সাম্রাজ্যবাদী প্রভুকে এক নারী সৈনিকের সালাম: নারীর ক্ষমতায়নের মিথ

Shirinসায়দিয়া গুলরুখ: ঢাকার দুটো ব্লগ উইমেন চ্যাপ্টার ও ঠোঁটকাটায় ব্লগার নাসরিন সিরাজ ও শামীম সুলতানা লিমি ক্ষমতাধর নারীর পক্ষ-বিপক্ষ যাওয়া নিয়ে মজার তর্কে জড়িয়েছেন। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান বারাক ওবামা ভারতে এসেছিলেন। তাকে বিমানবন্দরে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা জানান উইং কমান্ডার পূজা ঠাকুর। তর্কের সূত্রপাত সেখানেই। রাষ্ট্রের পুরুষালী ক্ষমতার স্মারক হল সশস্ত্র বাহিনী, সেই বাহিনীর প্রথম সারিতে দাঁড়য়ে বিশ্বের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের প্রধানকে সম্মাননা দেয়ার সুযোগ প্রথমবারের মতন পেলেন যে নারী তাকে নিয়ে বিশ্বব্যাপী মিডিয়াতে তোলপাড়।Wall Street Journal -এ প্রকাশিত খবরের শিরোনাম, “Obama Visit to India Marked by Women Power.” Really? সত্যিই কি তাই? সাম্রাজ্যবাদী প্রভুকে প্রথম নারী হিসেবে সালাম দেয়ার মধ্যে দিয়ে পূজা নারী জাতির ঐতিহাসিক মহাপরাজয়ের আরেক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলেন বলেই তো মনে হয়। এঙ্গেলস তাঁর রাষ্ট্র ও পরিবারের উৎপত্তি বিষয়ক আলোচনায় ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও একক পরিবারের আর্বিভাবে নারী জাতির ঐতিহাসিক মহাপরাজয় দেখতে পেয়েছিলেন। তাদের আলোচনা ১৮৮৪সালে প্রকাশিত হয়েছিল। আমার মনে হয়, একবিংশ শতাব্দীতে ঐতিহাসিক মহাপরাজয় এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। নারীর “অর্জন”কে সংজ্ঞায়নের একটা প্রেসক্রিপশন দিচ্ছে ওবামা এ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা বিশ্বব্যাংক। এই প্রেসক্রিপশন অনুসারে এক্কেবারে সস্তাশ্রম হিসেবে অর্থনৈতিক কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ (যেমন, গার্মেণ্টস শ্রমিক) বা কতিপয় উচ্চবিত্ত নারীর ক্ষমতার আসনে জায়গা করে নেয়াকে (যেমন, ভারতের সামরিক বাহিনীর পুজা ঠাকুর) নারীর অর্জন হিসেবে বাজারজাত করা হচ্ছে। মুনাফা, সম্পত্তির ভাগ মোটাদাগে পুরুষের হাতে, কিন্তু প্রথাগত পিতৃতান্ত্রিক ঘরের সীমানা পেরিয়ে নারী এই মুনাফা তৈরির প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছে; আর সেটাকেই কৃতিত্ব হিসেবে চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। আমরাও পুজিবাদের শিকল পড়ে পিতৃতন্ত্রের শৃঙ্খল ভাঙ্গার এই মেয়েভুলানো গল্পকে আমরা ‘নারীর ক্ষমতায়ন’ হিসেবে মেনে নিতে শুরু করেছি। এ পরাজয় নয়তো কি?পূজা ঠাকুরের মার্কিন রাষ্ট্রপতিকে সম্মাননা দেয়ার সুযোগ নিয়ে ফেসবুক, ব্লগ আর অনলাইন নিউজের আলাপ-আলোচনা পড়তে গিয়ে আমার মনে হল, আজকাল নারীদের নানা গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদে নারীকে বা যেকোনও সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর প্রতিনিধিকে প্রথম বানানোটা পররাষ্ট্রনীতি, বা সাধারণভাবে ক্ষমতার রাজনীতিতে টিকে থাকার প্রতিষ্ঠিত কৌশল হয়ে উঠেছে। এই মুহূর্তে হিলারি ক্লিনটন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থীতার জন্য ডেমোক্রেট পার্টির একজন প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, পার্টির অনুমোদন পেলে, নির্বাচনে জিতলে তিনি হবেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম নারী রাষ্ট্রপতি, যেমনটি বারাক ওবামা হলেন প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি। প্রথম হওয়া ও বানানোর ইতিহাস এবং রাজনীতি আছে।

শামীম সুলতানার লিমি তার লেখাতে নারী দেশের প্রেসিডেন্ট হলে বা সেনা প্রধান হলে আনন্দিত হওয়ার কথা লিখেছেন। নারীর প্রথম হওয়ার খবরে আনন্দিত আমিও হয়েছি দু’একবার। নিশাতের এভারেস্ট বিজয়ে খুব খুশি হয়েছিলাম। মহাশ্বেতা দেবীর গল্পে যে নর্তকী ব্রিটিশ বিরোধী যুদ্ধে গিয়েছিল তার কথা প্রায়ই ভাবি, তিনিই কি প্রথম নর্তকী যে নুপুর খুলে, বা নুপুর পায়ে বন্দুক হাতে যুদ্ধে গিয়েছিলেন? কিন্তু কেবল জৈবিক নারী হওয়ার কারণে সকল নারীর সাথে আমি সংহতি বোধ করি না।

দুই বছর আগে, রাঙামাটি জেলার পুলিশ প্রশাসনের এসপি পদে প্রথমবারের মতন একজন নারী হিসেবে দায়িত্ব নেন আমেনা বেগম। আমরা যারা পার্বত্য চট্টগ্রামের নারী আন্দোলনের নেত্রী কল্পনা চাকমা অপহরণ মামলাটির খোঁজ-খবর নেই, আমরা আশাবাদী হই। কিন্তু বছর শেষে তিনি কল্পনার ভাইকে কান্ডজ্ঞানহীন ডেকে অভিযুক্ত সামরিক সদস্য লে. ফেরদৌসকে পরোক্ষ সমর্থন করে মন্তব্য করেন। এসপি আমেনা বেগমের বাঙালি জাত্যাভিমান (Bengali Chauvinism), ক্ষমতালিপ্সা ­– তার সাথে মিত্রতার সকল পথ রূদ্ধ করে দেয়। জাতীয় সংসদের প্রথম স্পিকার হিসেবে ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর দায়িত্ব নেয়ার খবর আমি আমলেও নেই নাই, আনন্দিত হওয়া তো দূরের কথা। কেবল জৈবিক নারী হওয়ার কারণে আওয়ামী লীগ চাটুকারের সাথে সংহতি বোধ করার কোনও কারণ তো দেখি না। নারী সংহতি ও সংগ্রামের মানচিত্র এত সহজে রচিত হয় না।

ছবিতে হাসি মুখ ওবামাকে দেখা যায় পূজা ঠাকুরের দুই কদম আগে লাল গালিচায়; আর আত্মবিশ্বাসী, গবির্ত পূজা ঠাকুর বারাক ওবামার দুই কদম পিছনে মার্চ-পাস্ট করছেন। লাল পাগড়ী মাথায় পুরুষ সৈনিকেরা এখানে পূজা ঠাকুরের সাফল্য-গাঁথার নাম-গল্পহীন চরিত্র মাত্র। ছবিটা দেখে আমার জানি না কেন, ফেলানীর কথা মনে পড়ল। গতকাল সীমান্তে ঢুকে বিএসএফ যে কৃষককে হত্যা করেছে তার কথা মনে পড়ল। ভারতের আভ্যন্তরীন সামরিক নীতি যখন কাশ্মিরে নারীর প্রতি সহিংসতার অনুমোদন করছে, আসাম-মিজোরাম-ত্রিপুরায় আদিবাসী নারীদের প্রতিও একই সামরিক দৃষ্ঠিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে, তখন পূজা ঠাকুরের ব্যক্তিগত সাফল্য রাষ্ট্রের পুরুষালি-সহিংস চেহারাকে আড়াল করে। এই গল্পে একজন নারীর সাফল্য হাজার নারী-পুরুষের অধস্তনতা ও বৈষম্যের বাস্তবতাকে গুরুত্বহীন, অপ্রাসঙ্গিক করে তোলে।

ওবামার পররাষ্ট্রনীতি আর হত্যাযজ্ঞের প্রসঙ্গ নাসরিন সিরাজ লিখেছেন। তাই নাসরিনের মতন আমিও প্রথম নারী কমান্ডারের এই সাফল্যে প্রথা ভাঙ্গার আওয়াজ পাই না। বরং অত্যাধুনিক শিকলহীন শিকল পরানোর ছলই দেখতে পাই।

(লেখাটি ঠোঁটকাটা ব্লগ থেকে নেয়া)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.