তবে কি মেরুদণ্ডহীন জাতিই রাষ্ট্রের কাম্য?

0

ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী: নতুন বছরে পাঠ্যপুস্তক – এখন টক অফ দ্য টাউন। ২০১৭ সালের পাঠ্যবইয়ে কী কী সংযোজন- বিয়োজন হয়েছে তা এতোক্ষণে কারোই অজানা নয়। পড়ালেখার নামে কোমলমতি শিশুদেরকে একটি অনুদার, সাম্প্রদায়িক চিন্তাভাবনার দ্বন্দ্বে ফেলে এভাবে গিনিপিগ বানানোটা গভীর উদ্বেগজনক বৈকি!

আমার দুই সন্তানকে বাংলা মাধ্যমে দিয়েছিলাম দুটো কারণে।

এক.  আমার মা বলেছিলো, ” বাংলা মাধ্যমেই দাও, ওদের সহজাত সারল্যটুকু অক্ষুণ্ণ থাকুক।”

দুই. পড়ালেখার খরচ সাধ্যের মধ্যে রাখতে চেয়েছিলাম।

এখনো মনে করি বাংলা মাধ্যমে পড়ানো ভুল হয়নি।  বাংলাকে “বোরিং সাবজেক্ট ” বলবে – এ কিছুতেই মেনে নিতে পারতাম না।

বাচ্চাদের পড়ানো ব্যাপারটা চিরকাল খুব উপভোগ করি আমি। ওদের বই উৎসব মানে আমার শৈশব খুঁজে ফেরা। প্রত্যেকটা বইয়ের ঘ্রাণ নেয়া, মলাট দেয়া – বুক লিস্ট মিলিয়ে বই- খাতা কেনা, জানুয়ারি মানেই আমার মহা ব্যস্ততা।

কোন কবিতাটা আমাদের সময় ছিল, নতুন কী সংযোজন – বিয়োজন হলো – এসব নিয়ে কন্যাদ্বয়ের সাথে বিস্তর আলোচনা। সেখানে দুই কন্যারই খুব প্রিয় পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে আসা  হুমায়ুন আজাদের “বই” কবিতাটি বাদ পড়ার কথা শুনে যারপরনাই মর্মাহত হয়েছি।

এছাড়া ষষ্ঠ শ্রেণির চারুপাঠে “রাঁচি ভ্রমণ”, “লাল গরু” বাদ পড়াটাও বোধগম্য হয়নি।

বাদ বাকি ভুল-ত্রুটির কথা তো বাদই দিলাম।

আমাদের সময় বিশেষ আকর্ষণ ছিল বাংলা বইয়ে গদ্য-পদ্যের সাথে শিল্পী হাশেম খানের দৃষ্টিনন্দন অলংকরণ। চোখ জুড়ানো সেইসব ছবির মধ্য দিয়ে আমরা সহজেই কবিতার প্রতিটি লাইনে প্রবেশ করতাম। তাই হয়তো বা শৈশবে বইয়ের পাতায় পড়ে আসা “আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে/ বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে”.. অথবা ,

” চুপচুপ ওই ডুব দ্যায় পানকৌটি/

দ্যায় ডুব টুপটুপ ঘোমটার বৌটি ” – লাইনগুলো স্মৃতিতে আজো অম্লান ।

আমরা চিনেছিলাম বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, পল্লী কবি জসীমউদ্দীন , মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত, ছন্দের যাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত।

কে হিন্দু কবি, কে মুসলমান, কে নাস্তিক কবি, কে ধর্মপ্রাণ – এসব অনর্থ বুঝিয়ে আমাদের মগজধোলাই করা হয়নি ভাগ্যিস!

কী ভয়ংকর দুরভিসন্ধি!

“আমাদের যুগে আমরা যখন খেলেছি পুতুলখেলা, তোমরা এ যুগে সেই বয়সেই লেখাপড়া কর মেলা “..

কবি সুফিয়া কামাল বেঁচে থাকলে কবিতাটা আজ কীভাবে লিখতেন কে জানে! নির্মল শৈশবের ছোট ছোট আনন্দময় মুহূর্তগুলোতো সেই কবেই হারাতে বসেছে মেলা লেখাপড়ার চাপে। এর সাথে আবার যুক্ত হয়েছে বিভ্রান্তিকর, ত্রুটিপূর্ণ  শিক্ষাব্যবস্থা।

কারো দেশপ্রেম বা ধর্মবিশ্বাসে আমি শ্রদ্ধাশীল।

কিন্তু একবার ইতিহাস বিকৃতি,  আরেকবার সাহিত্যের মধ্যে ধর্মীয় বিষয় টেনে এনে অহেতুক জটিলতা সৃষ্টি করতে গিয়ে – সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলাটা নিশ্চিতভাবে এক গভীর চক্রান্ত।

শিশুদের ভবিষ্যৎ তো ছেলেখেলা  নয়! তাহলে কেন এভাবে এক অন্ধকার অনিশ্চিতে তাদের ঠেলে দেয়া?

“শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড”। মেরুদণ্ডহীন একজন মানুষ যেখানে কোনোদিন আত্মমর্যাদা নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না, সেখানে গোটা শিক্ষাব্যবস্থার মেরুদণ্ডই যে ভেঙে দেয়ার পাঁয়তারা হচ্ছে! তবে কি মেরুদণ্ডহীন জাতিই রাষ্ট্রের কাম্য?

“আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে” যখন পাঠ্যবই থেকে বাদ পড়ে – তখন  “ও – তে ওড়না চাই”  বিষয়টাকে উ – তে উদ্দেশ্যমূলক ছাড়া কিছুই বলার নেই।

ধর্মান্ধতার রাজনীতি আর ব্যবসা থেকে শিশুদের পাঠ্যবই মুক্ত হোক।

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.