RFL

তবুও ভালো থাকো হে প্রিয় স্বদেশ

0

লীনা পারভিন: নিজের সুখ, দুঃখ, বেদনা, হাহাকার, হাজারো না পাবার বেদনা ভুলে থাকি কেবল দেশকে ভালোবেসে। পারিবারিক চাপ থাকা সত্ত্বেও কখনো এই দেশ ছেড়ে যাবার কথা মাথায় আসেনি। দেশের শত অনাচার, বিশৃঙ্খলার মাঝেও আশায় বুক বেঁধে থাকি, একদিন না একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। আবার ফিরে পাবো আমার ভালো লাগার, ভালোবাসার দেশকে। কিন্তু দিনে দিনে সব যেন কেমন অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে, কোনো তল খুঁজে পাই না শত হাতড়েও। দেশ নিয়ে হতাশা কেবল বেড়েই চলেছে। ভরসার কেউ নেই কোথাও। ভালোবাসার দেশ আজ ক্ষতবিক্ষত, প্রতিটা ক্ষেত্রে। চোখের সামনে ঘটে যাচ্ছে সে অবক্ষয় আর অবনতি, আর ক্রমশঃ হারিয়ে যাচ্ছে আকঁড়ে ধরে বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বনটুকুও।

প্রতিবাদে ক্রমশ: গর্জে উঠি আমরা, কিন্তু সে প্রতিবাদ কার বিরুদ্ধে? প্রতিদিন অঘটনের মাত্রায় যোগ হচ্ছে নতুন নতুন ইস্যু। নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, শিশু হত্যা, মৌলবাদ, কুপমণ্ডুকতার আগ্রাসন, আগুনে পুড়ছে মানুষ, তাদের আবাস, কর্মহীন হয়ে পড়ছে বিরাট জনগোষ্ঠী। সব মিলিয়ে নাভি:শ্বাস অবস্থা। তারপরও আশায় বুক বেঁধে থাকি। একদিন না একদিন ফিরে পাবো স্বপ্নের দেশকে।

আশা দেখি আবার ধাক্কা খাই। হায়!! দেশে আজ সব আছে নেই কেবল দেশপ্রেম। দেশে আজ সব আছে নেই কেবল মানুষে মানুষে ভালোবাসা। সব কিছুর মাঝেও খুঁজে পাই না ব্যক্তি স্বার্থকে ত্যাগ করে দেশের স্বার্থকে সামনে রেখে জেগে উঠার সেই শপথ, যেই শপথ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা অবলীলায় ত্যাগ করে গেছেন তাদের জীবন, যৌবন, সংসার, পরিবার সব।

একটার পর একটা ইস্যু আসে আর আমরা প্রতিবাদী হয়ে উঠি। সেই প্রতিবাদেও নেই সমন্বয়। একদল গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে যাচ্ছে, কিন্তু সেই চিৎকার কার বিরুদ্ধে? কাকে গালি দিচ্ছি? কাকেই বা দায়ী করছি? আরেক দল বসে বসে ভাবছে, দেশ গোল্লায় যাক, আমি ঠিক থাকলেই চলবে। সে মনোযোগী হয় নিজের ভবিষ্যতকে নিশ্চিত করার ধান্দায়। আরেকদল থাকে দ্বিধাদ্বন্দ্বের মাঝে। কী করবে, কোন দিকে যাওয়া উচিত ভেবে পায় না। কেউ কেউ আবার ইংরেজীতে দেশকে গালি দেয়। ডিজগাস্টিং বলে দৌড়ে যায় পাসপোর্টে সিল মারার জন্য।

আমার মতো কিছু অসহায় আর বোকা লোক তারপরও কেবল স্বপ্ন দেখে যায় সব ঠিক হয়ে যাবার। সব হারিয়ে আবার ফিরে পাবার।

আমিও একসময় ভাবি, কী দরকার এতো দেশ নিয়ে ভাবার? এইতো বেশ আছি, খাচ্ছি, দাচ্ছি, ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছি। মাস গেলে একটা মোটা অংকের মায়না পাচ্ছি, সন্তান সংসার নিয়ে ঘুরছি-ফিরছি। আর কী লাগে? পরক্ষণেই বুঝতে পারি এসবে শান্তি নাই। ছা-পোষা জীবন আমি চাই না। স্বার্থপরের জীবন কাটানো আমার জন্য নয়।

দেশের অবক্ষয় আমাকে নাড়া দেয়, আমাকে কষ্ট দেয়। মাঝে মাঝেই আমার মনে প্রশ্ন আসে, আচ্ছা কখনো যদি মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানেরা আমার কাছে তাদের হারিয়ে যাওয়া পিতামাতাকে ফিরে পাবার দাবি করে, কী করবো আমি? পারবো কী তাদের হারিয়ে যাওয়া ছেলেবেলাকে আবার সুখে শান্তিতে ভরে দিতে? তাদের কী দায় পড়েছিলো অভাবে, কষ্টে বিলাসহীন জীবনকে বেছে নেয়ার? শহীদের সন্তান সুপ্রীতি ধর একদিন একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলো, সে ফিরে পেতে চায় তার বাবাকে। তার আজকের কষ্টময় দিন আর সংগ্রাম করে বেঁচে থাকার পিছনে তার বাবাকেই দায়ী করে সে। শহীদ আলতাফ মাহমুদের কন্যা শাওন মাহমুদ লিখেছে, আজকাল মাঝে মাঝেই সে ফিরে পেতে চায় তার বাবাকে, বাবা যদি বেঁচে থাকতেন তবে হয়তো ছেলেবেলার দিনগুলোকে সেও কাটাতে পারতো আরাম-আয়েসে।

এসব কথা আমাকে কেবল আঘাত করে আর অপরাধী করে দেয়। তাদের প্রশ্নের সামনে আমি মাথা নিচু করে থাকি। কোনো উত্তর খুঁজে পাই না, সান্ত্বনাও পাই না। কারণ কোন সান্ত্বনাই তাদের জন্য সান্ত্বনার না, কারণ তাদের কাছে একটাই সান্ত্বনা, দেশের ভালো থাকা।

লীনা পারভিন

সুপ্রীতি বা শাওনের কষ্টকে আমি লাঘব করার কে? কথায় কি কষ্ট লাঘব হয়? তারাও স্বপ্ন দেখে একটি অসাম্প্রদায়িক দেশের, একটি ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত দেশের, একদিন আমাদের প্রিয় দেশ হবে আত্মনর্ভরশীল, যেখানে মানুষের মধ্যে কোন বিভেদ থাকবে না। সবাই সবাইকে ভালোবেসে বসবাস করার শপথ নেবে। একের কষ্টে দশজন এগিয়ে আসবে। একটি আধুনিক ও প্রকৃত শিক্ষিত জাতি হিসাবে অহংকারি হয়ে উঠবো আমরা। ঠিক যেমনটি স্বপ্ন দেখেছিলেন তাদের বাবারা।

এতোসব কথা লেখলাম কেবলি নিজের এক অজানা হতাশাকে প্রলেপ দেবার জন্য। চারপাশে মানুষ আছে, বন্ধু নেই। যাদেরকে ভাবি নিজের লোক, তারাই পরক্ষণে হয়ে উঠে একেকজন আত্মকেন্দ্রিক ব্যক্তি। যাদের কাছে মনের কথা কইবো বলে ভাবি, তারাও দেখি একেকজন কোন না কোন গ্রুপে বিভক্ত। দিনে দিনে মনের কথা বলার সাথী কমে যাচ্ছে। ভালো লাগার মানুষের সংখ্যা আজকাল হাতেগোনা। হয়তো একসময় নিজেকে মনে হবে এক অজানা দ্বীপের বাসিন্দা। দিনশেষে আমরা সবাই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যহীন গন্তব্যের যাত্রী হয়ে উঠছি।

কিন্তু এতোকিছুর পরও স্বপ্ন দেখি, আশায় আবার বুক বাঁধি। কারণ জানি তুমি ভালো না থাকলে আমি ভালো থাকি না আর আমাদের নিয়েই তুমিও ভালো থাকো, আমাদের মাধ্যমেই তোমার ভালো থাকা, হে প্রিয় স্বদেশ।  

লেখাটি ২৭০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.