সুযোগের সাম্য এবং পুরুষতন্ত্র

MOnoroma Biswas 2
মনোরমা বিশ্বাস

মনোরমা বিশ্বাস: নারীবাদী যারা, যারা সমতার জন্য লড়ছেন তারা কখনো বলেননি নারীর বৈশিষ্ট্যের বিরুদ্ধে যেতে চান। ‘নারীরা দৈহিকভাবে দুর্বল’- এ কথাটাই ত্রুটিপূর্ণ। আসলে কথাটা হবে, ‘নারীরা দৈহিকভাবে ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের’ – এখানে দুর্বলতার কথা আসছে কিভাবে?

পুরুষদের বিপরীতে নারীদের নিরুঙ্কুশ আধিপত্য দিয়ে দিলে তখন আর দুর্বল বলতে পারবে কি? দুর্বলতা বা সবলতা নারী-পুরুষের প্রাপ্ত ক্ষমতার মানদণ্ডে নির্ণীত হয়, শারীরিক পার্থক্যের কারণে নয়। আর আমরা নারীরা কবে বলেছি যে, আমরা পুরুষদের মত শারীরিক সক্ষমতায় সমান হতে চাই!

আমরা চাই বৈষম্য ঘুচিয়ে সমান হতে। আসলে পুরুষেরা ‘বৈশিষ্ট্য ‘ আর ‘বৈষম্য’কে গুলিয়ে ফেলে। শুধু তাই নয় শারীরিক পার্থক্যকে তারা দুর্বলতার স্মারক হিসেবে দেখাতে চায়।

প্রাকৃতিকভাবে পুরুষ প্রজাতির প্রাণীর মধ্যে আত্মরক্ষার জন্য শিং আছে, নারী প্রজাতির মধ্যে নেই এ দুটো আলাদা বৈশিষ্টকে যারা দুর্বলতা বলে দেখাতে চাচ্ছ, তাদের যদি আমরা বলি , সন্তান জন্ম দেবার সময় আমরা ভয়ানক যন্ত্রনা সইতে পারি, তোমরা পুরুষরা তা পারবেনা , অতএব তোমরা পুরুষরাই মেয়েদের থেকে দুর্বল, খুব কি মিথ্যা বলা হবে? আদতে আমরা বুঝি, সমস্যা আমাদের চাওয়াতে নয়, সমস্যা তোমাদের মাথাতে। জঘন্য পুরুষতান্ত্রিক মাথা।

আরেকটা বিষয় হচ্ছে, সুযোগের সাম্য। নারী-পুরুষের শারীরিক গঠনের ‘ভিন্নতা’ বা বৈশিষ্ট্যকে ভুল ব্যাখ্যা করে একতরফা মেয়েদের ‘অবলা ‘ হিসাবে দেখানোর চেষ্টা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। এরা আরেকটি চতুর কৌশলের আশ্রয় নেয়। এটার উদ্দেশ্যও বিভ্রান্তি ছড়ানো।

সমাজের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে কম অংশগ্রহণের দৃষ্টান্ত তুলে ধরে এরা দেখাতে চান প্রকৃতিগত ভাবে মেয়েদের যোগ্যতারও অভাব রয়েছে। আসলেই কি তাই ? নারী-পুরুষের পারস্পরিক যোগ্যতা প্রমাণের লড়াইকে ‘অসম প্রতিযোগিতা’র মধ্যে ঠেলে দিয়ে এ দাবি কতখানি যৌক্তিক ? যেখানে লড়াইয়ের মাঠটিই অসমতল !

নারীর জন্য সংরক্ষিত আসন, কোটা চালু করা, বাসে আলাদা আসনের ব্যবস্থা রাখা এসবই নারীর জন্য অবমাননাকর। মেয়েরা কখনো এ করুণা দেখানো ব্যবস্থা সমর্থন করতে পারে না। করেও না। আমি জানি অনেকে আমার আমেরিকায় প্রতিষ্ঠিত হবার উদাহরণ দেবেন। তাদের উদ্দেশ্যে বলি, হ্যাঁ প্রতিকুলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে প্রতিষ্ঠা পাওয়া একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। আমি পেরেছি, কিন্তু অনেকে পারেনি কেবল সুযোগের অভাবে।

পুরুষতন্ত্র এখন ঠেলায় পড়ে আংশিক সুবিধা দিয়ে দেখাতে চাচ্ছে অনেক কিছুই-ই তো করা হলো। খুব স্বাভাবিকভাবে তাই ‘সুযোগের সাম্য’ কথাটি সামনে আসছে এখন। যে সমাজে সমান সুযোগ সৃষ্টি করা হয়নি, সে সমাজ মেয়েদের অযোগ্যতার ধুয়া তোলে কোন যুক্তিতে? আমরাও তাই বলি, বাসে সংরক্ষিত আসনের মত ‘বিশেষ সুবিধা’ আদায়ের জন্য আমরা লড়ছি না, করুণা চাই না আমরা, আমরা চাই ‘সুযোগের সাম্য’।

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.