পোস্টমর্টেম: রুবেল-হ্যাপি সম্পর্ক

Happy n Rubelশামান সাত্ত্বিক: গত ১৪ জানুয়ারী ২০১৫-এ অনলাইন পত্রিকা “বাংলা ট্রিবিউন”-এ দেয়া প্রাক্তন সহ-ব্লগার আইরিন সুলতানার লেখা রুবেল-হ্যাপী যৌন প্রতারণা মামলা: ধর্ষণ, মিডিয়া, আইন ও বিসিবি লেখাটা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলো। লেখাটা পড়ার পর রুবেল ও হ্যাপির সম্পর্ক নিয়ে একটা পোস্টমর্টেম করাটা জরুরি বলে প্রতিপন্ন হলো।

কেননা মনে হচ্ছে, দু’পক্ষ দু’দিক থেকে দু’ভাবে এই সম্পর্ককে বিচার করছে, কিন্তু তাদের সম্পর্কের গভীরে প্রবেশ করছে না। এই ধরনের সম্পর্কের যে মনোবিশ্লেষণ প্রয়োজন, তার কাছাকাছি না এসে একপক্ষ, অন্য পক্ষকে দোষারোপে আবদ্ধ করে ফেলছে। অথচ নারী-পুরুষের সম্পর্কের সামাজিক এবং ঐতিহাসিক যে বিবর্তন, তা বোধ হয় আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যাচ্ছে।

আইরিন সুলতানার লেখাটা ধরে এগুলো, বেশ কিছু জিনিস সহজ করে তুলে ধরা যায়। যেমন, তিনি তার লেখার দ্বিতীয়াংশে বলেছেন, “একইভাবে ‘প্রলোভন’ শব্দটি ভ্রান্ত ইন্টারপ্রিটেশন বিস্তারে ভূমিকা রাখছে। নারীর জন্য শব্দটি ‘প্রলোভন’ নয়, বরং ‘প্রতিশ্রুতি’, যাতে নারীটি আস্থা রেখে ভুল করছেন। পুরুষটি প্রতারণার মানসিকতায় বিবাহের ‘প্রলোভন’ দেখিয়েছেন আর নারীটি সেটাকে ’প্রতিশ্রুতি’ হিসেবে গ্রহণ করেছেন- পরিস্থিতির ব্যাখ্যা মূলত এটাই।”

-খুবই চমৎকারভাবে উনি বললেও,ওনার এই বিশ্লেষণটাকে একেবারেই ডাবল স্ট্যান্ডার্ড বলে অভিহিত করা যেতে পারে। ধরে নিলাম হ্যাপি নামের নারীটি ’প্রতিশ্রুতি’ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এই কথা অনুযায়ী প্রতিশ্রুতিটা একজনের জন্য প্রযোজ্য, আবার অন্যের জন্য নয়। এই ‘প্রতিশ্রুতি’ ধরে এগোতে গিয়ে দেখি উনি রুবেলকে ‘প্রলোভন’-এর দায়ে দায়ী করেছেন। এটাকে মনগড়া বা মনের মাধুরী মাখিয়ে বললে অত্যুক্তি হবে না নিশ্চয়ই?

উনার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হ্যাপী যদি প্রতিশ্রুতি হিসেবে গ্রহণ করে, তবে সেক্ষেত্রে রুবেল সেই ‘প্রতিশ্রুতি’ ভঙ্গ করেছে। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করাটা আইনের চোখে কোন অপরাধ নয়। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কেউ বাড়ি কিনলে, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নিয়মমত টাকা পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু অবস্থার দুর্বিপাকে ব্যাংককে দেয়া প্রতিশ্রুতি রাখতে না পারলে তাকে কি অপরাধ বলবেন? মোটেই না। বড়জোর ক্রেতা ভদ্রলোক বা ভদ্রমহিলা তার বাড়িটা হারাবেন। সেই জনের অর্থনৈতিক ক্রেডিট রেকর্ড খারাপ হবে, যাতে করে অন্য ব্যাংক বা ঋণ-দেয়া সংস্থাগুলোর কাছে ক্রেতা ব্যক্তির অর্থনৈতিক ইমেজ নষ্ট হবে। আর তাই রুবেলের ভাল ছেলের ইমেজটা আর থাকছে না।

আইরিন হুমায়ুন আজাদকে উদ্ধৃত করে লিখেছেন, “হুমায়ুন আজাদ বিবাহিত নর-নারীদের মধ্যকার এই যৌন যোগাযোগকে কটাক্ষ করেছিলেন ‘চুক্তিভিত্তিক দেহদান’ বলে।” আমি আরেকটু এগিয়ে আহমদ শরীফকে উদ্ধৃত করছি। তিনি বলেছেন, “Marriage is a legal prostitution.”

আধুনিক এবং বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায়, যৌনতা একটা স্বাভাবিক শারীরিক চাহিদা। প্রাকৃতিকভাবে এটা দু’ভাবে মেটানো যায়। এক. পারস্পরিক সম্মতিতে এবং দুই. প্রেমের তীব্রতায় নিমজ্জিত হয়ে একে অন্যকে সঁপে দিলে। প্রেমে সেটা উজাড় করেই দেয়, তা অন্য কোন রকম যৌন সম্পর্কে সেভাবে সম্ভব কী না, আমার জানা নাই। যৌনতা বা যৌন সম্পর্কই তো ইরোটিক, সেখানে ‘’সঁপে দেওয়া’ এবং ’উজাড় করে দেওয়া’ একটা ইরোটিক ভিজ্যুয়াল ডিসপ্লে ঘটায় পাঠকের সামনে’ এ কথা বলার আর কোন প্রয়োজন পড়ে কি? হ্যাপি-রুবেলের মধ্যে তো যৌন সম্পর্ক ছিলই, না কি? সেটাকে উপরোক্ত শব্দগুচ্ছ (phrase) দিয়ে প্রকাশ করলে আপত্তি কেন হতে পারে? বুঝলাম না!

উপরে উল্লিখিত দু’ধরণের যৌন সম্পর্কে কোন চুক্তি বা প্রতিশ্রুতির প্রয়োজন নেই। এটা মনুষ্য প্রজাতির হরমোনের কারণে উদ্ভূত চাহিদা। ঐ দু’ধরনের যৌন সম্পর্ক ছাড়াও চুক্তি বা প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে যৌন ক্ষুধা মিটানো সম্ভব। যেমন, যৌন কর্মীর সাথে খদ্দরের চুক্তি/প্রতিশ্রুতি। এটাকে আমরা পতিতাবৃত্তির পর্যায়ে ফেলি। কোন ধরনের চুক্তি বা প্রতিশ্রুতি্র বিনিময়ে যৌন সম্পর্কই পতিতাবৃত্তির শামিল। এটা শুধু আমার উপলব্ধি নয়, হুমায়ুন আজাদ এবং আহমদ শরীফের উপলব্ধিও তাই। প্রেম না হয়ে বিবাহের প্রতিশ্রুতিতে যৌন সম্পর্ক স্থাপনটা বড়ই বেমানান নয় কি? এই যদি হয়ে থাকে তবে হ্যাপিকে রুবেলের সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়ে আমার মোটেও সৎ মনে হয়নি। বরং পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে হলেও সেটাকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণযোগ্য বলা যেত।

এখন কি আনুশকা শর্মা বলে বসবে, বিবাহের ‘প্রলোভন’ দেখিয়ে ভিরাট কোহলি তাকে ধর্ষণ করেছে?

আসলে কি তাদের মাঝে প্রেম ছিল? প্রেমের তীব্রতা কতটুকু ছিল, সেটা বোকা (অবলা বললে কেউ কেউ রাগ করে) হ্যাপি, যে একজন অভিনেত্রী, আদৌ উপলব্ধি করেছেন কী না আমাদের জানা নেই। আর যদি অনেক পরে রুবেলের প্রতি প্রেমটাকে হ্যাপির ভুল বলে উপলব্ধি হয়ে থাকে, তবে তার মত একজন অভিনেত্রী বা শিক্ষিত মানুষের জন্য অনেক দেরী হয়ে গেছে। ধরে নিলাম, রুবেল প্রেমের অভিনয় করেছে। বাংলাদেশে প্রেম করলে তো বিয়েও করতে হবে, তাইতো! রুবেল প্রেমের অভিনয় করেছে, সেটা কিভাবে প্রমাণ করবে হ্যাপী? এটা প্রমাণের কি কোন মানদণ্ড আছে? রুবেল প্রেমের অভিনয় করেছে, ধরে নিলেও কাজ হচ্ছে না। তাই ধরে নিলাম, রুবেল হ্যাপির সাথে প্রেম করেছে। প্রেমে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু না। প্রেম থেকে অপ্রেম হচ্ছে অহরহ। এটা নতুন কিছু নয়। অপরাধও নয়।

আইরিন সুলতানার লেখায় দেখলাম, বাংলাদেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ (২০০৩ এর সংশোধনীসহ) এর ৯(১ ) ধারার ব্যাখ্যায় বলা আছে, “যদি কোনও পুরুষ বিবাহ ছাড়া ষোল বছরের বেশি বয়স্ক কোনও নারীর সাথে তার সম্মতি ছাড়া বা ভয় দেখিয়ে বা প্রতারণামূলকভাবে তার সম্মতি আদায় করে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে, তবে তা ধর্ষণ বলে গণ্য হবে।”

এখন প্রশ্ন হলো, কিভাবে বা কোন ধরনে প্রতারণামূলকভাবে সম্মতি আদায়? এটার সঠিক আইনী ব্যাখ্যা না পেলে রুবেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ আদৌ ধোপে টিকবে কী না, আমি প্রকৃতই সন্দিহান। শুধু আইন তুলে দিলেই তো হলো না। আইনেরও তো শত মার-প্যাঁচ আছে জানি। আইন তো আর ছেলের হাতের মোয়া নয়।

আইরিনের একই লেখাতে দেখি, “বাংলাদেশে দণ্ডবিধির ৩৭৫ নং ধারা অনুযায়ী ”কোনও নারীকে বিয়ে না করেই ব্যক্তিটি তার আইনসঙ্গত স্বামী এই বিশ্বাস দিয়ে যদি কোনও পুরুষ যৌন সর্ম্পক স্থাপন করে তাকে আইনের ভাষায় ধর্ষণ বলা হবে।” অর্থাৎ “তাহার সম্মতিক্রমে, যেক্ষেত্রে লোকটি জানে যে, সে তাহার স্বামী নয় এবং নারীটি এই বিশ্বাসে সম্মতি দান করে যে, পুরুষটির সহিত সে আইনানুগভাবে বিবাহিত অথবা সে নিজেকে আইনানুগভাবে বিবাহিত বলিয়া বিশ্বাস করে”, এমতাবস্থায় ”যদি কোন ব্যক্তি, কোনও নারীর সহিত যৌন সহবাস করে তবে উক্ত ব্যক্তি ‘র্ধষণ’ করে বলিয়া গণ্য হইবে।”

এখানে নারীটির বিশ্বাসের ভিত্তি হলো, সে আইনানুগভাবে বিবাহিত। রুবেল তো নিজেকে কখনো হ্যাপির আইনসঙ্গত স্বামী বলেননি বা তারা আইনানুগভাবে বিবাহ করেছে, তাও বলেননি। যদি বলতো, তবে হ্যাপি কেন রুবেলকে বিয়ের চাপ দিলো?রুবেল কখনো কি বলেছে, আমরা বিয়ে করে ফেলেছি, এখন এক সাথে বিছানাযাপন করতে পারবো?

কিছুদিনে আগে ইউটিউবে বাংলাদেশি এক টিভি চ্যানেলের ক্রাইম রিপোর্টে দেখলাম, ভুয়া কাজীর কাছে গিয়ে ভুয়া বিবাহ দেখিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মত জীবন-যাপন। তেমন কি রুবেল করেছে? না কি বলেছে, শিশুকালে আমাদের পিতা-মাতা আমাদের বিয়ে দিয়ে দিয়েছিলেন, বা আমরা পীরের মাজারে গিয়ে মাজারকে স্বাক্ষী রেখে নিজেদের এক বন্ধনে আবদ্ধ করেছি (যদিও এটা আইনানুগ নয়)। যাই করুক না কেন, তার প্রমাণ কিন্তু আদালতে দেখাতে হবে, জলজ্যান্ত দলিল। এসব প্রামাণ্য না দেখাতে পারলে, তাকে প্রতারণাই বা কিভাবে বলি? আর ধর্ষণ বলা তো দূরের কথা।

একটা জিনিস আমি বুঝতে পারি, প্রেমে হাবুডুবু খেলে প্রেয়সী/প্রেমিকাকে একসময় বউ বলে ফেলে, আবার প্রেমিকাও তেমনি প্রেমিককে বলতে পারে স্বামী। নিজেদের আগাম ভবিষ্যতের স্বামী-স্ত্রী ভেবে নিতে পারে। সেইভাবে চলতেও পারে। এটা খুবই স্বাভাবিক। হ্যাপী নিজে তাই ভেবেছিলো বলে এক রেডিও অনুষ্ঠানে বলেছে, এবং সেটা যে সে ভুল করেছে, তাও স্বীকার করেছে। আমরা হ্যাপীর ভাষ্যই সেখানে পেয়েছি।

প্রশ্ন হলো, বিবাহের ‘প্রলোভন’ বা প্রতিশ্রুতি দিলে বিবাহ না হওয়ার আগে সে কেন রুবেলের সাথে শয্যাশায়ী হলো? এখানেই হ্যাপির দায়িত্ব নেয়ার প্রশ্নটা এসে যায়। আর রুবেল প্রেমের অভিনয় করলে, সেটা হ্যাপির বোঝার ব্যর্থতা হলে (এই কারণেও অবলা নারী বলছি) প্রতারিত হওয়ার দায়-দায়িত্বটাও কি হ্যাপির নয়? এটা তো ছেলেদের ক্ষেত্রেও ঘটে। মেয়েটা একসময় প্রেমের সম্পর্কের এক পর্যায়ে অন্য পুরুষের সাথে ঘর বাঁধে।

পৃথিবীর প্রতিটা সম্পর্কই তো জটিল। আমরা তো প্রাণের বন্ধুদের বুঝে উঠতে পারি না। সারাজীবন একই ছাদের নীচে থেকে নারী-পুরুষ একে অন্যকে কতটুকুই বা বোঝে? এই কারণেই কি জীবনের কোন এক সময়ে তালাকের মত ঘটনা ঘটছে না? হঠাৎ করে নারী-পুরুষ সম্পর্কে ঝাঁপ দিয়ে নেমে পড়ে, পরবর্তীতে তাকে ভুল বললে তার দায়-দায়িত্বটা কার? আমাদের নিজের, আমাদের বোঝা-পড়ার, আমাদের উপলব্ধির। এই দায় অন্যের উপর চাপিয়ে দিলেই হয় না। বিয়ে করার পর অনেক স্ত্রী বা স্বামী বুঝতে পারে, তারা ঠিক মানুষের সাথে ঘর বাঁধেননি, বিরাট ভুল করেছেন। তবে কি তাকেও প্রতারিত হওয়া বলবো? সেভাবে দেখলে, এক পক্ষের কাছে সব কিছুই প্রতারণা।

প্রতিটা সম্পর্ককে সময় দিতে হয়। একটা প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হতে হলে তাতেও সময় দিতে হয়। রুবেলের সাথে প্রেম করছে হ্যাপী, ভাল কথা। প্রেমে পড়া তো খারাপ কিছু নয়। কিন্তু তাড়াহুড়ো করে রুবেলের সাথে শয্যাশায়ী হওয়ার আগে, রুবেলকে ভালভাবে জানা-বোঝার দায়িত্বটা কার? রুবেল ক্রিকেট তারকা, এটাই তার সচ্চরিত্রের সার্টিফিকেট?

নিজের অপরিপক্কতারদায় অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়ার মানসিকতাকে আমার কাছে ছেলেমি (এখানে মেয়েলিপনা বললে নারীবাদীরা আপত্তি করবেন) ছাড়া আর কিছু মনে হয় না। আর অভিজ্ঞতা এবং পরিপক্কতা অর্জনে বাস্তব জীবনের সর্বত্রই আমাদের ঘাত-প্রতিঘাতের সম্মুখীন হতে হতে পরিপক্ক বা অভিজ্ঞ হয়ে উঠতে হয়। এটা নতুন কথা নয়, অতি পুরানো। প্রত্যেকটা মানুষই কোথাও না কোথাও দুর্বল।আর তার জন্য সঠিক গাইড না পেলে বড় মাশুল গুণতে হয়। হ্যাপি তার সাথে রুবেলের সম্পর্ক পরিবার থেকে গোপন করে নিজের মানসিক দুর্বলতার বড় মাশুল গুনেছেন।

যারা আজকে হ্যাপির পক্ষে কথা বলছেন, তারা যে নিজের অজান্তে হ্যাপিকে কত অসম্মান করছেন, একবার ভেবে দেখেছেন? হ্যাপি প্রতারিত হয়েছে, তার মানে তার বোধ-বুদ্ধি-বিবেচনা অবলা নারীর পর্যায়ে। এটা কি নির্মম পরিহাস, একজন অভিনেত্রীর মানসিক বিকাশ কত দুর্বল হলে সে এই ধরনের প্রতারণার মুখোমুখি হতে পারে! হ্যাপির জ্ঞান এবং শিক্ষা-দীক্ষাটাও মাইক্রোস্কোপ দিয়ে পর্যবেক্ষণের বিষয় হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। কোন অজপাড়া গাঁয়ের শিক্ষার আলো বঞ্চিত মেয়েদের মানসিক বিকাশও কি হ্যাপির পর্যায়ে? একটা প্রতিভাময়ী মেয়ে তার প্রেমের শক্তিতেই পুরুষকে জয় করবে, পুরুষের প্রেমকে যাচাই করবে সেটা আসল না নকল। পুরুষই উজাড় করা প্রেম নিয়ে তার কাছে আসবে। অথচ ঘটনা ঘটছে পুরো তার উল্টো।

কি শিখছি আমরা হিন্দি চলচ্চিত্র থেকে তবে? তার ভালটা নিচ্ছি কি? রাম-লীলাতে কি দেখলাম? রণবীর সিং আর দীপিকা পাডুকোন-এর সেয়ানে সেয়ানে বা সমানে সমানে লড়াই, প্রেমের লড়াই, প্রেমের প্রকাশ, প্রেমের দীপ্ত সুন্দর মুখচ্ছবি। যাতে আমরা ভেসে গেছি। এখানে তাদের প্রেম পরীক্ষা শুধু নয়, তার অগ্নি-পরীক্ষা! এবং পরিসমাপ্তিতে, দু’জন দু’জনকে খুন করতেও দ্বিধা করেনি। আর একজন উঠতি নায়িকা হয়ে হ্যাপি তার কিছুই কি শিখেনি? হুম, হ্যাপির সাক্ষাৎকারে যা শুনেছি, সেটা হলো, বিয়ে না হতেই হ্যাপির ‘পতি পরম ধন’ সুলভ মানসিকতা। বড়ই হাস্যকর। রুবেলের জন্য এক কথায় তার অভিনয়ের জগৎ ত্যাগ। রেডিও-তে তার দীর্ঘ কথোপকথন শুনে হ্যাপির জন্য খারাপ লাগার সাথে সাথে করুণারও উদয় হলো। আমরা আধুনিকতা এবং উত্তরাধুনিকতার কথা বলি, অথচ হ্যাপি ধরে রেখেছে, বস্তাপচা এক অতি প্রাচীন আদর্শ। কোথায় নারীবাদিতা বা সমান অধিকারের প্রশ্ন!

“রুবেল বিয়ে করলেই হ্যাপী তার মামলা তুলে নেবেন” এই প্রসঙ্গে আইরিন সুলতানা বলছেন, “… এ ধরনের আচরণ প্রকাশ অস্বাভাবিক কিছু নয়। কেবল হ্যাপী নয়, প্রেমে ব্যর্থ হওয়া অধিকাংশ তরুণ-তরুণীদের মধ্যে আকষ্মিক ইনসিকিউরিটি থেকে এরকম প্রগলভতা জন্ম নেওয়াটা মনোজাগতিকভাবে প্রত্যাশিত।” তবে কি বলবো, তার আগে বিয়েতে ব্যর্থ হয়ে হ্যাপির রুবেলের বিরুদ্ধে মামলাটাও প্রগলভতা থেকে উৎসারিত? যখন হ্যাপির কথা থেকে বোঝা যাচ্ছে, তিনি সচেতনভাবেই মামলাটি করেছেন, তবে মামলার পরবর্তী ‘বিয়ে করলে মামলা তুলে নেবেন’ এই কথাটা অসচেতনভাবে বলে ফেলছেন? পাঠক বুঝুন, যেখানে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে আইনজ্ঞের পরামর্শে জেনে-বুঝে মামলা করেছেন রুবেলের বিরুদ্ধে, সেখানে তারপর পরই হঠাৎ করে নিরাপত্তাহীনতায় আক্রান্ত হয়ে তিনি ওই কথা বলছেন? আর এই কারণেই আইরিনের লেখায় বার্ব কাইফের নিবন্ধ থেকে ইংরেজি উদ্ধৃতিটি [”Because the perpetrator was at one time trusted and loved, the survivor is likely to deal with bitter feelings of betrayal and broken trust, and may feel she cannot trust herself to decide which people are safe and which are not.”] যথার্থ বলতে পারছি না।

হ্যাপি-রুবেলের এই সম্পর্ক থেকে গুরুত্বপূর্ণ যে ব্যাপারটি বেরিয়ে আসছে, তাহলো এখনকার সময়ের তরুণদের সাইকী। এখনকার সময়ের তরুণী-যুবতীরা তাদের নিষ্করুণ সরলতাকে এত সহজভাবে আর বিসর্জন দেবে না, ধরে নিতে পারি। যদি বলি, হ্যাপির এই চরম সরলতা এবং নিজেকে রুবেলের কাছে সহজপ্রাপ্য করে তোলাটাই রুবেলের কাছে সুযোগ খুলে দিয়েছে। একজন যদি নিজেকে এত সহজে বিলিয়ে দিতে পারে, তবে অন্যজন তো ষোল আনা উপভোগ করবেই। কিন্তু এক পক্ষ আশা নিয়ে বসেছিল অগাধ, একতরফাভাবে। অন্যপক্ষ তাৎক্ষণিক উপভোগ, আনন্দতেই মশগুল থেকেছে। প্রেমিক-প্রবরের স্খলনের ঘটনা জানলেও সতী-সাধ্বী স্ত্রীর মতো মুখ বুজে শেষতক মেনে নিয়েছে হ্যাপি, যতক্ষণ না নিজের দোষে রুবেলের কাছ থেকে চরম অপমানিত হয়েছে। রুবেলের আইনতঃ কোন শাস্তি হলে, তবে একটা কারণেই শাস্তি পেতে পারে, যদি হ্যাপির উপর তার শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। বাংলাদেশে শারীরিক নির্যাতনের ব্যাপারে নারীর ভাষ্যটাই যথেষ্ট কী না, জানি না। এই ব্যাপারে দেশের আইনে নারীর অধিকার কতদূর সংরক্ষিত হয়েছে তাই বিবেচ্য।

যদিও আমি মানব ধর্মকে বিশ্বাস করি এবং গুরুত্ব দেই, তবুও মিডিয়ায় হ্যাপির হিজাব পরা সাজ দেখে মনে হলো, ইসলাম ধর্মের প্রতি এই অনুরক্ত ভাবটা বিয়ের আগে নারী-পুরুষের মেলামেশার সময় কোথায় ছিলো? বাংলাদেশের বিরাট মুসলিম অধ্যুষিত জনগণের কাছে তাই হ্যাপির গ্রহণযোগ্যতা কম হওয়ারই কথা। তাদের ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কাজটা অবশ্যই অনৈতিক। রুবেল তথা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড(বিসিবি)-এর নৈতিকতার প্রশ্ন যখন উঠে, পাশাপাশি এই বিষয়টিও হ্যাপির বিরুদ্ধে জনমত তৈরিতে সাহায্য করছে।

বিসিবি অবশ্যই ক্রিকেটের স্বার্থ দেখবে। অন্য দশজন মানুষের মত রুবেলের বিরুদ্ধে হ্যাপির মামলাটা কতটুকু কার্যকর তা বিসিবি-র বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবনা ঠিকই বোঝে। এমন ধরনের একটা মামলায় বিসিবির হাতে থাকা একজন প্রতিভাকে ক্রিকেট বিশ্বের সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতা থেকে বাদ দিয়ে রাখাটা যথেষ্ট বিবেচকের কাজ বলে মনে হয় না। আইনকে তার গতিতে চলতে দিয়েই রুবেলকে তার মত তার কাজ, খেলাটা খেলতে দিয়েও বিচার সম্ভব। বিচারে রুবেল দায়ী হলে, তবে বিসিবি-র তা মেনে চলার দায় আসে।

আমরা কি কল্পনা করতে পারি, বিবাহের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ করেছে বলে আনুশকা শর্মার মামলার কারণে ভারতের ক্রিকেট বোর্ড অধিনায়ক হয়ে উঠা ভিরাট কোহলি-কে বিশ্বকাপ স্কোয়াড থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছে? ভারতে সঞ্জয় দত্তও তার কৃতকর্মের ফল ভোগ করছে, কিন্তু তার আগে আমরা জনগণ তার অসাধারণ অভিনয় প্রতিভার স্বাদ পেয়ে গেছি। রুবেল যদি তার বিরুদ্ধে হ্যাপির করা মামলায় জয়ী হয়, তবে বিশ্বকাপে রুবেলকে তার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও শুধু মামলার কারণে খেলতে না দেয়াটা যেমন, বুদ্ধিমানের কাজ নয়, তেমন রুবেলের প্রতি এক প্রকারের ভীষণ অন্যায়।

লেখক: ব্লগার, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.