RFL

রাষ্ট্রও কি ‘ওড়না’ পরতে যাচ্ছে শেষপর্যন্ত!

0

রওশন আরা নীপা: কদিন ধরেই মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, কোথায় যাচ্ছি আমরা! ছোট্ট এই দেশটায় অগণিত মানুষ। পিল পিল করে ছুটে চলে সকাল –সন্ধ্যা –রাত। বেঁচে থাকার লড়াই, বিত্তবানদের আরও বিত্তবান হওয়ার প্রতিযোগিতা, যার যত আছে তার আরো চাই। আর এই চাই চাই এর হট্টগোলে মানুষ ঠিক আদৌ মানুষ আছে কিনা! আমাদের মনন, চিন্তা, আবেগ আর ভালোবাসা ঠিক অস্তিত্ব সঙ্কটে কিনা!

মানুষ আমরা কতটুকুই বা মানুষ হতে পারছি! আমাদের যে উত্তরসুরি তাদের পরিণতি কী হবে , ভবিষ্যত তবে কি অন্ধকার গুহায় ফেরত যেতে হবে?

রওশন আরা নীপা

অনেক বছর আগে মিশরে ফারাও সম্রাট নিজেকে ঈশ্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু মানুষ তাকে কেন মানবে! তাই তিনি অনেক চিন্তা করে সে দেশের সকল জ্ঞান চর্চাকে নিষিদ্ধ করলেন। এরপর বহু বছর বাদে মানুষ যখন সত্যি সত্যি শিক্ষা ভুলে গেল, তখন তিনি নিজেকে ঈশ্বর হিসেবে দাবি করলেন এবং অনেকেই তা বিশ্বাস করলো।

– ইতিহাসের এই শিক্ষা থেকে এটাই প্রতীয়মান যে আপনাকে অধীনস্ত করা বা আপনার উপরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য সবচে জরুরি হচ্ছে আপনার মধ্যে থেকে জ্ঞানের আলো দূর করে ফেলা এবং নিয়ন্ত্রণকারীর কথাকেই মান্য করতে বাধ্য করা বা অভ্যস্ত করা।

যুগে যুগে এই চর্চা বহুভাবে কার্যকর  হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। কদিন ধরেই বাংলাদেশের স্কুল পাঠ্য বইয়ের ভুল এবং কিছু বিষয় নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। এর একটি ও- তে ওড়না চাই এই বাক্যের ব্যবহার। এই সূত্র ধরেই বের হয়ে এসেছে আদর্শ লিপি বা বর্ণ পরিচয়ের কিছু বই এর উদাহরণ, যেখানে প্রায় প্রতিটা বর্ণের পরিচয়ে যোগ হয়েছে এমন কিছু শব্দ, যা শুধুমাত্র ইসলাম ধর্মীয় গোষ্ঠীর নিজস্ব বিষয়।

অনেকেই বলছেন একটা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের জন্য এটা এমন কী সমস্যা!

ধারাবাহিক ভাবে যদি বলি-

১। ও-  তে ওড়না চাই –ওড়না, মেয়েদের পোশাক, এই পোশাক বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলংকা এবং পাকিস্তানের টিনএজের নারী থেকে শুরু করে বয়স্ক নারীদের অধিকাংশ নারী ব্যবহার করে। ওড়নাকে ব্যবহার  করা হয় শরীরের বিশেষ অংশ ঢাকার জন্য, যাকে বক্ষ বলা হয়। নারী তার প্রচলিত পোশাকের বাইরে এটাকে বাড়তি আচ্ছাদনের কাজে ব্যবহার করে, কারণ পুরুষ তার ওই বক্ষের দিকে কাম দৃষ্টি দেয়!

আমাদের দেশে ওড়না এবং হিজাব মুসলমান নারীর ক্ষেত্রেই বেশি প্রযোজ্য। স্কুলে ৫/৬ বছরের ছেলেমেয়ে সবাই মিলে জোরে জোরে বলছে, ও তে ওড়না চাই- মেয়েরা বলছে, কারণ তাঁদের বক্ষ ঢাকতে হবে এই বয়সের একটা মেয়ে শিশুর বক্ষ কতটুকু উন্নত হয়েছে যে তাকে ঢাকতে হবে? আর উন্নত হলেই সেটা ঢাকতে হবে, এই কথা রাষ্ট্র কেন শেখাবে? আর ছেলে শিশুরা তো এই বয়সেই শিখে যাচ্ছে মেয়েদের ওড়না চাওয়া! কী অদ্ভুত, কয়দিন পরে বলবে ওড়না টানি –

২। এবার আসুন পাঠ্যবইয়ের শিক্ষাসূচি পরিবর্তন প্রসঙ্গে-

ক. আনন্দপাঠ ৮ম শ্রেণি – এখানে সব বিদেশী লেখকের অনুবাদ। শিক্ষার প্রাথমিক ধাপে নিজস্ব ভাষার সংস্কৃতি বিকাশে দেশপ্রেম জাগ্রত করতে কতটুকু ভূমিকা রাখবে এই অনুবাদ সর্বস্বতা? নিজের দেশ, সংস্কৃতি আর সাহিত্য না জেনেই সে আকৃষ্ট হচ্ছে অন্য দেশের সাহিত্য সংস্কৃতিতে। এদের কাছ থেকে ভবিষ্যতে আপনি কী আশা করতে পারেন?

খ. পাঠ্যসূচিতে আরো যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছে সেখানে দেখা গেছে মুসলিম লেখক, কবিদের প্রাধান্য দিয়ে মুসলিম ধর্মীয় ভাবের লেখা প্রাধান্য পেয়েছে ।

গ. কয়েকটি কবিতায় সম্পাদনার নামে বিশেষ কয়েকটি লাইন বাদ হয়েছে, যেখানে হিন্দু ধর্মীয় আবেগ প্রকাশ পেয়েছে। এই অজুহাতে তাহলে সেখানে মুসলমান ধর্মীয় লেখা কিভাবে যুক্ত হয়?

তাহলে আমার দেশের ধর্মনিরপেক্ষতা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা কোথায় গেল? বর্তমান সময়ে ইসলামী মৌলবাদের যে ভয়াবহতায় আমরা আক্রান্ত, তার বীজকে আরো পুষ্ট করবার এটা পদক্ষেপ নয় কি? তবে কি আমরা সত্যি সত্যি রাষ্ট্রীয়ভাবে অন্য ধর্মাবলম্বীদের অস্বীকার করছি? এটা কার স্বার্থে?

৩. ‘আদর্শ ছেলে’ কবিতায় সম্পাদনার নামে যা করা হয়েছে, তা কি আদৌ কেউ করতে পারেন? এছাড়া যে অসংখ্য ভুল এবার পাঠ্য বইয়ে দেখা গেছে, সেই ভুলে ভরা শিক্ষা নিয়ে আমরা আদৌ কতদূর যেতে পারবো? বিশেষ করে বানানের ক্ষেত্রে। এমনিতেই কথ্য ভাষায় যে পরিমাণ বিকৃতি (বাংলিশ, ইচ্ছামত শব্দের প্রয়োগ এবং উচ্চারণ) গত এক দশকে হয়েছে, তা কানকেই শুধু পীড়া দেয় না, মধুরতারও মৃত্যু হয়েছে।    

 সমস্যাটা এখানেই, রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থা কোন এক নির্দ্দিষ্ট জনগোষ্ঠী, সম্প্রদায় বা ব্যক্তির প্রতিফলন হতে পারে না যদি সেটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়। এখানে শিক্ষা সার্বজনীন এবং সবার জন্য সমানাধিকার নীতি মানতে বাধ্য। আমরা প্রত্যেকেই জানি ধর্ম একটি ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা ধারণা। এর বাইরে আর কিছু নয়। কিন্তু আমরা আমাদের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করণের স্বার্থে অথবা কোন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার অভিপ্রায়ে এটা স্বীকার করি না। আর এরই ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রের নিজস্ব ধর্মের প্রয়োজন হয়ে পড়ে, যেমন আমাদের বাংলাদেশের রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম ! এই রাষ্ট্র ধর্ম বিষয়টি কেন, কখন কিভাবে এসেছে সে আমার চেয়ে আপনারাই ভাল জানেন। ১৯৭২ সালের সংবিধান গড়ে উঠেছিল চারটি মূলনীতির উপরে ভিত্তি করে- জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, অর্থনৈতিক সামাজিক ন্যায়বিচার, এই অর্থে সমাজতন্ত্র।

একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক দেশ যার সামাজিক ভিত্তি ছিল বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা। আজকের স্কুল পাঠ্যক্রম বিবেচনায় আনলে যার বিপরীত ধারণাই দেয়। একটা ধর্মভিত্তিক দেশ ভেঙ্গে অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়ার পিছনে যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মদান, তিন লাখ নারীর যে নির্যাতন, আর সর্বোপরি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর যে দীর্ঘ সংগ্রাম, তার সবটাই অর্থহীন মনে হয় এবং এই ধারা অব্যাহত থাকলে আমরা আবারও সেই পুরনো পাকিস্তানে ফেরত যাবো, হয়ত তার নামটা পাকিস্তান হবে না, কিন্তু বাংলাদেশের মোড়কে পাকিস্তান নতুনভাবে উপস্থিত হবে। 

লেখক ও চলচ্চিত্রকার

১০/০১/২০১৭

লেখাটি ৪,৭৪২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.