সোভিয়েত নারীর দেশে-২৫

Peter 5সুপ্রীতি ধর: সেদিনই ভাইবারে কথা হচ্ছিল সেন্ট পিটার্সবুর্গে থেকে যাওয়া পার্থদা’র (পার্থ সারথী সূত্রধর) সাথে। আমার কণ্ঠ শুনে এখনও অনেকের দিন ভাল কাটে, এটা জেনেই ভাল লাগলো। তারাও জানে না, একটু কথা বলে আমার মন কখন, কোথায় চলে যায়।

একটু আগেই কথা হয় কানাডায় থাকা লাজু ভাইয়ের সাথে। বুঝতে পারি, কথা বলতে গিয়ে তার মনও পিচ্ছিল হয়ে যাচ্ছে, ছাড়তে চায় না ফোন। তারপরও একসময় যবনিকা টানতে হয়। ফোনটা রেখেই ফোন করি পার্থদাকে। গাড়ি ড্রাইভ করছিল বলে লাইন কেটে কেটে যায়। তারপরও কথার লোভ ফোনটিকে ঠিকই আটকে রাখে কানের সাথে। কথায় কথায় রাজনীতির কথা আসে, রাশিয়ার পরিবর্তনের কথা আসে। কৌতূহল নিয়ে জানতে চাই সব সবকিছু।

সেন্ট পিটার্সবুর্গ শব্দটা আমাদের কাছে কেমন যেন সমুদ্রের অপর পাড়ের নাম, আমরা যারা সেইসময়ে বাস করে এসেছি, আমাদের কাছে তা লেনিনগ্রাদ। নামটা মনে এলেই তা দু’কান হয়ে হৃদয়ে ঢুকে যায় সাই করে। আর বেরই হয় না। মনের মধ্যে তখন হাজারো স্মৃতি ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়। আমি সেখানে মুক্ত-স্বাধীন এক বিহঙ্গের মতো ঘুরে বেড়াই, নেভস্কি প্রসপেক্ট হয়ে, হেরমিটেজ পার হয়ে আমার ইউনিভার্সিটি, ভাসিলিয়েভস্কি অস্ত্রোভ, ১২ নম্বর ট্রলিবাসে করে ঠিক চলে আসি ফিন উপসাগরের পাড়টিতে, যেখানে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে আমার ১৯ তলা  হোস্টেলটি। পাশাপাশি টি আকৃতির তিনটি ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেল ছিল আমাদের সময়ে। এখন নাকি সেখানে দোকানপাট হয়েছে, চাইনিজ শিক্ষার্থীতে ভরে আছে।

গুগল ম্যাপে করে ঘুরে আসি হোস্টেলটি থেকে, চিনতে পারি না। কত স্মৃতি, কত কষ্ট-আনন্দ এই হোস্টেলটিকে ঘিরে।  মন খারাপ হলেই যখন-তখন ছুটে যেতাম সমুদ্রের পাড়ে, পাথরের ওপর বসে নির্লিপ্ত এক মরা সমুদ্র দেখতাম, শীতের দেশে সমুদ্রের সেই তেজ থাকে না। তবুও সমুদ্র, তবুও অথৈ জলরাশি আমার কষ্ট ভাগ করে নিতো। আমার মাকে না দেখতে পাওয়া নিমিষেই ভুলিয়ে দিত। আমি মাছ ধরা দেখতাম শীতের জমাট বাঁধা সমুদ্রে। সেই মাছ কিনে এনে  কেটে-কুটে ভেজে খাওয়ার আনন্দই ছিল আলাদা।

এখনও চোখ বন্ধ করে আমি তানিয়া, ভেসেলকা, আলিনা, কাশকা, বিয়াতা, জেনিয়াদের দেখতে পাই। দেখতে পাই আরমেনিয়ান এক বন্ধু গ্রিগরিয়ানকে, আমরা ডাকতাম গ্রিশা বলে। একটু অন্যমনস্ক ছেলে ছিল। হয়তো আমার প্রেমে পড়েছিল সে, প্রায়ই গিটারটা হাতে ঝুলিয়ে এসে গান শুনিয়ে যেত। আর সাহিত্যে তার পাণ্ডিত্য দেখে আমিও মুগ্ধ ছিলাম তার প্রতি। কিন্তু আমাকে দেখলেই তার দৌড়ে এসে আমার হাতে চুমু খাওয়া আমার উপমহাদেশিয় মন মেনে নিতে পারেনি বলে বন্ধুত্বও টেকেনি। একটি প্রেমের ইতি হয় এভাবেই। কিছুদিন পরই দেখেছি এক রুশীকে তার বগলদাবা হয়ে ঘুরে বেড়াতে, আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচি।

পার্থদা আমাকে জানায়, নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়া রাশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি। জিনিসপত্রের টানাটানি থাকলেও মানুষজন ঠিকই খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। মনে মনে বলি, রুশিরা হচ্ছে চরম সহিষ্ণু এক জাতি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় টানা তিনবছর অবরুদ্ধ ছিল লেনিনগ্রাদ। মাইনাস ৪০ এ কোন বিদ্যুৎ ছিল না, হিটিং সিস্টেম ছিল না, পানি দিত মেপে মেপে, দিনে ২৫০ গ্রাম খাবার জুটতো। অনেক মানুষ মারা গিয়েছিল সেইসময়। কিন্তু যারা বেঁচেছিল তারা যে শক্তি নিয়ে নতুন জীবন পেয়েছিল, তা দিয়ে আরও কয়েকশ বছর বেঁচে যাবে এই জাতি, আমি নিশ্চিত। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কঠিন, লৌহ মানব। সাবেক কেজিবি সদস্য কোন ধাতু দিয়ে তৈরি আমি জানি না। তবে ইউরোপ যে  এক রাশিয়াকে সামাল দিতেই হিমশিম খাচ্ছে, তাতো চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি।

রাশিয়ার রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে বলতেই পার্থদা বলে, ‘লিপি, আমরা হয়তো আবার আগের সোভিয়েত অবস্থায় ফেরত যাচ্ছি’। আমি জোরে হেসে উঠে বলি, সাবাশ, এটাই তো চাই। কিন্তু মনে মনে জানি, এটা আর সম্ভব নয়। যে ক্ষত তৈরি হয়ে গেছে চাঁদের গায়ে তা আর কোন ডিটারজেন্টেই পরিস্কার হবার নয়।

যে সোভিয়েত রাশিয়াকে ফেলে এসেছিলাম, আমি জানি, এখন গেলে তাকে আমি কোথাও খুঁজে পাবো না, তারপরও চাই দেশটি দাঁড়িয়ে থাকুক স্বমহিমায়, স্বশক্তিতে। কোন অপশক্তি যেন একে টলাতে না পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে করতে ক্লান্ত। তারাই এখন পথ খুঁজছে রাশিয়াকে আর কিভাবে পরাস্ত করা যায় ভেবে। পাচ্ছে না। ইউক্রেনকে নিয়ে যে খেলা খেলছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, এটা যে শুধুমাত্র রাশিয়াকে শায়েস্তা করার জন্যই, তা বুঝতে আর বাকি নেই। ইউক্রেন না বুঝেই নিজের ঘরের ভাইয়ের বিরুদ্ধে খেলায় মাঠে নেমেছে, এখন ফেরার পথও বন্ধ, সামনেও যেতে পারছে না। জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল এই দেশ থেকে ওই দেশে কেবলই দৌড়ে বেড়াচ্ছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করতে। গতকালও তিনি হাঙ্গেরিতে গেছেন, যে হাঙ্গেরি রাশিয়ায় নিষেধাজ্ঞার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে, তাকে নিজেদের পথে টানতেই মেরকেলরা আজ ঘর্মাক্ত হয়ে পড়ছেন। এদিকে তাদের নিজেদের ঘরেও এখন অশনিসংকেত। গ্রিসে বামপন্থী দলের বিজয়, স্পেনে বামপন্থী দলের জোর অবস্থান, মেরকেল-ক্যামেরনদের ঘুম হারাম করে দিয়েছে।

এসব খবরে মনের গহীনে শান্তি আসে। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে, এটা শুধু পুঁথিতেই পড়িনি, মনে-প্রাণে বিশ্বাসও করি। তাই বিশ্বাস করি, এই পৃথিবী আবার ভারসাম্য ফিরে পাবে। একচোখা নীতির অবসান ঘটবে। মধ্যপ্রাচ্যসহ কোনো দেশ ধ্বংস করার আগে সাতবার ভাববে পশ্চিমারা। নিজেদের প্রয়োজনে তৈরি তালেবান, আল-কায়েদা আর এখনকার আইসিস এর  কাছে নিজেরাই ধরা খাবে।

আবার হাসবে আমার সোভিয়েত ইউনিয়ন। সেই লেনিনগ্রাদ, যেখানে আমি ফেলে এসেছি আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়টুকু, যেখানে আমার শিক্ষা-রুচি-সংস্কৃতি বিকশিত হয়েছে। যে কারণে এখনও আমি মানুষ, এখনও আমার বিবেক বন্ধক দেইনি কোথাও, সেই সাংস্কৃতিক বিপ্লবের স্বপ্ন দেখি বাংলাদেশ থেকে শুরু করে সুদূর রাশিয়া ছাড়িয়ে ইউরোপ, লাতিন আমেরিকায়। (চলবে)

শেয়ার করুন:
  • 45
  •  
  •  
  •  
  •  
    45
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.