RFL

সমাজের গলায় ঘন্টাটা বাঁধবে কে?

0
কাজী জোহরা ইসলাম: মেয়েটি যেদিন প্রথম আঘাতপ্রাপ্ত হয়,  সবার আগে তার পরিবার তাকে দোষারোপ করলো, ছেলেটিকে তুমিই উত্তেজিত করেছো, তোমার গায়ে হাত তুলেছে, নিশ্চয়ই তুমি তাকে সেইরকম রাগিয়ে দিয়েছো।

মেয়েটি তার নিজের দোষ খুঁজতে লাগলো।

আবারও যখন আঘাত করলো, এবার গলায় মুখে দাগ দেখে এক আত্মীয়া বললো, এইরকম মাঝে মাঝে আমাদেরও হয়,  তারপর আবার ঠিক হয়ে যায়, এতে ভালবাসা বাড়ে।

মেয়েটি অবিচল ভালোবাসা বাড়াতে নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলো।

কাজী জোহরা ইসলাম

এইবার ছেলেটি মেয়েকে ছেড়েই চলে গেল।
সবার মুখে এক কথা, তুমি নিশ্চই তাকে সুখী করতে পারোনি, তাই তোমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে। এটা তোমার ব্যর্থতা। 

ছেলেটি অন্য কোথাও ঠিকই সুখ খুঁজে পেয়েছে। মেয়েটির বুঝি আর দোষ গেলই না!! 

আমরা এমন একটি সমাজে বসবাস করি যেখানে নারী নির্যাতন এতোটাই দৈনন্দিন বিষয়, এতোটাই প্রাত্যহিক অভ্যাসের মতো ঠিক সূর্য যেমন সকালে উঠে, সন্ধ্যায় অস্ত যায়, কিংবা বেঁচে থাকতে নিঃশ্বাস নিতে হয়, অনেকটা সেইরকম।
আমরা মেয়েরা বুঝতেই পারি না আমরা নির্যাতন’র মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। কারণ চারদিকে তো একই জিনিস চলছে, কে কাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দেবে যে, যা হচ্ছে এটা অন্যায়।
উপরের ঘটনাটি শারীরিক নির্যাতনের একটি উদাহরণ, একটি মেয়ে যখন নির্যাতিত হয়, পরিবার সমাজ তাকেই দোষারোপ করে, মেয়েটি ঠিকমতো পতিদেবের সেবা করলো কিনা, বাধ্য মেয়ে হয়ে চলছে কিনা, ওড়না পরলো কিনা, ছোট জামা পরলো কিনা, এইসব হাস্যকর অজুহাত দিয়ে যে কিনা নির্যাতিত হচ্ছে, আর নির্যাতনকারী ব্যক্তিটি আরও উৎসাহ নিয়ে তার দুরভিসন্ধি সিদ্ধির জন্য কাজ করে যেতে থাকে।
বাড়ছে অনেক পারিবারিক নির্যাতন, ধর্ষণ আমাদের সমাজ ব্যবস্থা নারীদের করে তুলছে অনিরাপদ, অরক্ষিত। তাহলে এই সমাজের প্রয়োজন আছে কি?
কোনোভাবেই মেয়েদের উপর শারীরিক নির্যাতন গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষা, যুগের পরিবর্তন কোনো কিছুই যেন টলাতে পারছেনা এই মধ্যযুগীয় পুরুষতান্ত্রিকতাকে। সময় এসেছে ঢেলে সাজানোর। সমাজ যেন কখনই একজন দুষ্কৃতিকারীকে প্রশ্রয় না দেয়, এই পদক্ষেপ নিতে হবে প্রত্যেক পরিবার থেকে।
আপনি আপনার সন্তানটিকে মানুষ করার দায়িত্ব নিয়েছেন, তাকে শিখান একটি মেয়েকে কিভাবে সম্মান করতে হয়। আপনি মা, তাই আপনাকে হতে হবে রোল মডেল সন্তানের কাছে, একটি মেয়ে সন্তান তার মাকে দেখে শিখবে কিভাবে সংগ্রাম করতে হয়, মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয়, একটি ছেলে সন্তানও তার মাকে কেমন দেখেছে ছোটবেলায়, তার উপর নির্ভর করে তার নারীদের প্রতি তার ভবিষ্যৎ আচরণ।
ছেলে শিশুটি যদি দেখে মা মার খেয়ে খেয়ে, নিজের ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে সংসার করছে, তবে সে একই জিনিস তার ভবিষ্যৎ সঙ্গিনীর কাছে আশা করবে। যে মা সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে সব বিসর্জন দিয়ে সারাটি জীবন ত্যাগ স্বীকার করাটাকে মঙ্গোল মনে করছে, সে যেন তার সন্তানকে মেয়েদের সম্পর্কে একটা দুর্বল ধারণা দিল, অথচ একটু ঘুরে দাঁড়ালেই সে নিজের জীবনটিকেও একটি সুন্দর রূপ দিতে পারে।
মেয়ে… তোমার জীবন কি এতই মূল্যহীন? তোমার জন্ম হয়েছিল কি সমাজের হাতের খেলার পুতুল হয়ে থাকতে? যে শিকল তুমি পদে পদে বোধ করছো তোমার পায়ে পরানো আছে, তার থেকে তোমার জীবনের শক্তি অনেক বেশি। ওই শিকল নিয়েই তুমি হেঁটে যেতে পারো অনেকদূর, নিজের জন্য বাঁচো, জীবনকে জীবন দাও, তোমার জন্য না হোক, তোমার ছোট বোনটির জন্য অথবা তোমার কন্যা সন্তানটির জন্য আজকে তোমার নতুন করে ভাবতেই হবে!

লেখাটি ৬৪২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.