আমরা যারা একলা থাকি-৪১

Women Riseলুতফুননাহার লতা: আজ, এখন ২০১৩’র জুন মাসের ঢিলেঢালা উষ্ণ বিকেল বেলা । বিকেল ৪টা’র মত হবে। আমার ছেলেটা আজ দুদিন ধরে ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত ! আজ তার অবস্থা খুবই খারাপ। হু হু করে জ্বর বেড়ে চলেছে। হঠাত আমাকে ডেকে বলছে ‘ মা আমি আর পারছি না আমাকে হাসপাতালে নাও , শিগগির কর ।’

তাকে নিয়ে হাসপাতাল ইমার্জেন্সিতে যাব বলে দ্রুত রেডী হচ্ছি আর মনে মনে ভাবছি, হাসপাতালে গেলেও ডাক্তার ও চিকিৎসা পর্যন্ত পৌঁছাতে অনেক সময় লাগবে, জ্বরে বেহুস থাকায় আজ দু দিন ধরে সে কিছুই খাচ্ছে না। তাকে একটু কিছু না খাইয়ে কেমন করে যাই ! তাড়াহুড়া করে ফ্রিজার থেকে চিকেন বের করে একটা স্যুপ তৈরী করছি ! চুলার উপরে স্যুপের ডেকচি রেডি। কাচের বাটিতে ঢেলে নিয়ে ঝড়ের গতিতে যেই না পা বাড়িয়েছি, অমনি চিকেন কাটার জন্য মেঝেতে পাতা বটিতে সাই করে দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল ডান পায়ের কনে আঙ্গুল ।

চোখের নিমেষে এতো রক্ত! রক্তের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে সারা কিচেন ফ্লোর! কিছুতেই সামলাতে পারছি না। হঠাৎ কেমন একা হয়ে গেলাম !

ছেলে ওঘরে কাৎরাচ্ছে। আমি কিচেনে পা কেটে স্তব্ধ বোবা শূন্যতায়। মেঝেতে বসে শক্ত হাতে পা চেপে ধরে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করছি। আমার চারিদিক জুড়ে রক্ত ! ডান হাতের আঙুলের ফাঁক দিয়ে ঝপ ঝপ করে রক্ত পড়ছে। আমার মাথা ঝিম ঝিম করছে। হাত সরিয়ে উঠেও দাঁড়াতে পারছি না। কিছু একটা দিয়ে বাঁধা দরকার, হাতের কাছে কিছুই নেই । হামাগুড়ি দিয়ে কিচেন ছেড়ে ক্লজেটের কাছে এসে হাতাহাতি করে একটা ওড়না পেলাম। সেটা ছিঁড়ে টাইট করে বেঁধে উঠে দাঁড়ালাম। ফোন হাতে ট্যাক্সি ডেকেছি, পিছনে তাকিয়ে দেখছি আমার সারা ঘরের মেঝেতে আতঙ্কিত হবার মত দৃশ্য।

কোন মতে ট্যাক্সি ডেকে ছেলেকে নিয়ে আমার ডাক্তারের অফিসে যখন গেলাম তখন বাজে প্রায় ছ’টা। ট্যাক্সি থেকে নামার সময় দেখি পা রাখার জায়গাটা ছোপ ছোপ রক্তে ভরে উঠেছে। টাকা মিটিয়ে দিয়ে মেডিকেল সেন্টারে যখন ঢুক্লাম তখন কেবল মাত্র জরুরী বিভাগ খোলা।আমার ডাক্তার চলে গেছে । নার্স এসে পায়ের কাটার গভীরতা দেখে, সেলাই করতে হবে বলে সাথে সাথে এম্বুলেন্স ডেকে আমাকে পাঠালেন ফরেস্ট হিলস নর্থশোর ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে। ছেলে রইল এল্মহার্স্টের ডাক্তারের অফিসে ! সে জ্বরে কাতর, দাঁড়াতেও পারছে না।

প্রচণ্ড রক্তক্ষরণে আমারো মাথা ঠিক মত কাজ করছে না। তাকে ওখানে রেখেই আমি চলে গেলাম। ভুলে সে ঘরের চাবি নেয় নি সাথে । তার হাতে টাকা দিয়ে আসতেও ভুলে গেলাম। সে ক্লান্ত , ক্ষুধার্ত, জ্বরে বেহুশ বসে রইল ডাক্তারের আশায়।

ওদিকে আমি নর্থশোর হাসপাতালের এমার্জেন্সিতে বসে আছি। মনে হচ্ছে অনন্তকাল ধরে এই বসে থাকা। ইস্যুরেন্স রেকর্ড নিয়ে, ওজন, ব্লাড প্রেশার, জ্বর-টর চেক করে বসিয়ে রেখেছে। আরো কিছুক্ষণ পরে ডাক পড়ল ডাক্তারের রুমে। ভালো করে সব দেখে টেখে দু’জন মহিলা ডাক্তার মিলে সেলাই করার প্রস্তুতি নিচ্ছে ! শুয়ে আছি টেবিলের প’রে।

হঠাৎ কানের কাছে ছেলের ফোন বেজে উঠল। সে চিৎকার করে কান্না শুরু করলো ! ডাক্তার তাকে দেখে ওষুধ লিখে দিয়েছে কিন্তু তার ১০৪ ডিগ্রি জ্বর ! তার কাছে চাবি নেই । বাসায় যাবার মত ট্যাক্সি বা ট্রেন ফেয়ার নেই। সে দাঁড়াতে পারছে না সোজা হয়ে, তার মাথা ঘুরছে। সে কেমন করে বাসায় যাবে !

আর্তনাদ করে কাঁদছে আমার সিদ্ধার্থ ।

‘ওরে আম্মুরে কেন তুমি আমারে আনলা’ আমি এইখানেই মরে যাচ্ছি রে ! আমার কাছে টাকা নেই । ঘরের চাবি নেই । আমি মরে যাচ্ছি রে আম্মু! আমি বাসায় যেতে চাই , আমার ওষুধ লাগবে না !’

এদিকে আমার সামনে সিরিঞ্জ হাতে নিয়ে টিটেনাস ইঞ্জেকশন রেডি করছেন ডাক্তার। অ্যান্টিসেপ্টিক তুলা দিয়ে জায়গাটা মুছে নেয়া হয়েছে। ইঞ্জেকশান এগিয়ে আসছে! আমি ধড় ফড় করে উঠে বসে ডাক্তারকে বললাম আমার এমার্জেন্সির কথা। বলতে বলতেই রক্ত জমাট পা টানতে টানতে ছুটে রাস্তায় বেরিয়ে এলাম! যে ট্যাক্সি দেখি ছুটে গিয়ে তাতেই উঠতে গিয়ে দেখি প্যাসেঞ্জার বসা। আবার একটা দেখে অন্যদিকে পা টেনে টেনে দৌড়াই।

শেষমেশ খালি ট্যাক্সি পেয়ে সেটা নিয়ে গিয়ে ছেলেকে তুললাম। বাসায় ফেরার পথে রাইট এইড থেকে ওষুধ কিনে নিয়ে বাসায় গিয়ে সেই স্যুপ তাকে খাইয়ে ওষুধ দিয়ে, হাতের কাছে পানির বোতল আর ফোন গুছিয়ে দিয়ে আবার ফিরলাম সেই ডাক্তারের সামনে !

প্রায় আধা ঘন্টা প্রস্তুতি আর আধা ঘন্টা সেলাই বাকী সময় ধাপে ধাপে অপেক্ষা ! রাত প্রায় বারোটা। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সি থামিয়ে ওয়ালগ্রিন থেকে ব্যথার ওষুধ আর এন্টিবায়োটিক নিয়ে এই মাত্র ঘরে ফিরলাম ! এখন পায়ের এনেস্থেসিয়া কেটে যাচ্ছে ! আর শুরু হচ্ছে যন্ত্রণা !

সাভারের ভেঙ্গে পড়া গার্মেন্টস শ্রমিকদের কথা ভেবে আমার এই পুরোজার্নি টা সহজ হয়ে এলো ! সেই সব নারীর জীবনের যুদ্ধ আর বেঁচে থাকার প্রবল আকুতি আমাকে উদ্দীপ্ত করল ! আমি শত ঝড় ঝঞ্ঝার ভেতরেও অনুভব করলাম, জীবনই মোক্ষম ! জীবনই আসল। জীবনই সকল সৃষ্টির উৎসব ! মৃত্যুই হল জীবনের সমূহ ক্ষতি। মৃত্যু নয়। জীবনের জয়গান হোক।

 

শেয়ার করুন:
  • 377
  •  
  •  
  •  
  •  
    377
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.