনুসন্ধান প্রতিবেদনের কাজ করতে মাঠে গেছেন আপনার বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা, স্বাগত জানানো মানুষটি বলবে, আপনারা নিজেদেও সহকর্মীর হত্যাকাণ্ডের সুরাহা করতে পারেন না কিন্তু অন্যদের দোষ ধরতে তো কমতি দেখি না। তখন,  আপনার পরিচয় টিকিয়ে রাখতেই আপনাকে নানাবিধ উত্তর দিতে হয়। কিন্তু আসল উত্তরটা জানা যাবে কবে?

হত্যা রহস্যের কিনারা করতে না পারায় হাইকোর্টের নির্দেশেই ২০১২ সালের ১৮ই এপ্রিল মামলাটি পুলিশ থেকে র‌্যাবে স্থানান্তর করা হয়। র‌্যাব তদন্তের দায়িত্ব নেয়ার পর সন্দেহভাজন ১৬ জনের ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠায়। এছাড়া আলামত হিসেবে জব্দকৃত ছুরি ও পোশাকের নমুনাও পাঠানো হয়। কিন্তু তারপরও যে খুনি সনাক্ত করা যায়নি সেটা এখন পর্যন্ত অগ্রগতি দেখলে বোঝা যায়।

আর হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে যে আন্দোলন দানা বেঁধেছিলো সেটার পরিণতি যা দাঁড়িয়েছে সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটিকে খোদ ঘটনা হিসেবে সামনে ধরে রাখা, জিইয়ে রাখার কাজ এককভাবে পরিবারকেই করতে হবে আগামীতে বলে মনে হয়। একটা হত্যাকাণ্ডকে নিয়ে সাংবাদিক দল-গোষ্ঠীর এক কাতারে দাঁড়ানো, যাকে আমি সর্বদলীয় সহমত মঞ্চ বলি, খুব চিন্তা উদ্রেক করে। মাঠে আগে থেকে বোঝাপড়া শেষ না করে কোন এক হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে একসাথে আন্দোলনে নামার মধ্যে অন্য রাজনীতি থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আমি চাই, আন্দোলনকারীদের নিয়ে আমার এই ‘আসলে টাইপের আন্দাজ’ যেন কোনদিনও সত্য প্রমাণিত না হয়।

আমরা হা হুতাশের মধ্য দিয়ে ১১ ফেব্রুয়ারি পার করি প্রতিবার। করণীয় কি তা খুঁজে পাই না। এমন কতদিন চলবে সেই দিনগোনার কাজটাও অন্য কেউ করে দিবে না। আমাদেরই করতে হবে। আসুন নিরলস পূর্ণ উদ্যোমে আবার দিন গুনি।

লেখক পরিচিত: গণমাধ্যমকর্মী

শেয়ার করুন:
  • 113
  •  
  •  
  •  
  •  
    113
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.