সমানুভূতিশীল বন্ধুর বড্ড বেশি অভাব

0
 সেবিকা দেবনাথ: লুতুপুতু এবং নায়িকা শাবানা ও সন্ধ্যা রায় মার্কা (বারো মাইস্যা কান্দুনি ও অসহায়) মেয়েদেরই মানুষ পছন্দ করে বেশি। উহ্-আহ্ মার্কা সহানুভূতিশীল বন্ধু জুটলেও নারীর পাশে সমানুভূতিশীল বন্ধুর বড্ড বেশি অভাব। যে মেয়েটি একটু স্বাধীনচেতা তার চরিত্র হরণ করার জন্য রাবণের অভাব নাই এই সমাজে। ওই রাবণ পুরুষ ও নারী উভয়ের মধ্যেই আছে। 

যে মেয়েটি প্রচণ্ড ভিড়েও পুরুষের ধাক্কা উপেক্ষা করে সদর্পে হেঁটে যায়, তার দিকে ‘হা’ হয়ে তাকায় প্রায় সবাই। ‘বেটা মার্কা’ বা ‘মর্দা মাইয়া’ উপাধিও জুটে যায় তার। কথিত ইজ্জত ঢাকতে যে মেয়েটি বুকে ওড়না চাপায় না, তাকে বলা হয়, ‘পোলা পাগল করা মাইয়া’। এদের কারণেই নাকি ধর্ষণ বেড়ে যাচ্ছে।

যে মেয়েটি পুরুষ যাত্রীদের অনুগ্রহ না চেয়ে কোন প্রকার জড়তা ছাড়াই চলন্ত বাসে ওঠে যেতে পারে সেই মেয়েটিকে বাসের ড্রাইভার, হেলপার এবং অন্য যাত্রীরা বলবে, ‘কী করছেন আপনি!’ মেয়েটির নিরাপত্তা নিয়ে তাদের যতোটা না উদ্বেগ, মেয়ে হলেও পুরুষদের পেছনে ফেলে আগে উঠতে পেরেছে সে বিষয়ে তাদের বিস্ময় বেশি।

একজন আরেক জনকে বলবে, ‘দেখছেননি ভাই মহিলার কী সাহস?’ কেমনে লাফ দিয়া বাসে উঠলো? আমরাও তো পারি না’। আরেকজন মেয়েটির পক্ষ নেয়ার ছলে তাচ্ছিল্য ছুঁড়ে দিয়ে বলবে, ‘ভাই নারীরা আর নারী নাই। তারাই তো এখন দেশ চালায়’।

যে মেয়েটি হিজাব/ বোরকা পরে বাইক বা সাইকেল চালায়, তাকে দেখে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার চক্ষুই চড়ক গাছে ওঠে। তাদের ওই চক্ষু চড়ক গাছ থেকে নামায়ে আনতে মই বা বাঁশের দরকার হয়। তাদের ভাবখানা এমন যে হিজাব/ বোরকা পরে বাইক চালানো বেদাদি কাজকর্মের মধ্যে একটি।

রাস্তার বাজে ছেলেরা যে মেয়েটিকে দেখে অশ্লীল মন্তব্য ছুঁড়ে দেয়, সেই মেয়েটিই খারাপ বলে গণ্য হয়। যে মেয়েটি একটু সাজতে ভালোবাসে তাকে দেখে চট করেই দিয়ে দেয়া যায় ‘খারাপ মেয়ে মানুষের’ তকমা। যে মেয়েটি সারা জীবন একা থাকার বা বিয়ে করবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয়, তাকে ব্যর্থ প্রেমিকা বানায়ে তবেই শান্তি পান অনেকে। সহানুভূতির সুরে নানা অছিলায় জানতে চান কেন এই সিদ্ধান্ত নিলো।

যে মেয়েটি কাজকে ভালবেসে অফিসে একটু বেশি সময় দেয়, তার দিকে সন্দেহের চোখে তাকাবে অফিসের অনেকেই। জটিলা-কুটিলার মতো পরনিন্দাকারিরা বলবে, ‘বসের সাথে নিশ্চয়ই মেয়েটির কোনো সম্পর্ক আছে। তা না হলে অফিসে এতো সময় কী করে’?

মেয়েটি যদি হয় বিবাহিত তাহলে ভাববে, ‘মেয়েটির সংসারে শান্তি নাই। এজন্যই অফিসে পড়ে থাকে’।  

যৌতুকের কারণে যে ছেলের বোনটি সন্তানসহ স্বামীর বাড়ি ছাড়া হয়েছে, এবং ভাইয়ের /বাবার সংসারে থাকে, সেই ছেলেটিও সুযোগ পেলে তার স্ত্রীকে বলবে, ‘এটা কি তোমার বাপের বাড়ি থেকে আনছো? বাপের বাড়ি থেকে এনে পরে কথা বলো।’

স্বামীর সাথে যে মেয়ের বোঝাপড়াটা ভালো, সেই মেয়ের কাছে অনেকেরই প্রশ্ন, ‘কী দিয়ে সে স্বামীকে বশ করেছে’! অনেকে বলবে, ‘জামাইরে মাইট্টা সাপের মাথা খাওয়াইছে। তাইতো বৌ ছাড়া কিছু বোঝে না। বৌয়ের ওপর দিয়া কথা কয় না।’

জানি এসব তুচ্ছ বিষয়। তবুও কষ্ট হয়। নারীর প্রতি পদে পদে কত প্রতিবন্ধকতা, কত কটূ কথা। ছোটবেলায় পাটিগণিতে চৌবাচ্চার একটা অংক ছিলো। যে চৌবাচ্চায় একটি নল দিয়ে জল ভর্তি হতো আর কয়েকটি নল দিয়ে সেই জল বের হয়ে যেতো। অংকে কোনকালেই ভালো ছিলাম না আমি। এখনও পৌনে, সোয়া, আড়াইয়ের হিসাব চট করে ধরতে পারি না। তবে আমার কেন যেন মনে হয় আমাদের মেয়েদের অবস্থা ওই চৌবাচ্চার মতোই।

নারী দু’হাতে আঁধার ঠেলে সামনে এগুচ্ছে, আর সহস্র হাত নারীকে ঠেঁলে দিতে চাইছে আরও অন্ধকারের দিকে।

লেখাটি ৯৩২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.