RFL

চরমোনাই পীরের হুমকি ও পাঠ্যবইয়ের ভুল, কে দেবে মাশুল?

0

জান্নাতুন নাঈম প্রীতি: একটা সংবাদে চোখ আটকে গিয়েছিল, সেটা হচ্ছে-পাঠ্যবইয়ের ভুল নিয়ে সংবাদ প্রকাশ: গণমাধ্যমকে চরমোনাই পীরের হুমকি। আমার জানামতে এদেশে পীরদের কাজ ওয়াজ-টোয়াজ করা, অশিক্ষিত লোককে ধর্ম নিয়ে টিপস দেওয়া, মাঝে মাঝে ধর্ম পুঁজি করে ব্যবসা খুলে বসা। সর্বোপরি মানুষের বিশ্বাস নিয়ে ছিনিমিনি খেলা। সেই পীর হঠাৎ পাঠ্যবই নিয়ে মাতম শুরু করলো কেন? সংবাদমাধ্যমকে হুমকিই বা দেওয়া শুরু করলো কেন? ঘটনাটা কী?

তো, হুমকির রহস্য হচ্ছে, এবছর পাঠ্যবইয়ে প্রচুর ভুল এবং পরিবর্তন ঘটায় এর প্রতিবাদ চলছে সর্বত্র। জানা গেছে, হেফাজতে ইসলাম নামের দলটি যেসব লেখার তালিকা দিয়ে বলেছিল- সেগুলো পাঠ্যবই থেকে সরিয়ে ফেলতে, তাদের কথামতো সেগুলোই দূর করে দেওয়া হয়েছে! এই অবিশ্বাস্য কাজটি ঘটিয়েছে স্বয়ং শিক্ষাবোর্ড! আর তার প্রতিবাদে যেহেতু মুখর হয়েছে মিডিয়া, তাই সেখানে হুমকিমূলক বার্তাটি পাঠিয়েছেন জনাব পীর সাহেব। তাদের আঁতে ঘা লেগেছে প্রতিবাদের আওয়াজ শোনে।

প্রথমে পাঠ্যবইয়ের অক্ষর জ্ঞান পরিচয় পর্বেই ও-তে ওড়না ছাপা হওয়ায় তা নিয়ে মূল বিতর্ক শুরু হয়। ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে আরও ভুল, তথ্য ভুল, বানান ভুল, ইচ্ছাকৃত সংযোজন-বিয়োজন, আর সেইসাথে গরম হতে থাকে সোশ্যাল মিডিয়া, যদিও এখন পর্যন্ত দেশের সুশীল সমাজ নীরব। তারা হয় কুম্ভকর্ণের ঘুম দিয়েছেন, নয়তো বলতেই হবে যে, ভাতা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আতংকে আছেন। নইলে দেশের এরকম বিপন্ন সময়ে তাদের এমন নির্লিপ্ততা, ঠিক মেনে নেয়া যায় না।

৩ জানুয়ারি ফেসবুকে লেখক হুমায়ূন আজাদের ছেলে অনন্য আজাদের স্ট্যাটাস দেখে বুঝলাম বড় কোনো গড়বড় ঘটে গেছে এদেশের পাঠ্যবইয়ে। অনন্য সেখানে জানিয়েছেন- হুমায়ূন আজাদের ‘বই’ কবিতাটি পঞ্চম শ্রেণীর পাঠ্যবই থেকে দূর করে দেওয়া হয়েছে। এরপর নানাজনের নানান পোস্ট আর পত্রপত্রিকায় আলোচনা সমালোচনার বদৌলতে জানা গেলো যে, শুধু হুমায়ূন আজাদের কবিতাই নয়, বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠ্যবই থেকে দূর করে দেওয়া হয়েছে বাংলাসাহিত্যের কিংবদন্তী লেখক কবিদের গল্প-কবিতা- প্রবন্ধ আর অহেতুকভাবে কোনো কারণ ছাড়াই টেনে আনা হয়েছে ধর্মীয়, স্পেসিফিকভাবে বলতে গেলে ইসলাম ধর্মীয় বিষয় আশয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে বাংলাশিক্ষণ আর সাহিত্যের বই পড়ে মনে হচ্ছে- ধর্ম বই!

৭ জানুয়ারি কালের কণ্ঠে প্রকাশিত আজিজুল হকের ‘পাঠ্যবইয়ে এসব কী’ শীর্ষক প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানা গেলো ঘটনা ভয়াবহ। চলতি বছর জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের অধীনে বিতরণ করা প্রাথমিকের পাঠ্যবইয়ে ‘ও’তে ওড়না লিখে নারীকে হেয় করার মানসিকতা দেখানো হয়েছে, আবার ভুলে ভরা বইয়ে লেখা হয়েছে- ছাগল গাছ থেকে আম খায়! শুধু প্রাথমিকের বই নয়, অন্যান্য ক্লাসের বইয়ের দশাও তেমনি। কোথাও কোথাও আরও মারাত্মক। যেমন-

১। দ্বিতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ে ‘সবাই মিলে করি কাজ’, তৃতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ে ‘খলিফা হযরত আবু বকর (রা.)’, চতুর্থ শ্রেণির বাংলা বইয়ে ‘খলিফা হযরত ওমর (রা.), পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ে ‘বিদায় হজ’ ও ‘শহিদ তিতুমীর’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

২। পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ে কবি গোলাম মোস্তফা রচিত ‘প্রার্থনা’ কবিতার পরিবর্তে কবি কাদের নওয়াজ রচিত ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বাদ দেওয়া হয়েছে হুমায়ুন আজাদ রচিত ‘বই’ কবিতা।

৩।ষষ্ঠ শ্রেণির বাংলা পাঠ্যপুস্তক চারুপাঠ থেকে এস ওয়াজেদ আলীর ‘রাঁচি ভ্রমণ’ বাদ পড়েছে। যুক্ত হয়েছে সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘নীল নদ আর পিরামিডের দেশ’। সানাউল হকের কবিতা ‘সভা’ বাদ পড়েছে, যুক্ত হয়েছে জসীমউদ্দীনের ‘আসমানী’। আনন্দপাঠ থেকে বাদ পড়েছে সত্যেন সেনের গল্প ‘লাল গরুটা’, যুক্ত হয়েছে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র ‘সততার পুরস্কার’।

জান্নাতুন নাঈম প্রীতি

৪। নবম শ্রেণীর বাংলা বইয়ে বাদ পড়া ভ্রমণ কাহিনীটি হচ্ছে সজীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পালামৌ’ এবং কবিতা হচ্ছে জ্ঞানদাসের ‘সুখের লাগিয়া’, ভারতচন্দ্রের ‘আমার সন্তান’, লালন শাহর ‘সময় গেলে সাধন হবে না’, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘স্বাধীনতা’ ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সাঁকোটা দুলছে’। যুক্ত হয়েছে শাহ মোহাম্মদ সগীরের ‘বন্দনা’, আলাওলের ‘হাম্দ’, আব্দুল হাকিমের ‘বঙ্গবাণী’, গোলাম মোস্তফার ‘জীবন বিনিময়’ ও কাজী নজরুল ইসলামের ‘উমর-ফারুক’।

৫। প্রথম শ্রেণির বাংলা বইয়ে বর্ণ পরিচয়ে ‘ও’তে ‘ওড়না চাই’ বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক উঠেছে। জেন্ডারের সমতার বিষয়টি এখানে লঙ্ঘিত হয়েছে। একজন শিশু কেন ওড়না চাইবে? অথবা ওড়না নামক পোশাকটি দিয়ে পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কি বলতে চাইছে?

৬। তৃতীয় শ্রেণির হিন্দু ধর্ম শিক্ষা বইয়ের শেষ পৃষ্ঠায় ইংরেজি নীতিবাক্য লেখা হয়েছে ভুল বানানে। কাউকে কষ্ট দিও না-র ইংরেজি লেখা হয়েছে,  DO NOT HEART ANYBODY.

৭। তৃতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ে কুসুমকুমারী দাশের ‘আদর্শ ছেলে’ কবিতায় ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে’র বদলে লেখা হয়েছে ‘আমাদের দেশে সেই ছেলে কবে হবে’। কবিতার চতুর্থ লাইনে ‘মানুষ হইতে হবে-এই তার পণ’-এর ‘হইতে’ শব্দটিকে পাল্টে লেখা হয়েছে ‘হতেই’। নবম লাইনে ‘সে ছেলে কে চায় বল কথায়-কথায়’-এর ‘চায়’ শব্দটির বদলে লেখা হয়েছে ‘চাই’। পঞ্চদশ লাইনে ‘মনে প্রাণে খাট সবে শক্তি কর দান’-এর ‘খাট’ এর বদলে লেখা হয়েছে ‘খাটো’। আর কবিতাটির একাদশ থেকে চতুর্দশ লাইনই উধাও।

দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা বই থেকে ২০১২ সালে যে বিষয়গুলো বাদ পড়েছিল তার সবই আবার ফিরে এসেছে ২০১৭ সালের সংস্করণে।  আবার ২০১২ সালের বইয়ে নতুন যে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল সেগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, এই পরিবর্তনের ফলে অঘোষিতভাবেই পাঠ্যপুস্তকে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে প্রণীত শিক্ষাক্রম আবার চালু হলো!

২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এসে ২০০৩ সালে পাঠ্যপুস্তকে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। প্রতিটি শ্রেণির বাংলা সাহিত্যের বইয়ে ধর্মীয় বিষয় ও ভাবধারা যুক্ত করা হয়। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে পাঠ্যপুস্তক সংস্কারের কাজ শুরু হয়। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণয়ন করে। এর আলোকে নতুন পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ করা হয় ২০১২ সালে, যা শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছায় ২০১৩ সালে। তখন বলা হয়েছিল, বাংলা বিষয়কে সাহিত্যসমৃদ্ধ এবং সর্বজনীন করার জন্য ধর্মীয় বিষয়গুলো সরিয়ে ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষাসহ অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় বইয়ে স্থান দেওয়া হয়েছে। এখন সেগুলিই ফিরিয়ে আনা হয়েছে!

অর্থাৎ, বাংলা সাহিত্যকে তার চিরচেনা গণ্ডি থেকে ছাড়িয়ে ‘ধর্মীয় সাহিত্য’ বানিয়ে ফেলার একটি প্রয়াস দেখা যাচ্ছে। কিন্তু কেন? এই প্রশ্নের উত্তরটা কেউ দেবেন কি? আরও বলবেন- বাঙালির সংস্কৃতিকে বারবার ধর্মীয় প্যাকেটে মোড়ানোর অকাজটা কেন এবং কারা করে? উত্তর দিন!

আজ পাঠ্যপুস্তকে সাহিত্যের চেয়ে সাহিত্যিকের ধর্ম প্রধান হয়ে গেলো? তাহলে কাল যে জাতীয় সঙ্গীতের চেয়ে জাতীয় সঙ্গীত রচয়িতার ধর্ম প্রধান হয়ে যাবেনা তার গ্যারান্টি কি?

তখন কি পাকসার জমিন ফিরে আসবে? অবিভক্ত পাকিস্তান ফিরে আসবে?

১৯৭১ বাতিল হবে?

৩০ লক্ষ শহীদ? এক কোটি শরণার্থী? আড়াই লাখ ধর্ষিতা মা-বোন?…এদের কি হবে?   

জবাব দিন! চুপ করে থাকবেন না!  

 

লেখাটি ১,০৪৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.