RFL

“আমি নারীবাদীও নই, পুরুষবাদীও নই, আমি মানুষবাদী”দের উদ্দেশ্যে

0

বৈশালী রহমান: হে মহান “মানবতাবাদী” সম্প্রদায়,

আপনারা বলেন, বিয়ের পরে আমাদের বউরে আমরা চাকরি “করতে দেবো”, কারণ আমরা “মহান”, আমরা “প্রগতিশীল”। আমরা “অধম” নারীবাদীরা বলি, ওহে “মহান” পুরুষ! তুমি তোমার স্ত্রীকে চাকরি “করতে দেওয়ার” কে হে? তোমার স্ত্রী পড়ালেখা করেছে নিজে, চাকরি পাবেও সে নিজ যোগ্যতায়। কাজেই অর্থ উপার্জনের পথও বেছে নেবে সে নিজ সিদ্ধান্তে। এইখানে তোমার কোনো কিছু করতে দেওয়া না দেওয়ার কথা আসছে কেন? তোমার স্ত্রী তো কখনো বলে না, “বিয়ের পরে আমার বরকে আমি চাকরি “করতে দেবো”, কারণ আমি প্রগতিশীল!” এই কথা বললেই সাথে সাথে আপনারা কেন ফাল পাড়েন এই বলে, “এঁ এঁ এঁ হ্ হ্, আইয়া পড়সে নারীবাদী!”

“উদারপন্থী মানবতাবাদী” গণ,

বিয়ের পর মেয়েরা শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে থাকতে না চাইলে আপনারা কতোই না অশ্রুবিসর্জন করেন, “অহো! কী নিষ্ঠুর নিচ রমণী! এইসব স্বাধীনচেতা নারীদের জন্য পুরুষের বাপ-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে বাস করতে হয়।” এই বৃদ্ধাশ্রম নিয়ে কতোই না আবেগী রচনা! কতো গান! এতসব আবেগের সমুদ্রে বেরসিকের মতো আমরা নারীবাদীরা বলে উঠি, “আচ্ছা, দুইটা প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বিয়ের পর নিজেদের মতো থাকতে চাইলে সমস্যা কোথায়? বিয়ের পর শুধু মেয়েদেরই শ্বশুরবাড়িতে যেতে হবে এই নিয়ম কোন হালার্পো বানাইছে? এই নিয়ম মানতে হবেই কেন? আর বৃদ্ধাশ্রম নিয়ে এত যে গান, কবিতা, এসবের মধ্যে শুধু ছেলের বাপ মায়ের কান্নাকাটির বিবরণ কেন? মেয়েরা যে নিজের বাপ মা ছেড়ে অন্যের বাপ মায়ের সাথে গিয়ে থাকছে, তাদের বাপ মায়ের কী হয় তবে? এদের কষ্টে আপনাদের আবেগের সমুদ্রে জোয়ার উঠে না কেন?” এসব বলতে গেলেই শুনি, “নারীবাদ ভালো, অতি নারীবাদ ভালো নয়”।

হে “মানুষবাদী”গণ,

আপনারা বলেন, “মাইয়া পুরুষ সমঅধিকার আমরাও মানি, তবে, কিন্তু, যদি, পরন্তু, মেয়েদের একটু আধটু কম্প্রোমাইজ করাই লাগে। বাচ্চার কথা চিন্তা করে কি পুরুষে কেরিয়ার ছাড়বে? আর বাসার কাজকর্ম পুরুষের ঠিক আসে না। ওইসব মেয়েদেরই ভালো মানায়। মেয়েরা আজকাল একটু “ছাড়” দিতে রাজি না বলেই আজকাল ডিভোর্স এত বেড়ে যাচ্ছে।”

আমরা শয়তান নারীবাদীগুলা তখন গিয়ে বলে উঠি, “ওহে আবালগণ। মেয়েরা কি আসমানি তরিকায় বাচ্চার জন্ম দেয়? বাচ্চার জন্ম দিতে পুরুষের স্পার্ম লাগে না? বাচ্চার শরীরে পুরুষের ক্রোমোজোম নাই? বাচ্চা পালা তাইলে শুধু নারীর দায়িত্ব হবে ক্যান? দুজনে সমভাবে বাচ্চার দায়িত্ব নিয়ে দুজনেরই কেরিয়ার ঠিক রাখলে সমস্যাটা কোথায়? আর সংসারের কাজ জিনিসটা শুধু মেয়েদের ঘাড়ে চাপবে, এই আবর্জনা নিয়ম আমরা মানবো ক্যান? নারী-পুরুষ দুজনে ঘরে বাইরে সমভাবে কাজ করবে, আমাদের কাছে তো মনে হয় এটাই মানানসই”।

তখন মানবতামারানিরা বলে উঠবে, “বাংলাদেশের নারীবাদীরা ফেমিনিজমের থার্ড গ্রেড, ফোর্থ গ্রেডে চইলা যাইতেসে রে, দুইন্না রসাতলে গেল রে, ওরে মাইয়াগুলা নারীবাদী কেন হয় রে, ব্লা ব্লা ব্লা”।

হে, “ব্যালান্স সৃষ্টিকারী” মানবতাবাদীগণ,

বৈশালী রহমান

নারী নির্যাতন নিয়ে কথা বললেই আপনারা কী সুন্দর করে ব্যালান্স করে বলেন, “পুরুষও তো নির্যাতিত হয়, তবে পুরুষ নির্যাতনের জন্যও পৃথক আইন হোক!” আমরা নারীবাদীরা এটা শুনে হো হো করে হাসি। বলি, “ওহে ব্যালান্সিং সুশীলগণ, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বাইশ হাজার নারীর ওপর জরিপ চালিয়ে ফলাফল পেয়েছে এই যে, প্রতি পাঁচজন নারীর মধ্যে চারজন নারীই পারিবারিক নির্যাতনের শিকার।

বিবিসি বাংলার জরিপে উঠে এসেছে, এদেশের আশি পার্সেন্ট নারী পারিবারিক নির্যাতনের ভিক্টিম। আবার ষাট পার্সেন্ট বঙ্গপুঙ্গবই স্ত্রীকে মারধর করাকে নির্যাতন মনে করে না। এর বাইরে, ধর্ষণ, ইভ টিজিং, এসিড সন্ত্রাস, যৌতুকের জন্য হত্যা করা এগুলো তো আছেই। “পুরুষ নির্যাতনের” পরিমাণ অন্তত নারী নির্যাতনের এক হাজার মাইলের ভিতর আসুক, তখন নাহয় এসব “ব্যালান্সিং” মারাবেন! আমি যদি এখন বলি, “হাতির পাছার ফুটা বিশাল বড়ো”, আর আপনি যদি বলে ওঠেন, “সুঁইয়ের পাছায়ও ফুটা আছে, ছোটো হলে কী হবে, তবু তো আছে!” তবে সেটা কেমন হাস্যকর হয়ে যায় না? এই কথা বলতে গেলেই “মানুষবাদী”রা বলেন, “বেডি পুরুষবিদ্বেষী”!

ওহে নারীবাদবিরোধী মানবতামারানি সুশীলগণ, নারীবাদ নিয়ে আপনাদের এলার্জির আসল কারণ জানতে চান? তবে শোনেন, আপনাদের “মানবববাদে” পুরুষ আছে, কুকুর আছে, বিড়াল আছে, গরু, ছাগল সবই আছে। শুধু নারী নাই হে, নারী নাই।

লেখাটি ৮৮৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.