RFL

মানবিকতার অনুশীলনে চাই ধর্মীয় উদারতা

0

শিল্পী জলি: আমেরিকা আসতেই এক বাঙালী বাবার মন্তব্য, ”এখানকার ছেলেপেলেদের যে প্রশ্নই করা হয় বলে, I don’t know… তাদের সাধারণ জ্ঞান বলতে কিছু নেই !”
অবাক হয়ে তাকাই — ভাবি, বিশ্বের সেরা দেশ আমেরিকা, তাঁদের সাধারন জ্ঞান না থাকলে চলবে কেন?
কিছুদিন যেতেই বান্ধবী বলে, ”আমেরিকার ছেলেপেলে শুধু জানে কাজ করতে, মদ খেতে, আর সেক্স করতে… বিশ্বের দরবারে কী ঘটলো, না ঘটলো সেসব নিয়ে তাদের কোন মাথা ব্যথা নেই… ফুরসৎ কই? ”

আমেরিকায় আঠারো বছর পর্যন্ত পড়ালেখা ফ্রি। অতঃপর আঠারো হতেই বাবা-মা ঘর থেকে বের করে দেন– যাও নিজে করে খাও। তখনও যারা ঘর ছাড়তে পারে না, তারা বাবা-মাকে রেন্ট দিয়ে কিছুকাল থাকে। নইলে আত্মসম্মান থাকে না। মনে করা হয়, একে দিয়ে আর কিছু হবে না। ওদিকে পড়ালেখার খরচও এতো বেশি যে নিজের আয়ে থাকা-খাওয়া চালিয়ে দীর্ঘসময় পড়ালেখায় মোটিভেটেড থাকা মুশকিল হয়ে পড়ে। আশি/নব্বই/একশ হাজার ডলার লোনের ধাক্কা। তাই অনেকেই ঐ পথে দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে না। বরং যে কোনো একটি কাজে ঢুকে গিয়ে পার্টনার জুগিয়ে নেয়, সেক্সজীবন শুরু করে দেয়। এই ধারাতে পড়ে বেশির ভাগের বাবা-মা-ই আর কলেজের মুখ দেখতে পারে না। তাই যারা পড়তে যায় তাদেরকে উৎসাহিত করতে অনেক কলেজই নানা রকম বৃত্তি দিয়ে থাকে।

শিল্পী জলি

তার একটি হলো, শিক্ষার্থীর বাবা-মা কলেজের মুখ দেখেনি বিধায় বৃত্তি। তারপরও পড়ায় শেষ পর্যন্ত টিকে থাকা কঠিন- পাঁচ/ ছয়/সাত বছর। কাজে বা পড়ায় নো ফাঁকি, জীবন মানে ঘুমহীন ঘোড় দৌঁড়। ওদিকে কলেজ ভেদে রেজাল্ট বি বা সি এর নিচে গেলেই বৃত্তি এবং লোন বাতিল। বি মানে প্রতি বিষয়ে ৮৫-৯০ আর সি মানে ৮০-৮৪। একটু এদিক-ওদিক হলেই পুরো খাদে, টেকা মুশকিল।

যদিও আমেরিকার ছেলেপিলেরা সময়ের আগে বড় হয়। এক/দেড় বছরে বাচ্চা নিজের হাতে নিজে খেতে শেখে, আর তিন বছরের মধ্যেই সবাই নিজের জামাকাপড় পরা শিখে ফেলে, তারপরও…।

এখানে পড়ালেখার গতি চলে ঝড়ের বেগে। বছরের পর বছর দিনরাত চব্বিশ ঘন্টা পড়ে মুখস্ত করে পরীক্ষায় সরাসরি উগ্রে দেয়া নয়, বরং তাৎক্ষণিকভাবে দ্রুততার সাথে পড়ে ক্রিটিক্যাল চিন্তার মাধ্যমে বিষয়ের গভীর রহস্য উদঘাটন করা। বিষয়বস্তুও তেমনই, আসল উত্তরটিই হয়তো তথ্যে স্পষ্ট করে উল্লেখ নেই। সেইসাথে থাকে ক্লাস এবং কাজের শেষে নিয়মিত হোমওয়ার্ক জমা দেয়ার চাপ।

শিশুকাল থেকেই হাতেকলমে সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে শিক্ষা অর্জনের কারণে শিক্ষার্থীরা কাজে- কর্মে, বাস্তবতায়, ভদ্রতায়, দ্রুততায়, রিক্স টেকিং, টেস্টিং, টাইপিং, সৃষ্টিশীলতা, এবং উদ্ভাবনীতে দক্ষ হয়ে ওঠে, যদিও দীর্ঘসময় অনুশীলনের সুযোগ না পেয়ে গণিতে বেশীর ভাগই কাঁচা থেকে যায়। তবে অন্য বিষয়গুলোতে তাদের দক্ষতা থাকে। 

কিছুদিন আগে পড়লাম, বাংলাদেশে আমেরিকার আইডিয়া থেকেই নাকি মেয়েদের বিয়ের বয়স নামিয়ে আনা হয়েছে। সেই সাথে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়া হয়েছে, তারা পারলে আমরা কেন পারবো না?

প্রথমতঃ বাড়তি গড়ন, পুষ্টি, নিরাপদ সেক্সলাইফ সম্পর্কিত এড্যুকেশন সরবরাহ এবং নিয়মিত ফিজিক্যাল এ্যক্টিভিটির কারনে আমেরিকান মেয়েদের কম বয়সেই শরীর এবং মন পরিণত হয়ে যায়। ফলে অনেক কিছুই তারা আমাদের চেয়ে ভালোভাবে হ্যান্ডেল করতে পারে। তাই ওদের দেখে আমাদের দৌঁড় দেয়া চলে না। 

আমেরিকায় ছেলেমেয়ে দু’জনার বয়সই যদি আঠারো বছরের নিচে হয় তবে উভয়ের সম্মতিক্রমে সেক্সে কোন সমস্যা নেই। এ হেন পরিস্থিতিতে সন্তান হলে বিয়ে হলো কী, না হলো সেটা তেমন গুরুত্বপূর্ণও নয়–প্রয়োজনে সন্তানের দায়িত্ব রাষ্ট্রই বহন করবে। তবে আঠারো বছরের কেউ আঠারো বছরের নিচের কারও সাথে সম্মতি নিয়ে সেক্স করলেও রেপ কেসে পড়ে যেতে পারে। তাই এখানে অপরিণত বয়সী কাউকে বয়স্ক কেউ ফুসলিয়ে প্রতারণা করতে পারবে না। তারপরও অনেক স্টেটই ফাইট করছে যেন ছেলেমেয়ে উভয়ের বিয়ের বয়সই কমপক্ষে আঠারো হয়। সেখানে আমরা কেন প্রতিষ্ঠিত আইন থেকে সরে গিয়ে পেছনের দিকে হাঁটবো?

ছোটবেলায় বাবাকে দেখতাম যে দাওয়াতে একসাথে বউ-ছেলেমেয়ে নিয়ে খেতে বসতে পারতেন না, সেই দাওয়াত থেকে না খেয়েই বাসায় ফিরে আসতেন। আমেরিকায় এসে দেখলাম, দাওয়াতে যেতেই নারীপুরুষগণ সুড় সুড় করে আলাদা রুমে ঢুকে যান, অতঃপর পরস্পরের সাথে ইশারা-ইংগিতে কথা বলেন। বরবঁধূ যতো আধুনিকই হোন না কেন, বাচ্চা পেটে আসতেই মা হিজাব ধরেন আর বাবা মসজিদে দৌঁড়ান– ভয় একটিই, সন্তান যেন বিয়ের আগে সেক্স ঘটিয়ে না ফেলে। তারপরও হয়তো শেষ রক্ষা হয় না।

সন্তান বুঝে যায় এই ধর্মভীরুতা উদ্দেশ্য প্রণোদিত–ধর্মীয় মিঠাসের অনুপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়। সভায় সভায় চলে পরনিন্দা, পরচর্চা… কোন ভাবি ঘরেতে রান্না করে কী, করে না…। এই আদর্শহীন ধর্মভীরুতার প্রদর্শন লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়। বাড়াবাড়ি দেখে সন্তান হয়তো ভাবে, বাবা-মা চায়-ই না আমার জীবনে ইহজগতে বৈধ সেক্সও ঘটুক। অতঃপর হয়তো এক বিদেশীর সাথেই গাট বাঁধে…যারা আবার সেক্স না করে বিয়ের বন্ধনেই আবদ্ধ হয় না।

যে সন্তান পেট থেকে বের হয়, সেও যে সময়ের সাথে সাথে বাবা-মাকে জাজ করতে শেখে, ভুলে গেলে চলবে কেন ?

ধর্মীয় উদারতাই ধর্ম প্রতিষ্ঠার চাবিকাঠি, যার জন্যে দরকার জাতি, বর্ণ, ধর্ম ভেদাভেদ ভুলে মানবিকতার অনুশীলন।
ধর্মীয় উগ্রতা বা বাড়াবাড়িতে সংশ্লিষ্ট ধর্মের মানুষও পাশ কাটায়।

লেখাটি ৮৪১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.