RFL

ওড়না একটি সাম্প্রদায়িক পোশাক

0
জিনিয়া চৌধুরী: “ও”তে ওল। ওল খেওনা ধরবে গলা। ছোটবেলা থেকে নারী-পুরুষ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে বর্ণ পরিচয়ে এই বর্ণে এমন বাক্য পড়ে অভ্যস্ত ছিলাম। আর এবার যখন বর্ণ পরিচয়ের মতো বইয়ে একেবারে ফুলের কুড়ি বাচ্চাদের  “ও”তে ওড়নার মতো একটা বিশেষ ধরনের পোশাক শেখানোর প্রচেষ্টা চলছে, নীরবে শিশুদের মস্তিষ্কে চলছে সাম্প্রদায়িক আগ্রাসনের বীজ বপন, তখন আমাদের নারীবাদী নারীরা তাদের সমস্ত প্রতিবাদ উগড়ে দিচ্ছেন কেবল অনলাইন আর্টিকেলে, আটকে আছেন পত্রিকাগুলোর বিশেষ সংখ্যায়। সেক্ষত্রে শিক্ষিত, সচেতন, প্রগতিশীল নারীদের একটা জোরালো ও সুসংগঠিত আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছি।
হ্যাঁ, ওড়না প্রাথমিকভাবে একটি মামুলী শব্দ মনে হলেও এর ভার অনেক, এই জিনিস দিয়ে নারী নামক আরেক বিশেষ সম্প্রদায় তাদের একটা বিশেষ অঙ্গের হেফাজত করে থাকে। সেক্ষেত্রে আরো কিছু নুতন শব্দ আছে যা বর্ণপরিচয়ের বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করার জোর দাবি জানাই, যেমন, ব -তে বোরকা, হ এ হিজাব, র-ফলাতে ব্রা, প-তে পেটিকোট।

জিনিয়া চৌধুরী

যে দেশের অধিকাংশ নারী বস্ত্রহীনতায় ভোগে, সেখানে কাপড়ের ওপর অতিরিক্ত কাপড় পরিধান কেবল দৃষ্টকটুই নয়, এতে নারীকে নিয়ন্ত্রণের নতুন মাত্রাও যোগ হয়। শুধুমাত্র ওড়নাই নয়, অ-তে অযু, আ-তে আল্লাহ, এসব কী অর্থ বহন করে, তা সহজেই বোধগম্য।

বিজ্ঞানের আলোকিত যুগে যেখানে মানুষ এগিয়ে যাচ্ছে সভ্যতার শীর্ষে, তখন নারীর অতিরিক্ত আচ্ছাদনের অর্থই শরীর নিয়ে অযথা ব্যস্ত হওয়া, সচেতন হওয়া, সতর্ক করা, লোভনীয় করা। নারী শরীর কি খাবার যে কুকুর-বিড়াল-মাছি মুখ দিতে পারে বলে ঢেকে রাখতে হবে? যাদের সমস্যা হয় নারী শরীর নিয়ে, তারা নিজেরাই নিজেদের চোখ এবং মানসিকতা দুটোই ঢেকে রাখুক না।
এতোটা বিচার বিশ্লেষণে গেলে হয়তো আবার, আমারই পাশের,বা কাছের প্রগতিশীল বন্ধুটিই ফুঁসে উঠবেন। মেয়ে মানুষের আবার ওতো পাব্লিকলি ব্রা, পেন্টির মতো শব্দ কপচানোর দরকার কী? তসলিমা নাসরিন হইতে চাস?
হ্যাঁ, তসলিমা নাসরিন একটা গালি, তসলিমা হওয়া যাবে না, পুরুষের বিশেষ অঙ্গের সাধনা করা যাবে, রাতব্যাপী উপোস করে ভোরে উঠে দুধও ঢালা যাবে সেই লিঙ্গে, কিন্তু নারীর ওপর অযাচিত প্রয়োগের প্রতিবাদ করা যাবে না।
অসাম্প্রদায়িক চেতনা থেকে গড়ে ওঠা একটি দেশে যখন আমরা অ-তে অজগর আর আ-তে আম পড়ে বড় হয়েছি, সেখানে এখন- যখন চুপিসারে বাসা বাঁধে অ-তে অযু, আ-তে আযান, দেশ তখন চোখ মুদে থাকে।
ধর্মের খোলসে ঠোক্কর লাগবে,পুরুষতন্ত্রে আঘাত আসবে, এমন শব্দ শিখতে বা শেখাতে অস্বীকৃতি জানালে আমার কাটা মাথার দাম হাঁকা হবে। আমাকে আমার জন্মভূমি হতে বিতাড়িত হতে হবে, নষ্ট নারীর উপাধিতে ভূষিত হতে হবে।
আফসোস এতো ভয় নারীদের, এতো শঙ্কা!
আসলেই কী এ কেবলই ভয়? এ কেবলই শঙ্কা? নাকি সুযোগ হারানোর ভয়?
আমাদের দেশের এগিয়ে থাকা, প্রচলিত অর্থে প্রগতিশীল চিত্রশিল্পী, অভিনেত্রী, সমাজের থেকে এগিয়ে থাকা নারীদের যখন সাজু খাদেমদের মতো সঞ্চালককে মৌখিকভাবে যৌন হয়রানিমূলক এবং বিশেষ কোন পোশাক নিয়ে আপত্তিজনক কথা উপস্থাপনকে হেসে উড়িয়ে দিতে দেখি, তখনও তো অবাক লাগে।
এটা আজকের নয়, নারী নিয়ে এ ধরনের রসিকতার উদাহরণ রয়েছে ভুরি ভুরি ,বহু বছর আগে বিটিভির রজতজয়ন্তী অনুষ্ঠানে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ অভিনেতা আফজাল হোসেনকে একটি প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আফজাল হোসেন জানেন কীনা, তার জন্য তার আশেপাশের এবং বাংলাদেশের তাবৎ ললনাদের দীর্ঘশ্বাস পড়ে!’ আফজাল হোসেন হাসতে, হাসতে বলেছিলেন, “সে দীর্ঘশ্বাস নীরবে না হয়ে সরবে হলে তার চারপাশে ভূমিকম্প ঘটে যেতো”। 
শিল্পের নানা শাখায় যাদের অবাধ বিচরণ,তাদের মুখে নারী, তার শরীর এসব নিয়ে রঙ্গরস করাটা মানায় না। একজন শিল্পীর উচিত নারীকে, তার সহকর্মী নারীদেরকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা।
আসলেই কি তারা তা করতে চায়? প্রথা ভাঙ্গতে পেরেছে, সমাজে সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব দেয়া শিল্পী, কলা-কুশলীরা? আসলেই কী তারা আমার সমাজের পিছিয়ে পরা মেয়েদের কাছে আলো পৌঁছে দেবার নূন্যতম প্রয়াস চালায়? নাকি তারা কেবল নারীত্ব টিকিয়ে রেখে কখনো হাসি, কখনো কৌশল দিয়ে বাড়িয়ে চলেছেন কেবল তাদের নিজস্ব প্রচার ও প্রসার! আসলেই কী তারা তাদের নিজেদের পেশার প্রতি শ্রদ্ধাশীল?
একদিকে যেমন ডিজিটাল হওয়ার জন্য দেশ বিশ্বের সকল ভালো-মন্দ সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে,
স্বাধীনতার জন্য নারী শেকল ছিঁড়েছে, গোল্লা থেকে ছুটের অসম প্রতিযোগিতায় রাখতে চলেছে স্বীয় প্রতিভার সাক্ষর, ঠিক তেমনি আবার অন্যদিকে দেশের প্রতিটা ক্ষেত্রেও সমহারে বাড়ছে নারী শরীরের নোংরা পুঁজিবাদী ব্যবহার।
অপ্রয়োজনীয় পোশাক ওড়না ও হিজাবের ব্যবহার যেমন বাড়ছে, তেমন নারীর শরীরের বিভিন্ন অংশ প্রদর্শনীর ব্যবসাও হচ্ছে রমরমা। মিডিয়ার ওপেন সিক্রেট অনেক বিষয় এখন কর্পোরেট লেভেলে আরও ভয়াবহ হারে ব্যবহৃত হচ্ছে। যার ফলাফলে সমাজের অসুস্থ অংশগুলো আরও চরমভাবে আক্রান্ত হওয়া এবং তা ছড়িয়ে পড়ার আশংঙ্কা হচ্ছে প্রবল।
এমন একটি ক্রান্তিলগ্নে কোন জাতির মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দেয়ার জন্য তার সার্বজনীন শিক্ষাকে সাম্প্রদায়িক শিক্ষায় পরিণত করাই যথেষ্ট। আর নারীকে মানুষ না হতে না দেয়ার সুকৌশলী প্রয়াস যে কতটা ভয়াবহ ,আশা করি পুরুষতান্ত্রিক চর্চা থেকে বের হয়ে আসলে প্রতিটি পুরুষ তা অনুধাবনে সক্ষম হবেন।
অবশেষে সকলকেই অনুরোধ করবো,সমস্ত সাম্প্রদায়িক ও কৌশলগত অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে।
চলুন সমবেত কণ্ঠে বলি-
“নারী বা পুরুষ নয় নিজেদের মানুষ ভাবতে শিখি। 
নারীর শারীরিক সৌন্দর্যকে নয়, মেধা শক্তিকে মর্যাদা দেয়ার মানসিকতা অর্জন করি।”

লেখাটি ১,১২১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.