চে, তোমায় হাজারো স্যালুট

cheমিজান (উইমেন চ্যাপ্টার): ১৪ জুন, বিশ্বজুড়ে বিপ্লবীদের আদর্শ, কিউবান বিপ্লবের মহানায়ক, সমাজতান্ত্রিক পৃথিবীর অন্যতম স্বাপ্নিক চে’র ৮৫ তম জন্মদিন। চে’র মৃত্যু নেই, চে আছেন, চে থাকবেন, বিপ্লব যতদিন থাকবে ততদিন, শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াই যতদিন থাকবে ততদিন। মহান এই বিপ্লবীর শুভ জন্মদিনে তাই ‘লাল সালাম’।

চে গুয়েভারা, পুরো নাম আরনেস্তো চে’ গুয়েভারা, একটি আদর্শের জন্য উৎসর্গীকৃত জীবন। চে’র জন্ম ১৯২৮ সালের ১৪ই জুন, আর্জেন্টিনার রোজারিওতে। স্বচ্ছল পরিবারের সন্তান হয়েও সাধারণ জীবন-যাপনের জন্য কিশোর সময়ে ‘চাঁচো’ নামেও পরিচিত ছিলেন তিনি। একটি শার্ট সপ্তায় একবার বদলাতেন বলেই বন্ধুরা তাকে এই নাম দিয়েছিলো।

মেডিকেল পড়ুয়া চে’ তরুণ বয়সে ডুবে থাকতেন বইয়ের পাতায়। তরুণ বয়সেই পড়ে ফেলেছিলেন মার্কস, লেনিন, গান্ধী, ফকনার এর মত লেখকদের বই। সেইসাথে একটা আদর্শিক পরিবর্তনও আসতে থাকে তখন থেকেই। তারই জের ধরে ১৯৫১ সালে লেখাপড়ায় এক বছর বিরতি দিয়ে আলবার্টো গ্রানাডো নমক এক বন্ধুকে সাথে করে মোটর সাইকেলে দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন। উদ্দেশ্য ছিল পেরুর সান পুয়েবলোর লেপার কলোনিতে (কুষ্ঠ রোগীদের জন্য বিশেষ কলোনি) স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কয়েক সপ্তাহ কাজ করা। কিন্তু পথে খেটে খাওয়া মানুষের দুর্ভোগ চে’কে দারুণভাবে নাড়া দেয়। তিনি তাঁর সফরকে দীর্ঘ করে ইকুয়েডর, কলম্বিয়া, ভেনিজুয়েলা, পানামা ও মিয়ামির মধ্য দিয়ে বুয়েনস আইরেস এর দিকে যান। পথে তিনি দেখতে পান আমেরিকানরা চিলির বিশ্বের বৃহত্তম কপার ফিল্ড ‘চুকি কামাতা’কে কিভাবে নিজস্ব মালিকানাধীন করে নিয়েছে। তিনি খেয়াল করেন তৎকালীন আমেরিকান কোম্পানিগুলো যেমন, অ্যানাকোন্ডা, কেনকা কিভাবে চিলির সকল প্রাকৃতিক সম্পদকে এককেন্দ্রীকরণ করে আসছে।

ভেনিজুয়েলা থেকে তিনি সরাসরি বুয়েনস আইরেসে আসেন মেডিকেলে পড়া শেষ করতে। ডাক্তারি পড়া শেষ করে তিনি নতুন এক সমাজতান্ত্রিক চেতনা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন বহির্বিশ্বে। এবার লক্ষ্য বলিভিয়া হলেও পরে তিনি গুয়াতেমালা যান। ওখানেই তাঁর পরিচয় হয় হিলদা গদেয়ার সাথে। হিলদাই পরে চে’র প্রথম সন্তান হিলদিতার মা ও চে’র প্রথম স্ত্রী। হিলদিতা চে’কে পরিচয় করিয়ে দেন ২৬ বছর বয়েসী কিউবান আইনজীবী ফিদেল কাস্ত্রোর সাথে। যে কিছুদিন আগেই ‘মনকারা মিলিটারি ব্যারাক’ আক্রমণের দায়ে ১৫ বছরের জেল সাজাপ্রাপ্ত হন। যদিও পরবর্তিতে আন্তর্জাতিক চাপের কারণে তাকে মাত্র দুই বছর জেলে রেখেই ছেড়ে দেয়া হয়।

ফিদেলের সাথে পরিচয়টাই যেন ছিলো চে’র জন্য নতুন জন্মের মত। মেক্সিকোতে তাদের বৈঠক হয়। রাতদীর্ঘ বৈঠকে দুজন দুজনের আদর্শিক বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করেন। দীর্ঘ আলোচনায় চে জানতে পারেন ফিদেল তৎকালীন কিউবার স্বৈরাচারী একনায়ক বাতিস্তাকে উৎখাত করার সংকল্পে বদ্ধপরিকর।
১৯৫৬ সালের ২৫ নভেম্বর, চে’রা মেক্সিকো থেকে ‘গ্রানামা’ নামক ছোট জাহাজে করে কিউবার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। লক্ষ্য, বাতিস্তার সরকারকে হটিয়ে কিউবার জনগণকে একনায়কতন্ত্র থেকে মুক্ত করা।

কিউবার তীরে পৌঁছাতেই বাতিস্তার বিমান বাহিনী ও পরে সেনাবাহিনীর হামলায় ৮২ জনের ছোট বিপ্লবী বাহিনী আরো ছোট হয়ে যায়। বাকি থাকে মাত্র সতের জন। চে গলায় গুরুতর আঘাত পেলেও বেঁচে যান। এরপর চে, ফিদেলরা মিলে আবার সংগঠিত হতে থাকেন। বিপ্লবকে আরো সংগঠিত করার জন্য চে ‘আল কুবানু লিব্রে’ নামক পত্রিকা ও ‘রেডিও রিবেলদে’ নামক রেডিও স্টেশন প্রতিষ্ঠা করেন। স্থানীয় জনগণকে বুঝিয়ে দল ভারী করতে থাকে।

যুদ্ধক্ষেত্রে চে’এর সাহসিকতার জন্য চে’কে ফিদেল কমান্ডার হিসেবে পদোন্নতি দেন। কমান্ডার হয়ে চে যেনো আরো অদম্য হয়ে উঠেন। বাতিস্তার বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘সাইকোলজিকাল অ্যাটাক্’ এর পরিকল্পনা ছিল একেবারেই চে’র নিজস্ব।

যুদ্ধক্ষেত্রে এমন কঠোর ও নৃশংস চে’র মনে প্রেমেরও কমতি ছিল না। হিলদিতার জন্মের পরে চে হিলদাকে বিয়ে করেন এবং কিউবা বিপ্লবের অংশ নিতে যাওয়ার সময় হিলদাকে বিদায় বলে চিঠিও লিখেন। চে লিখেন, ‘যুদ্ধে যাচ্ছি, মারাও যেতে পারি। বেঁচে থাকলে আবার দেখা হবে।’ যদিও পরবর্তিতে চে ‘এলিদা মারস’ এর প্রেমে পড়ার কারণে হিলদার সাথে তাঁর বিয়েটা ভেঙ্গে যায়।

শত্রুপক্ষের আত্মায় কাঁপন তোলা চে তাঁর ক্যাম্পের নতুন বিপ্লবীদের কাছে বড়ভাই, বাবা, বিপ্লবী নেতা, আদর্শ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। শৃঙ্খলার বিষয়ে চে ছিলেন একেবারেই অনড়। ক্যাম্পের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করার অভিযোগে চে অনেককেই ছয় দিন না খাইয়ে রাখার মত শাস্তিও দিয়েছেন। শত্রুপক্ষের দালাল ক্যাম্পে ধরা পড়লেই চে’র বুলেট থেকে মুক্তি পায়নি।

ক্যাম্পে ‘ডাক্তার সাকামুইলাস’ নামে পরিচিত ছিলো চে। সকল সৈনিকের যেকোন প্রকারের অসুস্থতার চিকিৎসা করতেন তিনি।

কিউবা বিপ্লব সমাপ্ত হওয়ার পর চে চাইলেই কিউবায় থেকে সুখে শান্তিতে জীবন কাটিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু চে নিজের লক্ষ্য থেকে সরে আসেননি। চে কিউবা থেকে ২৪ এপ্রিল ১৯৬৫ কঙ্গোতে যান এবং সেখানে বিপ্লব সংগঠিত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু ব্যর্থ হন। ৩ অক্টোবর ১৯৬৫ সালে চে কাস্ত্রোকে লেখা এক চিঠিতে কিউবার সকল প্রকারের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন। পরবর্তিতে কাস্ত্রোর সহায়তায় তিনি বলিভিয়ায় যান এবং সেখানে বিপ্লব সংগঠিত করার চেষ্টা করেন। সেখানে বিপ্লব চলার সময়েই চে গ্রেফতার হন এবং ১৯৬৭ সালের ৯ই অক্টোবর তাঁকে মেরে ফেলা হয়।

চে’র মৃত্যু নেই, তিনি এখনও বেঁচে আছেন পুরো লাতিন আমেরিকা, তথা সমগ্র শোষিত বিশ্বেই। আজো চে’র মত একজন বিপ্লবী খুঁজে ফেরেন তারাই, শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন যারা। আজো তারা অপেক্ষা করে আছেন চে’র মত কেউ এসে হয়তো তাদের মুক্তির পথে দেখাবে। এ সহস্রাব্দের অন্যতম লড়াকু বিপ্লবী চে’র জন্মদিনে তাই আমাদের লাল সালাম। চে বেঁচে আছেন সকল মুক্তমনা মানুষের হৃদয়ে। বেঁচে থাকবেনও আজীবন। ‘শুভ জন্মদিন চে।’

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.