RFL

পরিবার গড়া এবং সন্তান নেয়ার আগেই প্রস্তুতি নিন

0

লীনা দিলরুবা: আমার বড়কন্যা ধানমন্ডির একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ে বছরখানেক পড়েছিল। বিদ্যালয়ের নিয়মানুযায়ী একবার অভিভাবকদের কাউন্সেলিং এর জন্য  মনোবিজ্ঞানী মেহতাব খানমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

লক্ষ্য করার বিষয় হলো আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বাচ্চাদের নয়, অভিভাবকদের। আমাদের বলা হয়েছিল যেন শিশুদের না এনে শুধু নিজেরাই এই মিটিংয়ে যোগ দিই। কারণ তাঁর মতে, আমরা যে সবসময় বলি, শিশুর আচরণের এই সমস্যা, সেই সমস্যা সেটি আসলে আমাদের অভিভাবকদেরই আচরণের কারণে সৃষ্ট। এই সমাবেশে যোগ দিয়ে আমার নিজের যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল সেটি অভাবনীয়। এবং পরে আমার নিজের অনুধাবনও তা-ই দাঁড়ায়; অর্থাৎ আমরা নিজেদের মতো করে শিশুদের বড় করতে গিয়ে না পারি তাদের সঠিক সময়ে ব্যক্তিত্ব গঠনে সহায়তা করতে, না-পারি তাদের জন্য আমাদের আচরণের যৌক্তিক মাত্রা নির্ধারণ করতে।

সময়টা কয়েকবছর আগের। আসলে বিষয়টা এমন ছিল- তখন আমার যে বয়স এবং সন্তানের মা হিসেবে আমার যে বোঝাপড়া থাকার কথা ছিল মাহতাব খানমের কাছ থেকে পাওয়া পরামর্শগুলোর সঙ্গে মেলাতে গিয়ে দেখি আমি খুবই আনাড়ি হাতে সন্তান লালন-পালন করছি। শুধু সন্তান লালন-পালন নয় আমি খুব আনাড়ি হাতে সংসারও করছি। স্বামীর সঙ্গে আমার আচর-আচরণও অনেক ক্ষেত্রে যৌক্তিক নয়। সেই অযৌক্তিক আচরণের প্রভাব পরিবারে পড়ছে বলে আমার সন্তানও কিছু ক্ষেত্রে বিগড়ে যাচ্ছে। সে অতিরিক্ত বায়না করছে। সে রাগ প্রকাশ করছে বেশি। আর আমি ভাবছি বাচ্চাই রাগী। বাচ্চাই অতিরিক্ত ডিম্যান্ডিং।

সবকিছু মিলিয়ে সেই একদিনের প্রশিক্ষণ পরিবার এবং সন্তানের প্রতি আমার নিজস্ব আচার-আচরণের যে মাত্রা নির্ধারণ করতে সহায়তা করেছিল সেটির ফলাফল এতো বছরে কিছুটা হলেও ধনাত্মকভাবে আমার পরিবারে দৃশ্যমান। সেদিনের প্রশিক্ষণার্থীদের অনেকেই বুঝেছিল আবেগ অনুভূতি প্রকাশের জায়গা হতে হবে যৌক্তিক এবং বৈজ্ঞানিক। আবেগ প্রকাশ কোনো হালকা বিষয় নয়।

মেহতাব খানমের সঙ্গে দেখা হবার আগে আমাদের কাছে পরিবার আর সন্তান লালন-পালনের বিষয়টা এমন ছিল, লেখাপড়া না করে পরীক্ষা দিতে বসলে যেমন হয়। আন্দাজে সবকিছু লিখতে হয় তেমন কিছু।

মেহতাব খানমের কথাগুলো শোনার পর দেখলাম, সন্তান ধারণ করার কোনোরকমের শিক্ষা গ্রহণ  না করেই আমরা তাদের পৃথিবীতে নিয়ে আসছি। পুরো সেশনজুড়ে অনেককিছুই তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন তার মধ্যে পেরেন্টিং কত প্রকার এবং কী কী সেটি তুলে ধরেছিলেন।

চার ধরনের প্যারেন্টিং এর মধ্যে আমরা কে কোন ধরনের প্যারেন্টিং করছি, সেটিও সঙ্গে সঙ্গে উদাহরণ দিয়ে আমাদের ধরিয়ে দিয়েছিলেন। বিষয়টা এতো প্রাঞ্জল আর বাস্তবানুগ ছিল যে, প্রত্যেকে উৎসাহের সঙ্গেই নিজের অভিজ্ঞতাগুলো মিলিয়ে নিয়ে যার যার নিজের অনুভূতি জানাচ্ছিল।

এরপর তিনি একটি নাটিকার আয়োজন করেন, যেখানে সন্তান কোন আচরণ করলে কীভাবে সেটির প্রতিউত্তর দিতে হবে তার পদ্ধতি হাতে-কলমে দেখিয়ে দেবার ব্যাপারটি ছিল। এক কথায় বলতে গেলে, অনুষ্ঠানটি শেষ হবার পর বাড়ি ফিরতে ফিরতে শিশুকে যেভাবে আনাড়িভাবে পরিচালিত করছি সেটি কতোটা আত্মবিধ্বংসী, সেকথা অনুধাবন করে ভেতরে ভেতরে আমি মুষড়ে পড়েছিলাম।

লীনা দিলরুবা

আমার পরিচিত একটি মেয়ে সদ্য সন্তান গর্ভধারণ করেছে। মেয়েটি চাকুরী করে এবং এটিই তার প্রথম গর্ভধারণ। দিন যাচ্ছিলো, এর মধ্যে একদিন হঠাৎ তার রক্তপাত হতে থাকে। চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে তখন পূর্ণকালীন বিশ্রামের জন্য শয্যাশায়ী হতে হয়।

মেয়েটির সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তার বাসস্থান ঢাকার কল্যাণপুরে এবং কর্মক্ষেত্রটি পুরান ঢাকার বংশাল-এ। রোজ কল্যাণপুর থেকে বংশাল আসা-যাওয়া করতে করতেই তার এ-অবস্থা। গর্ভধারণের পর একদম প্রাথমিক অবস্থায় যখন তার সাবধানে চলাফেরা করার কথা ছিল, তখন সে সেটি করতে পারেনি। এখন এই ভ্রুণ থাকবে কিনা সেটিই অনিশ্চিত।

সন্তান ধারণের আগে বা পর পরই পরিকল্পিতভাবে কর্মক্ষেত্রে যাতায়াতের বিষয়টি নিশ্চিত না করার ফলে তার এখনকার পরিণতি হলো, যেটি খুবই দুঃখজনক। সন্তান ধারণের জন্য প্রস্তুতির প্রয়োজন রয়েছে, সে বিষয়ে যত্নবান না হলে এরকম দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

ইংরেজি সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ গদ্য লেখক, দার্শনিক, গবেষক, গণিতজ্ঞ, শিক্ষাবিদ বার্ট্রান্ড রাসেল বিবাহ ও নৈতিকতা নামের আস্ত একটা বই-ই লিখেছিলেন। বিবাহ, পরিবার গঠন, বিবাহ বিচ্ছেদ এড়ানোর কৌশল নির্ধারণ, সন্তান ধারণ, সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চতকরণসহ যাবতীয় বিষয় নিয়ে রাসেলের সেই গ্রন্থ ১৯২৯ সালে লেখা হলেও আজকের সমাজেও সেটি প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছিলেন, বিয়ে করার আগেই সমূহ সবকিছু বিবেচনা করেই সংসার শুরু করা উচিত, আর সন্তান জন্মানোর পর বিয়ে বিচ্ছেদ উচিত কাজ নয়। আমাদের সমাজে সম্পর্কের বিচ্ছেদক্রান্ত মানুষের সংখ্যা যে হারে বাড়ছে, সে সূত্র ধরে বলতে পারি, সম্পর্কিত হবার জন্য যেমন প্রস্তুতির দরকার, বিয়ের সম্পর্কে জড়াতেও প্রস্তুতির দরকার, সন্তানের বাবা-মা হবার জন্যও প্রস্তুতি দরকার।

আমরা কোনো কিছুতে কোনো প্রকার প্রস্তুতি না নিয়েই বিয়ে করি। সম্পর্কিত হই। সন্তানের জন্ম দিই। তারপর আনাড়ি হাতে সবকিছু চালাতে চাই এবং এর ফল সবক্ষেত্রে না হলেও অনেক ক্ষেত্রে ভাল হয় না।       

লেখাটি ২,৩৬৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.