আমার সকল গান- ৩

Women in Mediaশারমিন শামস্: একটা কাজে সেদিন যেতে হয়েছিল এক অফিসে। ভদ্রলোক আমাদের পরিচিত একজনের বন্ধু। উচ্চ শিক্ষিত,স্মার্ট্, গড়গড় করে ইংরজি বলছেন। বোঝাই যায়, ভাল পরিবারের ছেলে। নিজের অফিস সাজিয়ে গুছিয়ে বসে আছেন। বয়সও বেশি না। ৩৪/৩৫ হবে। তার অফিসের টেবিলে সাজানো ফ্রেমে সুন্দরী স্ত্রী আর বাচ্চার ছবি। আমার সঙ্গে আমার স্বামী আর আমাদের এক ছোটবেলার বন্ধু।
তো, এ কথা সেকথা কাজের কথার পর ভদ্রলোক বললেন, ‘ওহ এখনো তো জানাই হল না আপনারা কে কী করেন।’ বলেই চাইলেন আমার স্বামীর দিকে। আমার হাজব্যান্ড বলার পরেই তিনি তাকালেন আমার বন্ধুটির দিকে। তখন আমার সেই বন্ধুও জানালো তার পেশাগত তথ্য। এরপর ভদ্রলোক আবার তার কাজের কথায় ফিরে গেলেন। আমাকে জিজ্ঞেসও করলেন না আমি কিছু করি কিনা, বলার সুযোগও দিলেন না। যাই হোক, কাজের আলাপ শেষ হলে আমরা চলে আসবো, তখন তিনি নিজের কার্ড বিতরণ শুরু করলেন। একটা দিলেন আমার স্বামীকে, আরেকটি দিলেন আমার সেই ছেলে বন্ধুটিকে। আমাকে কোন কার্ড অফার করলেন না। এই পুরো ব্যাপারটা আমি ছাড়া আর কেউ খেয়াল করেনি। এটা যে একটা ঘটনা এটাই কারো মনে হয়নি।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, আমার কাছে এটি একটি ঘটনা, যাতে আমি বিরক্ত হয়েছি। 
এই সমাজ নারীর নারীসত্ত্বার বাইরে আর কোন পরিচয় আছে, এই ব্যাপারটিতে এখনও অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি, এই ২০১৫ সালেও। এখন্ও ছেলেমেয়ে কয়জন? কে কী করে- এমন আলাপ উঠলে বাবা মায়েরা বলে, ‘আমার দুটি ছেলে। একটি ব্যাংকে, অন্যটি এনজিওতে কাজ করে। আর একটাই মেয়ে, তাকে বিয়ে দিয়ে দিয়েছি।’ কিংবা কারো বড়সড় কন্যা আছে জানলে আমরা তাকে জিজ্ঞেস করি, ‘মেয়ের বিয়ে হয়েছে?’ এই হল একবিংশ শতাব্দির বাংলাদেশের একটি সাধারণ পরিস্থিতি, আমরা কেউই এর বাইরে নই।
যে ভদ্রলোক আমার সঙ্গে এই আচরণ করেছেন, তার প্রতি আমার সীমাহীন করুণা। কারণ এই চরম আধুনিক যুগে তিনি আজো সচল হয়ে উঠতে পারেননি। তিনি অচল একজন মানুষ এবং মানসিকভাবে পঙ্গু। এরকম পঙ্গু ঘরে ঘরে আছে। এরা কোন কাজে কোন বড় অফিসে গিয়ে সেখানে উচ্চপদে কোন নারীকে দেখলে চিন্তিত হয়ে যায়। এরা ঘরে বউ বড় পদে ভাল অবস্থানে কাজ করলে হীনমন্যতায় ভোগে, মেয়ে সহকর্মীর পদোন্নতি হলে কুৎসা রটায়। কিন্তু আপনি এদের দেখলে চিনবেন না। এরা যখন যেমন তেমন করে নিজেকে উপস্থাপন করতে পটু। এরা মেয়েদের এগিয়ে যাওয়া চায় কি চায় না, তা এদের দেখলে, মিশলে কোনভাবেই আপনি উদ্ধার করতে পারবেন না। কিন্তু এরা ভিতরে ভিতরে চূড়ান্ত রকম পুরুষতান্ত্রিক। সুন্দর চেহারা, ভাল ব্যবহারের আড়ালে এরা নিজেদের এই বৈশিষ্ট্য সযতনে লুকিয়ে রাখে।
আগে আমি খুব বিরক্ত হতাম, কোন পুরুষ ঠিকমত আমার চোখের দিকে চেয়ে কথা বলতে না পারলে। এখন তাদের এই ব্যর্থতার কারণ আমি বুঝি। আমাকে প্রথমত এবং শুধুমাত্র ‘নারী’ হিসেবে চিন্তা করেই শুরু হয় তাদের আলাপ পরিচয়। কথাবার্তার শেষ মূহূর্ত পর্যন্ত তার মাথায় এই বিষয়টিই খেলা করে অবিরাম, ‘যার সাথে কথা বলছি, তার একটি নারী শরীর আছে। তার হাত-পা-মাথা-মুখ থাকলেও সে আসলে নারী, তার স্তন আছে, পশ্চাৎদেশ আছে। সে শারীরিকভাবে একটি আকর্ষণীয় জিনিস।’
এরকম ক্রমাগত ভাবনার মধ্যে থাকতে গিয়ে পুরুষটি ভুলে যায়, সে আসলে সহজ আচরণ করতে পারছে না, সহজভাবে চাইছে না। ফলে সে যে আপাদমস্তক একটা বেকুবে পরিণত হচ্ছে, সেটাই বেচারা পুরুষটির মাথায় থাকে না। আমি এদের করুণা করি।
নারীকে নারী বলে দমন করে, ছোট করে, করুণা করে, অবজ্ঞা করে, অবহেলা করে নিজেদের পৌরুষ জাহির করতে চায় যারা, তারা আর যাই হোক নারীর শ্রদ্ধা ও সম্মানের মানুষ হয় না কখনো। নিজেদের তৈরি অন্ধকূপে খাবি খেতে খেতে সেইসব পুরুষ বারবার ঘুরপাক খায় একই জলে, একই কাদায় গড়াগড়ি দেয়।
এদেরকে পুরুষই বা বলি কীভাবে? মানুষই বা বলি কেন?
শারমিন শামস্
লেখক- সাংবাদিক
শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.