RFL

শিক্ষার পূর্ব-পশ্চিম এবং আমার মেয়েরা

0

শামীম রুনা: ওতে ওড়না, এটা লইয়া কয়দিন ধইরা দেশের অবস্থা খুব কাহিল। ওতে ওড়না হোক, আর ওল হোক, কী আসে যায়! এমন তো না আমাদের ক্লাশ ওয়ানের বাচ্চারা ওড়না চিনে না। বাসার কলিংবেল বাজলে আমাদের বাচ্চারা প্রথমে ওড়না নিয়া ছুটে মার গলায় ঝুলানের লাইগা। ভূমিকম্প হইলে মেয়েদের ঘর থাইকা বাইর হইতে সময় লাগে, ওড়না খুঁজতে খুঁজতে, কেননা জীবনের চেয়ে ওড়নায় বুক ঢাকার মূল্য বেশি।

এর আগে ক্লাশ থ্রি এর বইয়ে শাপলা হাতের ছোট মেয়ের পা পাজামায় ঢাকা পরছিল, তখনও হাউকাউ হইছিল, তখনও শিক্ষা ব্যবস্থার মাথারা এরকমভাবে কানে তুলা দিয়া ছিল, কয়দিন পর হাউকাউ বন্ধ হয়া গেসিল এবং বাচ্চারা ওদের বয়সী একটি  মেয়েকে দেখছিল যে পাজামায় পা ঢাইকা শাপলা তুলতে যায়।

ঢাকা শহরের ক্লাশ টু-থ্রি এর মেয়েদের ড্রেসের সঙ্গে ম্যাচিং হিজাব পরাইয়া স্কুলে পাঠানো হয়, তখন কোনো দোষ হয় না, খালি হুজুরদের সুপারিশে নাহিদ সাহেব ওতে ওড়না বললে সমস্যা‍!

আর ক্লাশ থ্রিতে যখন একটি বাচ্চা পড়ে তখন তার বয়স সাত কী নয় থাকে, সাত কী নয় যাই হোক, বয়সটা কিন্তু ডেন্জারাস, তার নজির আমরা শিশু নির্যাতনের মতো ভয়ঙ্কর সব ঘটনার মাধ্যমে দেখতে পাই।

ওই বাচ্চার পা দেখে কার মধ্যে কী মতলব আসে, তার চেয়ে পায়জামা পরায়া দেওয়া ভালো। আমাদের অবস্থা হইসে উটপাখীর মতো, বালিতে মুখ গুঁইজা ভাবি আমি কাউরে দেখি না, তাই কেউ আমারে দেখতেসে না। আর সামনের বছর বই এর পাতায় অবশ্য লেখা উচিত পতে পায়জামা, আমি পায়জামা চাই।

এবার অন্য একটি প্রসঙ্গ, আমাদের দেশ কিন্তু উন্নয়নের পথে খরগোশের মতো ঊর্ধ্বগতিতে দৌঁড়াইতেছে ডানে বাঁয়ে কারোর দিকে না তাকায়া। উন্নয়নের অংশ হিসাবে, শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতির জন্য প্রতি বছর ফ্রি বই দিতেছে। যারা ফ্রি বই দিতেছে তারা মনের মাধুরী মিশায়া অনেক কিছু বইতে লিখতে পারে। মনের মতো জন্তু জানোয়ারের ছবি দিয়া বই সাজাতে পারে। বাসার ছাদে পোল্ট্রি বানায়া রয়েল বেঙ্গল টাইগার পালনে উজ্জীবিত করতে পারে পোলাপানদের।

আফটার অল, দেশটা  তাদের, তাও বইতে জানায়া দিসে। যে শিশুরা শিখবে ‘ছাগল গাছে উঠে আম খায়’, বা Do not heart anybody, সেসব শিশুদের ভবিষৎ কী? এগুলা শিখানোর পর অবশ্যই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হইয়া যায় পরীক্ষার আগের রাইতে প্রশ্নপত্র আউট করানোর। নাইলে জিপিএ ফাইভের কেম্নে কী হইবো?  

শিক্ষা ব্যবস্থা খারাপ করতে করতে এমন কইরা ফেলাইছে, পাঠ্যবইতে এত নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার করা হয়  ছাত্রছাত্রী অনেক সাবধানে নাড়াচাড়া করার পরও দেখা যায় একটা বই ছয় মাসের বেশি টিকে না। তখন অভিভাবকদের বাধ্য হইয়া চোরাই বই কিনতে হয়, নয়তো ফটোকপি করাইতে হয়।

শামীম রুনা

আমি নিজে প্রতি বছর এই কাজ করছি। আবার এসব বইয়ের প্রিন্ট নাকি পুরোটা বাংলাদেশে হয় না, ভারত থাইকা ছাপায়া আনা হয়! এইসব রদ্দি মালের জন্য ভারতরে এত ব্যবসা দেওনের মানে বোঝার ক্ষমতা আমাদের নাই।

আমার মেয়েদের স্কুল থেকে বই দেওয়া হইছে, নতুন বই নয়, বেশ পুরোনো। ওদের আগে অনেকে ব্যবহার করছে, পেন্সিলে লেখা কয়েকজনের নাম এবং লাইব্রেরি কার্ডের মতো সামনের পৃষ্ঠায় যাদের নামে এই বই ইস্যু করা হইছিল, তাদের নামের লিস্ট আছে। ইউরোপের দেশগুলাতে বিনামূল্যে বই, ল্যাপটপ, সারফেস, খাতা, পেন্সিল, ইরেজার, সার্পনার সবই দেয়া হয়। তবে এক সেট বই হয়তো দশ বারো বছর চলে, নতুন এডিশন না আসা পর্যন্ত। শক্ত বাঁধাই, সিল্কি মোটা পাতার রঙচঙে ছবিতে ঠাসা বইগুলারে রূপকথার বইর মতো লাগে।

দুঃখের বিষয় পুরা বই তন্ন তন্ন কইরা খুঁইজা আর্না সুলবার্গের ছবি দেখলাম না, এইসব দেশে মনে হয় উন্নয়নের জোয়ার আসতেছে না।

আমার মেয়েরা বললো, ওদের স্কুলে বেস্ট স্টুডেন্ট সিলেকসন হবে। আমি বললাম, আমাদের মিস্ হলিক্রস, মিস্ প্রিপারেটরির মতো? ওরা বলে, অনেকটা। তবে পুরোপুরি না। পুরোপুরি না কেন? ওরা বলে, শুধু স্টাডির ওপর ডিপেণ্ড করা হবে না। ব্লণ্ডি হেয়ার, ব্ল্যাক হেয়ার, টল স্টুডেন্ট, স্পোর্টসি স্টুডেন্ট ব্লা ব্লা ব্লা আর গ্রেট কাপল্। আমি চোখ গোল করে জানতে চাইলাম, তোরা তো স্কুলে পড়িস, তাই না? এখানে কাপল্ আসলো কোত্থেকে?

সো হোয়াট মাম্মা? দিস ইজ ইউরোপ।

তারপরও আমি মুখ চুন করে আছি দেইখা মেয়েরা বলে, মাম্মা আমাদের দেশেও তো স্কুলের ছেলেমেয়েরা লুকিয়ে প্রেম করে। সবাই জেনেও জানো না। আর এদেশে ওরা লুকায় না দেখে তোমার মানতে সমস্যা হচ্ছে।

ওদের দিকে তাকায়া মনে হইলো, মেয়েরা কী চমৎকার সত্য কথাটা আমারে শুনায়া দিলো! আর শিক্ষা খালি পাঠ্যবই থাইকা হয় না, প্রতিনিয়ত বদলাইতে থাকা সমাজ থাইকাও শিখনের আছে।

আমার মেয়ের ক্লাশ নাইনের পাঠ্য Samfunn বা সমাজ বিজ্ঞান বইর প্রচ্ছদ সবাইর সঙ্গে শেয়ার করলাম।

লেখাটি ৭৭৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.