জিয়াদ যখন টিভি পর্দার হিরো

Jiadসুপ্রীতি ধর: পাইপের ভিতর দিয়ে পড়ে যেতে যেতে জিয়াদ (জিহাদ/জিয়া) নিশ্চয়ই মায়ের কাছে যেতে চাইছিল।  মায়ের শরীরের গন্ধ সে হাতড়ে বেড়াচ্ছিল পুরো পাইপের মরিচা পড়া গন্ধের মধ্যে। গরীব মায়েরা  পারফিউম মাখে না,  তাদের গন্ধ আমাদের নাকে কটু লাগলেও ছোট্ট জিয়াদের কাছে সেটাই ছিল স্বর্গীয় সুবাস। এর চেয়ে সুন্দর গন্ধ পৃথিবীতে আর হয় নাকি!

পাইপে পড়ে যেতে যেতে জিয়াদ বাঁচতে চেয়েছিল। ভাবছিল, এই বুঝি মা তাকে ঠিক উঠিয়ে নিয়ে যাবে। আগে যতবার কিছু না কিছু  দুষ্টুমিপনা সে করেছে, মা-ই তো তাকে আগলে রেখেছিল।  বিনিময়ে কিছু কড়া শাসন সে পেয়েছে। কিন্তু এবার মা যদি তাকে আচ্ছামতো মারেও, সে কাঁদবে না বলেই ঠিক করে রেখেছিল। তবুও মা যেন আসে, তুলে নিয়ে যায় তাকে এই বিপুল অন্ধকার গহ্বর থেকে। প্রচণ্ড ভয় পাচ্ছিল জিয়াদ। অন্ধকারে তার অনেক ভয়। টিকটিকি, ব্যাং ছাড়াও মাকড়সা, তেলাপোকা এগুলোকে তো সারা জীবনই সে ভয় পেয়েছে।

কাঁদছিল আর ভাবছিল, এই বুঝি মা আসবে।  এই বুঝি মায়ের গলা শুনতে পাবে সে, খোকন-মানিক আমার, কই গেলি রে তুই? আর কখনও মাকে না বলে কোথাও সে যাবে না বলেও পণ করেছিল জিয়াদ। কিন্তু না, মা আর আসেনি। মা আসতে পারেনি। যে পাইপটাতে সে পড়ে গেছে, এটা তো শুধুই একটা পাইপ ছিল না, এটা ছিল এদেশের ভঙ্গুর রাজনীতিরও একটা মরিচা পড়া, পরিত্যক্ত পাইপ। যেখানে পড়ে গেলে বড় মানুষেরাও উঠে আসে না, তাদের উঠে আসতে দেয়া হয় না। আর ওতো একটুকুন একটা মাসুম বাচ্চা। ও মরে গেলেই  বা কী!

পড়ে যাওয়ার পর ছোট্ট জিয়াদ দেখলো, পাইপের ওপর থেকে আলো আসছে, মানুষের কথা শোনা যাচ্ছে। সে কিছু বুঝতে পারছিল না, তারা কী বলাবলি করছিল। তারা কিছু একটা ফেলেছিল, পরিচিত জুসের প্যাকেট পেয়ে সে হয়তো খেয়েও নিয়েছিল। কিন্তু মা কোথায়? সে তো চিৎকার করে মাকে ডাকছিল, ‘আম্মা, আমি এইখানে, দেখো, এইখানে আছি। তুমি দেখতে পাও না?’ কিছুক্ষণ পর কে যেন তার নাম ধরে ডাকলো। সে স্পষ্ট শুনলো তার বাবা তাকে ডাকছে। সে হয়তো সাড়াও দিয়েছে। কিন্তু এতো নিচে থেকে তার ক্ষীণ আওয়াজ কেউ কি শুনেছিল? কেউ বলেছে, শোনা গেছে, কেউ কেউ সন্দেহ পোষণ করেছে।

জিয়াদ কি তখনও বেঁচেছিল? খেলতে গিয়ে পাইপের ভিতরে পড়ে যাওয়ার সময় সে নিশ্চয়ই সুপারম্যানের মতোন খাড়া হয়ে ‘সাঁই’ করে পড়ে যায়নি। মাথায় আঘাত পেয়ে কুঁকড়ে-মুচড়ে তবেই না পড়েছে। আমরা কী একবার তার বেদনার কথাটুকু বুঝতে পারছি?  হয়তো ততক্ষণে ক্ষত-বিক্ষত, অন্ধকারে পোকা-মাকড়ের ভয়ে ভীত জিয়াদ বার বার তার মায়ের উম খুঁজছিল, বাইরে যে তখন শৈত্যপ্রবাহ চলছে। ঢাকাবাসী সেদিন আপাদমস্তক গরম কাপড়ে মোড়ে শীত  এনজয় করছিল। আর জিয়াদ, গরীব জিয়াদ পাতলা এক টুকরা কাপড় পড়ে ঠাণ্ডা লোহার পাইপে আটকে আছে। নিচে  জল ছিল। সে কী জলে পড়েছিল? জলটা কি ঠাণ্ডা ছিল না? তাহলে তো তার অনেক আগেই মরে যাওয়ার কথা ছিল। মরে গিয়ে থাকলে মায়ের কথা মনে পড়েনি তার। কিছুক্ষণও যদি সে বেঁচে থাকে, তার সাথে যোগাযোগের কথা যদি সত্যই হয়, তবে  তার ঠাণ্ডায় জমে যাওয়ার কথা। অনেকক্ষণ ঘুমায়নি সে। ঘুমিয়েও পড়ার কথা। সে কী ঘুমিয়ে  গিয়েছিল শেষপ্রস্থানের আগে।

উপরে যে আলো দেখছিল, কথা শুনছিল, তারা আসলে কি করছিল? ছোট্ট জিয়াদের মাথায় ঢোকে না। তাকে কেন তোলা হচ্ছে না, তার তো নি:শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, কেউ কি বুঝতে পারছে না? বড়রা এতো কথা কেন বলছে? সে বার বার চিৎকার করে বলতে চাইছিল ওপরের বড় মানুষগুলোকে, ‘আমাকে বাঁচাও’। হাজারও মানুষের কোলাহলে তার সেই চিৎকার কেউ শোনেনি। এইদেশে কেউ শোনেও না।

জিয়াদ জানতো, তার মা তাকে খুঁজছে, তার ছোট ভাই-আপুটা তাকে খুঁজছে। সে যে এইখানে পড়ে আছে, এটা কি ওরা জানে না? বাসায় টেলিভিশন নেই, অন্যদের ঘরে গিয়ে টেলিভিশন দেখতে গিয়ে কতবারই না মায়ের বকুনি খেয়েছে। আর আজ তাকেই দেখাচ্ছে টিভিতে। কী সৌভাগ্য! একটিবার যদি জিয়াদ দেখতো! সে খুশিতে লাফিয়ে উঠতো। টিভির ভিতরে কি করে ঢুকে গেল সে? ভেবেই পায় না।

ওপরে মানুষের কোলাহল, চিৎকার-চেঁচামেচি বাড়ে, মা আর আসে না। তার শরীরটা আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে আসে, ঠাণ্ডায় জমে যায় হাত-পা-শরীর-মন-চিন্তা করার শক্তি সব। সে নিজেকে আর তুলে রাখতে পারে না, কেউ তাকে তুলতে পারে না। আর পারছে না সে। আম্মু……………..গলাটা বুঁজে আসতে থাকে জিয়াদের, মনে পড়ে যায় আজ সকালেই মাকে জড়িয়ে ধরে ছোট ভাইসহ লেপের তলায় শুয়ে থাকার কথা। সেও ঘুমিয়ে যেতে থাকে, চিরতরে। সবাই টেলিভিশনে তাকে দেখে, পাইপের ভিতরের জিয়াদ আস্তে আস্তে মরে যায়। হাত-পা শক্ত হয়ে আসে।  অনেক নাটকীয়তার পর পরদিন সে উঠে আসে ঠিকই, ততক্ষণে তার মাকে আর তার দেখা হয় না, মায়ের গন্ধ নেয়া হয় না, মায়ের কোল, এতো নরম কোল জীবনের মতো ছিঁড়ে খান খান হয়ে যায়। এভাবেই একটি শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে যায় আর জিয়াদ তখন টেলিভিশনের পর্দায় হিরো হয়ে উঠে। হায় জিয়াদ, ছোট্ট জিয়াদ। ক্ষমা করে দিস বাপ।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.