RFL

অভিমান

0

বদরুন নাহার পলী: শুনেছি এই সময়ে মেয়েদেরকে বাপের বাড়ি নিয়ে যায়। কত কী খেতে ইচ্ছে করে, মা রান্না করে আদর করে মেয়েকে খাওয়ান। মেয়েকে হাসি-খুশি পরিবেশে রাখতে চান, তাহলে নাকি সুস্থ স্বাভাবিক বাচ্চা হয়।

সৎ মা হলে বুঝতাম, আমার তো ঘরে নিজের মা আছেন, তাহলে নিতে আসেন না কেন? আমার যে আরও একটু সময় ঘুমাতে ইচ্ছে করে। এতো সকালে উঠলে মাথাটা কী যে হালকা লাগে। বমি বমি ভাব তো আছেই। রান্নাঘরের কাজ করার সময় মনে হয় লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ি। ক্ষুধায় অস্থির থাকি সারাক্ষণ। সবার খাওয়া না হলে তো খাওয়াও যাবে না।

কী যে করি!

বাবা-মা কিছুটা জোর করেই এখানে বিয়ে দিয়েছেন। মাত্র পাশ করে বের হয়েছি। ইচ্ছে ছিল চাকরি করবো, নিজের পায়ে দাঁড়াবো, তারপর বিয়ের কথা ভাববো। আমার পছন্দটা wrong number হয়ে গেছে কিছুদিন আগেই। সেই ধাক্কা কাটিয়ে উঠার আগেই বাবা-মা একটা বিয়ে ঠিক করে ফেলবেন ভাবিনি। হাজার যুক্তি দিয়েও বোঝানো গেল না বাবা-মাকে। এখনই নাকি বিয়ের উপযুক্ত সময়। পরের দিকে একদম নিষ্পৃহ হয়ে গেছি। ওরা যা ভালো বোঝে করুক।

নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের কারো যে স্বপ্ন দেখতে হয় না তা বোঝে গেছি। কতো কোত আর্থিক সমস্যার মুখোমুখি হয়েও পড়ালেখা শেষ করতে পেরেছি, কিন্তু এই আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হলো না।

– আমার বাবা-মা ভাইবোনের সাথে একসাথে থাকতে হবে।
– (এটা তো জানা কথাই, সব ছেলেই তাই চায়, এটা নতুন কোন কিছু না।)
– …
– …
– আপনার কিছু বলার নেই
– জ্বী না

দু’য়েকটা সিম্পটম দেখেই শ্বাশুড়ী তাঁর ছেলেকে বললেন, আমাকে ডাক্তার দেখাতে। ডাক্তারের দেয়া সুখবরে সারা বাড়িতে আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। অথচ নারী জীবনের সবচেয়ে গর্বের বিষয়, মা হওয়ার আনন্দ আমাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে না কেন?

আমার ভিতরে জন্ম নিবে একটা সম্পূর্ণ মানুষ, অথচ আমিই জানবো না কখন তার আগমন হবে! ঠিক আছে ওসব ভেবে লাভ নেই। এখন এই ছোট্ট প্রাণটাকে সুন্দর‭‭‬‬ করে লালন-পালন করতে হবে প্রচণ্ড ভালবাসা দিয়ে।

কী যে ক্ষুধা লেগেছে, কী করি? বিছানা থেকে ভারী শরীরটা নামিয়ে ডাইনিং টেবিল থেকে এক গ্লাস পানি খেয়ে এলাম। মনে হলো ঠাণ্ডা পানি শুধু পেটটা কেন, পুরো শরীরটাই ঠাণ্ডা করে দিল। কিন্তু ক্ষুধা যে যাচ্ছে না।

জীবনানন্দ দাশ, কোথায় গেলেন কবি? যখন আপনাকে আমার সবচেয়ে বেশি দরকার তখনই ছুটিতে যেতে হয়? একটু এসে আমাকে শুনিয়ে দিয়ে যান,

‘একটি নক্ষত্র আসে; তারপর একা পায়ে চ’লে
ঝাউয়ের কিনার ঘেঁষে হেমন্তের তারা ভরা রাতে
সে আসবে মনে হয়; – আমার দুয়ার অন্ধকারে
কখন খুলেছে তার সপ্রতিভ হাতে!
হঠাৎ কখন সন্ধ্যা মেয়েটির হাতের আঘাতে
সকল সমুদ্র সূর্য সত্বর তাকে ঘুম পাড়িয়ে রাত্রি হতে পারে
সে এসে এগিয়ে দেয়;
শিয়রে আকাশ দূর দিকে
উজ্জ্বল ও নিরুজ্জ্বল নক্ষত্র গ্রহের আলোড়নে
অঘ্রাণের রাত্রি হয়;
এ-রকম হিরন্ময় রাত্রি ইতিহাস ছাড়া আর কিছু রেখেছে কি মনে।
….’

আচ্ছা মকবুল ফিদা হোসেন কিভাবে আঁকতেন আমার এই আমিকে? শরীরের প্রতিটা বাঁক আজ মাতৃত্বের গর্বে গর্বিত। ২৮০ দিনের ঠিকানা আমার এই শরীর-মন, তারপর নিষ্ঠুর এই পৃথিবীতে আরো একটি মানব সন্তানের যোগদান। সবাই বলে ১০ মাস ১০ দিন, আর আমি হিসেব করে দেখি ৯ মাস ১০ দিন। কিভাবে কী হিসেব করে কে জানে?

– আজ সকালে ছোলার ডাল রান্না করে ফেল (শাশুড়ির কথায় জেগে উঠলাম।)
– জ্বী আচ্ছা

বদরুন নাহার পলী

ক্ষুধাটা আবার চনমনিয়ে উঠছে। আবার পানি।

– কয়জন কলিগকে বলেছি দুপুরের পর বাসায় খাওয়ার জন্য। মা’র সাথে আলাপ হয়েছে, ওই মতো রান্না করে রেখো।

‘রান্ধে বেটি কি আর চুল বান্ধে না?’ তাইতো! আমিই কি একমাত্র নারী যে বাচ্চার জন্ম দিচ্ছে? তাহলে পারবে না কেন? কিন্তু পারা গেল না যে! সব গড়বড় হয়ে গেল। কখন মাথা ঘুরে পড়ে গেছি জানিই না।

একটু গরম দুধ খাওয়ালো কে যেন।
–  একটু রেস্ট নিয়ে রান্নাটা শেষ করে ফেল, নইলে কলিগদের কাছে বেইজ্জত হতে হবে।
–  (কথা বলতেও ইচ্ছে করছে না এতো ক্লান্ত লাগছে। অথচ রান্নাটা শেষ না করলেও না।)
–  ১২ টার মধ্যেই সব শেষ হওয়া চাই
– (হালকা মাথাটা হঠাৎ রক্তে টইটুম্বুর হয়ে গেল।) পারবো না।
– কী?
– পারবো না
– তোর বাপ পারবে
– (কী বলে লোকটা? মাথা ঠাণ্ডা, মাথা ঠাণ্ডা)
– ১২ টার মধ্যেই সব রেডি চাই
– না পারলে কি করবে?
– চুল ধরে তোর বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেব।
– তাই দাও
– বাচ্চাটা হোক তারপর দেখ তোকে কোথায় পাঠাই।
– (অনেক গভীর একটা কুয়ায় পড়ছি। আর কতো গভীর? শেষ হয় না কেন? পানি আছে তো কুয়ায়? আচ্ছা পানিতে পড়লেও কি বাচ্চাটার ক্ষতি হবে? তাহলে আমি পিঠ দিয়ে পড়বো যাতে ওর কোন আঘাত না লাগে।)

লেখাটি ১,৫৯৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.