শিরদাঁড়ায় বিবেকের চাপ

Road Accidentরওশন আরা বেগম: দুটি লাশ আমার কাঁধে। এদের নিয়ে আমার ঘুম হয় না। মাথার ভিতরে শুনতে পাই তাদের যন্ত্রণাময় কান্না। সারা রাত আমি এই আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া লাশ দুটি মনের গভীরে বহন করে মিথ্যা ঘুমের অভিনয় করে যাচ্ছি। বাচ্চা ও মা জড়াজড়ি করে ধরে আছে, মা বাচ্চাকে আগুনের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য নিজের শরীরটি দিয়ে আগলিয়ে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে দুজনেই এক সাথে পুড়ে কয়লা হয়ে কালো পাথরের এই মুর্তিতে পরিণত হয়ে আছে। এই কালো মুর্তি দুটি আমার বিবেকের সাথে মিশে আমার শান্ত ঘুমকে কেড়ে নিয়ে আমাকে করে তুলেছে অশান্ত। তাই সারা রাত আমি ঐ লাশ দুটিকে সঙ্গে নিয়ে মিথ্যা ঘুমের আবরণে আচ্ছন্ন ছিলাম। তাই সেই ঘুম আমাকে নিয়ে যায় অমিমাংসিত আরো কিছু লাশের সংস্পর্শে, যা আমার অস্তিত্বের সাথে মিশে আমাকে আরো ক্লান্ত করে তোলে, আমাকে অপ্রকৃতিস্থ্য করে তোলে তাই হয়তো কোন এক নতুন যাত্রার সন্ধানে ছুটে চলছি।

আমি লাশ দুটি কাঁধে নিয়ে দৌড়াচ্ছি কোন এক গন্তব্যহীন যাত্রায়। এই যাত্রার মধ্যে দেখতে পেলাম আরো কিছু দুর্লভ অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনার সমাপ্তি। এইগুলো আমার অস্তিত্বকে জানান দিয়ে গেল যে আমারও রক্ষা নেই। তাই আমি পালাতে চাই। দৌড়াতে দৌড়াতে হাজির হই কোন এক ডোবার কাছে। অযত্নে এই ডোবার পানি স্যাঁতস্যাঁতে কালো হয়ে গেছে। নিশ্চয় কোন মানুষের পদচিহ্ন এখানে পড়েনি। তাই অশান্ত মন কিছুটা শান্ত হলো নিরাপত্তা বোধে। কিন্তু খুব বেশী সময় স্থায়ী হতে পারলো না। হঠাৎ করে চোখে পড়লো গোলাকৃতি সাদা কিছু  কালো পচা পানির মধ্যে চক চক করছে। একটা কাঠি দিয়ে নাড়িয়ে চাড়িয়ে অবশেষে বিস্মিত চোখে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলাম। আমি সোজা আর হতে পারলাম না। আমার মেরুদন্ডের উপর আরো একটা ভারি পাথরের মত ভারি কিছু চাপা দিয়ে মনটাকে আরো চুপসে দিয়ে গেল। এই ভার আমি কিভাবে বহন করবো তা আমি জানি না। এতো আমারই মাথা। অনেক আগে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এই মাথায় কি কষ্ট না লেগে আছে, শরীরের বাকী অংশগুলো খুঁজতে থাকলাম তন্ন তন্ন করে, পেলাম না।

অবশেষে সেই মাথাটি পরিস্কার করে বুকের কাছে নিয়ে হারিয়ে যাওয়া বোনটির কষ্ট অনুভব করলাম এবং তাকেও সঙ্গে নিয়ে আবারও শুরু করলাম গন্তব্যহীন যাত্রায়। হাঁটতে হাঁটতে দেখতে পেলাম কোথাও আর কোন জনমানুষের চিহ্ন নেই। যে জন মানুষের চিহ্নই মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার পিছনে হুমকী হয়ে দাড়িয়েছে সেই জন মানুষের চিহ্ন মন থেকে মুছে গভীর কোন বনে আশ্রয় চাই। এই গভীর জঙ্গলে থাকা কোন প্রানী তার সহগোত্রীকে এই ভাবে আগুনে পুড়িয়ে মারে না। তাই তাদের মধ্যেও একটা স্বজাতিত্ব বোধ রয়েছে। হাটতে হাটতে অবশেষে আমি পেয়ে গেলাম আমার সেই কাংখিত প্রকৃতি যেখানে নেই কোন ক্ষমতার রাজনীতি। বড় একটা গাছের নীচে বসে জিরাতে লাগলাম। দেখতে পেলাম বৈচিত্র্যময় প্রাণীর সমবেশ, নানা ধরনের পাখির গানে চারিদিকে এক মুগ্ধ বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে। মানুষের মত হিংস্র কোন প্রানীর দেখা পেলাম না।

হঠাত করে মনে পড়ে গেল আমার সেই সহ যাত্রীদের কথা যা আমার মাথার ভিতরে সেটে আছে যন্ত্রনাময় পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া জড়াজড়ি করে থাকা বাচ্চা ও মায়ের কষ্টকর ব্যথা। তা আমি কিছুতেই ভুলতে পারছি না। সঙ্গে আছে আরেকটি প্রমান শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এই মাথা। কেন এই ভাবে মারা হচ্ছে? ক্ষমতার দ্বন্ধ, বিশ্বাসের ভিন্নতা, না আরো কোন জটিল কারন? সাদা চোখে এই সব জটিলতার কিছু আমার চোখে ধরা পড়ে না। আমি বুঝি স্বজাতিদের হত্যা করা হচ্ছে যা কোন প্রানীকূল করতে পারে না। যে চোখে তারা নিজের নব্য সাম্রাজ্যবাদের গন্ধ লুকিয়ে রেখে অন্য সভ্য সমাজে তার গন্ধ খুজে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে চলছে। সেই চোখেই তারা স্বজাতির হত্যায় মেতে উঠে। আমি কাউকে আজ বিশ্বাস করতে পারছি না। যে বিশ্বাসের গোড়ায় এক কুড়ালের আঘাত পড়েছে সেই আঘাত কোন কিছুতেই শুকাবে না। কোন এন্টিবায়টিকের ডোজই এই কাজে লাগবে না। সেই আঘাতের ঘা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে, তাই মানুষকে পালাতে হচ্ছে আমারই মত কোন এক গন্তব্যহীন যাত্রায়। সঙ্গে নিয়ে চলছে প্রানহীন মানুষের কিছু স্বাক্ষর, কষ্টকর এক তীব্র ব্যথা। এই মাথাটি হয় তো হারিয়ে যাওয়া আমার সেই বোনেটির যাকে হারিয়ে ছিলাম প্রায় এক বছর আগে। কেন তাকে এই ভাবে মারা হলো? শরীরের বাকি অংশ গুলো তন্ন তন্ন করে খুজেছি সেই ডোবায়। পায় নি আর কোন চিহ্ন।

এক সময় সীমান্তহীন দেশের স্বপ্ন দেখতাম। অর্থাত পৃথিবীর সকল মানুষের চলা ফেরার স্বাধীনতা থাকবে। সীমানা দিয়ে তাকে বন্ধ করা কি অমানবিক না কাজ। আজও সেই স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল। আজ কাল এই নিয়ে তেমন আর ভাবাও হয় না। কারন বাঁচার সংগ্রামে আজ মরিয়া হয়ে উঠেছি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সীমানা দিয়ে মানুষ গুলোকে বেধে ফেলা হয়েছে। তাই এই পৃথিবীর উপর তার চলা ফেরার কোন স্বাধীনতা নেই। এই বাধনে আমিও বন্দী। তাই গন্তব্যহীন যাত্রার কথা ভাবলেও আসলে তা নয়, এক সময় থামাতে হবে। তা না হলে সীমান্ত প্রহরীর গুলিতে প্রান দিতে হবে। কোথায় সেই সীমান্ত প্রহরীর সীমানা এই ভেবে আমাকে বেশ সাবধানে চলতে হচ্ছে। এই জঙ্গল পার হলেই হয় তো বিপদের সম্ভবনা হতে পারে। তাই থামতে হলো। এই জায়গায় আমি বাঁচতে পারবো এই আশায় বুক বেধে জীবনের রসদ সংগ্রহের জন্য চারিদিকে তাকিয়ে কিছু কাজের পরিকল্পনা করে সামনের দিকে পা বাড়ালাম। আরে এ কি দেখছি!! ঠিক আমার মত অসহায় নারী, শিশু, বৃদ্ধ, অপ্রকৃতিস্থ্ সবাই বাঁচার তাগিদে ছুটে পালিয়ে আসছে এই গভীর জঙ্গলে।

ঐ ভদ্র রাষ্ট্রের আর কোন চাহিদা নেই। চাহিদা আছে ঐ সব তথা কথিত মানুষদের কাছে যারা রাষ্ট্র নিয়ে পুঁজি কামাইয়ের ব্যবসায় মেতে উঠেছে, যুদ্ধ অপরাধীর বিচারকে সামনে ঝুলিয়ে রেখে ক্ষমতা দখল করে, হরতালের নামে পেট্রোল বোমায় মানুষ খুন করে। ক্ষমতার জন্য এরা সব কিছু করছে। তাই ঐ তথাকথিত রাষ্ট্রের থেকে মানুষ পালিয়ে বাচছে। হঠাত করে আগুনে পুড়ার যন্ত্রনা বুকে চেপে বসলো। আমি চিৎকার করে উঠলাম, বাচায় আমাকে। সবাই ছুটে এলো সেই আগুন নিভাতে কিন্তু কোথাও কেহ আগুন দেখতে পেলো না। তখন তারা বুঝতে পারলো এই আগুন কোথাকার আগুন।

আমাকে সবাই সান্তনা দিল এখানে কেউ কাউকে আগুনে পুড়িয়ে মারে না। এটাই আমাদের নিরাপদ জায়গা। অসভ্য বর্বর ঐ রাষ্ট্রের থেকে আমরা অনেক দূরে সরে এসেছি। এখনে আমাদের কোন নেতানেত্রী নেই, কোন রাজনীতি নেই, তাই আমরা মুক্ত স্বাধীন। এই সময় হঠাত আমার এলাম বেজে উঠলো। জেগে দেখি আমিতো বিছানায়। খুঁজতে থাকি আমার সেই প্রাণহীন সঙ্গী দুটি।

ভাবতে থাকি কোথায় আমার সেই নিরাপদ জায়গা? আজ থেকে অনেক দিন আগেই আমি সীমানা অতিক্রম করে এই সভ্য দেশে এসে পৌঁছিয়েছি এখনে আমার কোন ভয় নেই, কিন্তু রেখে এসেছি আমার স্বজনদের ঐ বিপদ সংকুল জনপদে। যারা আগুনে পুড়ে মারা পরছে প্রতিদিন। তাদের জন্য আমরা কিছুই করতে পারছি না। দূরে থেকেও তাদের যন্ত্রনাগুলো নিজের কাঁধে চেপে বসেছে। আমরা যতোই দূরে থাকি না কেন সবাই আমরা এর ভুক্তভোগি।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.