অস্তিত্ব যখন বিলীন হতে থাকে

Canada Tribal sরওশন আরা বেগম: খুব বেশী দিন আগের কথা নয়, উনিশ শতকে কানাডা সরকারিভাবে অভিনব কায়দায় ন্যাটিভ বা যাকে আমরা রেড ইন্ডিয়ান বলি তাদের উপর নির্যাতন শুরু করেছিল। ১৯৬০ সাল পর্যন্ত এই এই ধারা অব্যাহত ছিল। কানাডার সরকার উপজাতিদের সংস্কৃতিকে শেষ করে দেবার জন্য রেসিডেন্সি স্কুল তৈরী করে। উপজাতি বাচ্চাদের লেখাপড়ার অজুহাত দেখিয়ে বাধ্যতামূলকভাবে সেখানে পাঠানো হতো। আর শিক্ষার নামে সেখানে চলতো এক অমানসিক নির্যাতন। সেই নির্যাতনের চিত্র ধরন প্রকৃতি আজও মাঝে মাঝে পেপারে প্রকাশিত হচ্ছে। তাদের ভাষা সংস্কৃতিকে চিরদিনের জন্য ধ্বংস করার একটা পরিকল্পনা ছিল এই সব রেসিডেন্সিয়াল স্কুলের মাধ্যমে।

সেখানে বাচ্চাদের কোন লেখা পড়া শেখানো হতো না। সারাদিন ধরে তাদেরকে নানা ধরনের কাজের মধ্যে রাখা হতো। যেমন বাচ্চা মেয়েদের দিয়ে রান্না করা, পরিস্কার করা, সেলাই করা, কাপড় কাচা ইত্যাদি কাজে ব্যস্ত রাখা হতো। আর ছেলেদেরকে বাগান করা, চাষবাস করা, মাটি কাটা ইত্যাদি নানা ধরনের কাজে মধ্যে রাখা হতো। হয়তো ঘন্টা দুই ক্লাস হতো। সেখানে তাদের নিজস্ব ভাষার ব্যবহার নিষিদ্ধ ছিল। যদি কেউ ভুলে উপজাতীয় ভাষায় কথা বলতো তাদের জিহ্বায় সুঁই দিয়ে ফুটো করে দেওয়া হতো। নানা ধরনের যৌন নির্যাতনও চালাতো। ঠিকমতো খাবারও দেওয়া হতো না।  বারো মাসের দশ মাসই এই সব স্কুলে বাচ্চাদের থাকতে হতো। তাদের ধর্মের থেকে বিচ্যুত করে খৃষ্ট ধর্মে দীক্ষিত করা হতো।

সারা দেশে ১৬০টির মত রেসিডেন্সি স্কুল তৈরি করা হয়েছিল শুধু উপজাতীয় সংস্কৃতিকে নষ্ট করার জন্য। প্রায় ৩/৪ বছর আগেও এক রেসিডেন্সি স্কুলের পিছনে গুপ্ত কবর স্থান পাওয়া গিয়েছিল। তা নিয়ে মিডিয়ায় অনেক হৈচৈ হয়েছে। বর্তমান প্রাইম মিনিস্টার স্টিফেন হারফার সরাসরি এর জন্য দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চেয়েছেন। আধুনিকতার নাম নিয়ে তাদের উপর যে অত্যাচার চালানো হয়েছিল তার ক্ষতিপূরণ স্বরূপ দেড় বিলিয়ন ডলার দান করা হয়েছে। হাজার বছর ধরে তাদের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল সেই সংস্কৃতিকে আধুনিকতার নামে বিনষ্ট করা কি ধরনের সভ্যতা?

এটা আধুনিক সভ্যতার এক কলংক। ইংরেজি শেখলেই সভ্য হওয়া যায় না। নিজস্ব সংস্কৃতি হলো সভ্যতার মূল চাবিকাঠি। আর সেই সংস্কৃতির মধ্যে থাকে সভ্যতার বিকাশ। এত বছর পর এসে এই কানাডার ইংরেজী জানা লোকেরা বুঝতে পেরেছে আমরা ভুল করেছি। তাই আজ তাদের কাছে ক্ষমা চাওয়া হচ্ছে। যদিও স্কুলগুলো সব বন্ধ করা হয়েছে তবুও নেটিভরা আজও তাদের এই নিজ ভুমিতে নিরাপদ নয় কিছু অসভ্য বর্বর লোকের জন্য। তাদের ছেলেমেয়েরা আজও বেশী সংখ্যক নিখোঁজ হচ্ছে। নিজ ভূমিতে তারা কেন এত অসহায় এর উত্তর আমার জানা নেই। তবে সভ্যতায় আমরা যে অনেক পিছিয়ে আছি তার প্রমাণ এটি।

এখানে উপজাতীয়দের ৬৮টি গ্রুপ ছিল। তাদের অনেকেরই আজ বিপদের মধ্যে আছে। ভাষা অনেকেই হারিয়ে ফেলেছে। Beowulth এরা একেবারেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এই গ্রুপের কেউ আর জীবিত নেই। আর যারা আছে তারা সংস্কৃতি হারিয়ে নিঃস্ব হবার পথে। ইউনুটদের ভাষা আজও কিছুটা টিকে আছে। তাদের গ্রুপগুলোর নাম জানা দরকার।

  1. Nouajo
  2. Blackfoot
  3. Sioux
  4. Mikmauq
  5. Metis
  6. Inutes

এখন তাদের কালচারকে ফ্যাশান ও গানের মধ্যে আনা হচ্ছে আধুনিক সভ্যতার উপলব্ধি থেকে। তাদের ধর্ম হলো স্পিরিচুয়াল যা প্রকৃতির সাথে সম্পর্কযুক্ত। তাদের চিকিৎসা পদ্ধতিও প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। লাকোটা তদেরই বানানো একটা হারবাল চিকিৎসার ওষুধ।

ইউরোপীয়রা যখন প্রথম এখানে আসা শুরু করে সেই ১৫০০- ১৬০০ সালের দিকে তখন তারা  স্মল পক্স নিয়ে আসে। এতে প্রচুর উপজাতি মারা যায়। তারা কলেরা জীবাণুও বহন করে নিয়ে আসে।  মদ, ফার আর অস্ত্রের বাণিজ্য তারা উপজাতিদের দিয়েই শুরু করে। যে কলম্বাস উপজাতিদের সাথে চুক্তি করেছিলেন, সেই উপজাতিও বিলুপ্ত হয়ে গেছে। স্প্যানিশরা তো এক উপজাতির সভ্যতাই ধ্বংস করে দেয় শুধু স্বর্ণের লোভে। সেই সভ্যতা হলো Aztec. এই সভ্যতায় তারা প্রচুর স্বর্ণ ব্যবহার করেছিল কিন্তু এই স্বর্ণ যে এত দামী তা তাদের জানা ছিল না। তাই এই মূল্যবান ধাতুর ব্যবহারই তাদের সভ্যতার পিছনে আরেক ধ্বংসের বীজ তৈরি হয়। স্প্যানিশরা আজ্যাক্ট সভ্যতা ধ্বংস করে স্বর্ণ আহরণ শুরু করে।

এইভাবেই এক এক করে মানব সভ্যতার এক কালো অধ্যায় রচিত হয় যার শিকার হয় পৃথিবীর সমস্ত উপজাতি। বাংলাদেশ এর থেকে ব্যতিক্রম হতে পারলো না। তারাও আজ পাহাড়ি উপজাতিদের ধ্বংসে নেমেছে। পাহাড়ি মেয়েদের ধর্ষণ করা হচ্ছে, তাদের ঘরবাড়ি আগুন লাগিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

কানাডার মত সভ্য দেশেও এক অসভ্য আচরণ ঘটে থাকে। তার জন্য তারা শুধু আজ অনুতপ্ত নয়। বিলিয়ন ডলার খরচ করছে কিভাবে তাদের গৌরবময় ঐতিহ্যকে ফিরে আনা যায়, সেই চেষ্টা চালাচ্ছে। সভ্যতা ও বাণিজ্যের নামে পৃথিবীব্যাপি যে সংস্কৃতি ধ্বংসের মহড়া চলছে তা এক সময় আমাদের আদি ঐতিহ্যকে চিরদিনের মত মুছে দিবে। কোথাও খুঁজলে পাওয়া যাবে না আমাদের বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্য। এই বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্যই পৃথিবীর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। তাকে নিজের হাতেই ধ্বংস করে এক অপসংস্কৃতিকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। হাজার বছরের প্রচেষ্টায় যে সংস্কৃতি ও সভ্যতা গড়ে উঠে তাকে অস্বীকার করা মানেই নিজের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তোলা।

শেয়ার করুন:
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.