RFL

দাঙ্গাল : অসামান্য এক বাবার গল্প

0

মনিজা রহমান: নিউজ পেপারে একটা ছোট আর্টিকেল দিয়ে যার সূচনা। মহাবীর সিং ফোগোতের দুই কন্যাকে রেসলার বানানোর কাহিনী নিয়ে আর্টিকেল লেখা হয়েছিল ২০১২ সালে এক পত্রিকায়। যেটা পড়ে একটি প্রোডাক্টশন কোম্পানি ‘দাঙ্গাল’ মুভি বানানোর পরিকল্পনা হাতে নেয়।

একটু আগে জ্যামাইকা সিনে কমপ্লেক্সে মুভিটা দেখে বাসায় এলাম। মনে এখনও কাহিনীর রেশ। হয়তো নিজে ক্রীড়া সাংবাদিক ছিলাম কিংবা আমাদের রক্ষণশীল সমাজে নারী খেলোয়াড়দের উঠে আসার সংগ্রামের চাক্ষুস সাক্ষী বলেই সিনেমাটি আমার হৃদয়কে স্পর্শ করলো। কতবার যে চোখের পানি মুছলাম। শেষ রাউন্ডে গীতার কুস্তি লড়াইয়ের সময় পাশে বসা বয়স্ক এক ভারতীয় নারী আবেগে আমার হাত চেপে ধরলেন। এ আবেগ সরল-স্বার্থহীন আবেগ। খেলার মাঠ ছাড়া যার দেখা কোথাও পাওয়া যায় না আজকাল।

যে সিনেমায় কোন নায়ক-নায়িকা নেই, প্রেমের দৃশ্য নেই, নাচানাচি নেই, সেটা দেখতে মানুষের ঢল নেমেছিল সিনে কমপ্লেক্সে। আমি তো প্রথমদিন টিকেটই পেলাম না। অগ্রিম টিকেট কেটে বাড়ি ফিরলাম। তারপর আজ গিয়ে দেখি সিনেমা হলের ভিতরে পুরো প্যাক্ট। কোনো সিট খালি নেই!

হরিয়ানা রাজ্যের  একটি গ্রামের কাহিনী। যে গ্রামের বেশিরভাগ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় ১৩/১৪ বছর বয়সে। রান্না আর ঘরকন্নার কাজ ছাড়া যেখানে মেয়েদের আর কিছু শেখানো হয় না, সেই গ্রামের একজন মানুষ বুকে বিশাল স্বপ্ন নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। তার নাম মহাবীর সিং। যিনি নিজের মেয়েদের দিয়ে দেশের হয়ে স্বর্ণ জয়ের স্বপ্ন দেখেছিলেন।

এই স্বপ্ন সেই স্বপ্ন নয়, যা মানুষ ঘুমিয়ে দেখে। এই স্বপ্ন, সেই স্বপ্ন- যা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না। শুরু হলো দুই মেয়ে গীতা আর ববিতাকে নিয়ে তার পিতার কুস্তিগির বানানোর লড়াই। কেউ ভাবেনি। কেউ না। মহাবীর সিং ঠিকই ভেবেছিলেন। শেষপর্যন্ত তিনি পারলেন তার স্বপ্নের ঠিকানায় নোঙ্গর ফেলতে।

ভারতীয় গ্রামীণ সমাজ বাংলাদেশের চেয়ে খুব বেশী অগ্রসর নয়। সেখানে দুই গ্রাম্য বালিকা কুস্তির মতো অপ্রচলিত একটি খেলা খেলে। আবার সেই খেলায় ছেলেদের সঙ্গে লড়াই করে। ব্যাপারটা অনেকখানি অষ্টম আশ্চর্য্যের মতোই।

মনে আছে, বাংলাদেশে প্রথম যেবার মেয়েদের কুস্তি টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হয়েছিল, বায়তুল মোকাররম মসজিদে জুমার নামাজের পরে মোল্লাদের বিশাল মিছিল বের হয়েছিল। আমি সেই খেলা কভার করতে গিয়েছিলাম ধানমন্ডি মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সে। ধর্মান্ধ, উগ্র প্রতিক্রিয়াশীলদের প্রচণ্ড বিরোধিতার কারণে বাংলাদেশের মহিলা কুস্তিও খুব বেশী এগোতে পারেনি।

‘তুমি যদি নিজের জন্য খেলো, তবে তোমাকে রৌপ্য জিতলেও চলবে। কারণ ভারতের কোনো মেয়ে এর আগে কোনো আন্তর্জাতিক আসরে রৌপ্য পদক পায়নি। তুমি খেলছো দেশের জন্য। তোমাকে তাই স্বর্ণ জিততেই হবে।’ দাঙ্গাল সিনেমায় শেষ লড়াইয়ের আগে গীতাকে ওর বাবা মহাবীর সিং আরো বলেছিলেন, ‘এই যে ছোট ছোট মেয়েরা কত দূর পাড়ি দিয়ে তোমার খেলা দেখার জন্য এসেছে, ওদের কাছে তোমাকে একটা উদহারণ হয়ে থাকতে হবে। তুমিই হবে ওদের জন্য নতুন দিনের স্বপ্ন।’

আসলে নারী স্বাধীনতার এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর হতে পারে না। মহাবীর সিং নিশ্চয়ই নারীবাদ নিয়ে কোন পড়াশুনা করেননি, কিংবা সভা সমিতিতে বক্তৃতা দেননি। তার প্রয়োজনও হয়নি। নিজের জীবন দিয়েই তিনি প্রমাণ করেছেন।

পুরো সিনেমায় বিভিন্ন দৃশ্যে যত ক্রীড়া সাংবাদিক দেখানো হয়েছে, অবাক হয়ে দেখলাম, তারাও নারী। মনে পড়ে গেলো এভাবে আমিও একদিন ছুটতাম ভেন্যু থেকে ভেন্যুতে। এক স্টেডিয়াম থেকে আরেকটাতে। শুনতে চাইতাম খেলোয়াড়দের উঠে আসার গল্প। কে তার হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল রিলে রেসের সেই বাটনটি। যেটা হাতে নিয়ে জীবনের বহু হার্ডলস পেরিয়ে তারা পৌঁছে গেছে আকাঙ্খার পলিমাটিতে।

এটা কি আমির খানের জীবনের শ্রেষ্ঠ সিনেমা? হতেও পারে। মানুষ তো বার বার নিজেকে ভাঙ্গে-গড়ে। প্রমাণ করে নানাভাবে। এই সিনেমার জন্য শুনলাম ২৫ কেজি ওজন বাড়িয়েছিলেন আমির খান। আবার শেষ অংশের জন্য দুই সপ্তাহে ২০ কেজি ওজন কমিয়েছেন। শিল্পের প্রতি কতখানি ত্যাগ থাকলে মানুষ এটা করতে পারে!

এভাবে কিছু মানুষের আত্মত্যাগ আর স্বেচ্ছাশ্রমের কারণেই আমরা পাই জাতির উজ্জ্বল গর্বিত মুখদের। নোয়াখালি এতিমখানার এক শিশুর কীইবা ভবিষ্যৎ হতো, যদি না একদিন বিউটি নামের কালো এক মেয়ের মধ্যে আলো করা প্রতিভার সন্ধান পেতেন কোচ মিলন স্যার। সাতক্ষীরার মতো গোড়া আর রক্ষণশীল এক এলাকায় থেকেও কোচ আকবর আলী ঠিকই তুলে আনেন ফুটবলার সাবিনাকে। ইমতিয়াজ খান পিলু নামে, খেলাধুলার জন্য আজীবন অকৃতদার থেকে যাওয়া এক মানুষের জন্য, বাংলাদেশের ক্রিকেট পেয়েছে সালমা, শুকতারা, রুমানা, জাহানারার মতো খেলোয়াড়।

এর সবাই পাগলা কিসিমের মানুষ। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে বেড়ানোর স্বভাব  ওদের। তবু মফিজ স্যারের জন্য ময়মনসিংহ শহর থেকে বহু দূরে কলসিন্দুর গ্রামে জ্বলেছে বৈদ্যুতিক বাতি। এ বছর এসএ গেমসে স্বর্ণজয়ী দুই খেলোয়াড় মাবিয়া আর শিলার গ্রামের বাড়ী এখন এলাকাবাসীর জন্য দর্শনীয় স্থান।

বিউটি, সাবিনা, সালমা খাতুনরা সাফল্যের শিখরে পৌঁছেও ভুলে যায়নি অতীত জীবনের কথা। যেটা ক্ষণিকের জন্য ভুলে ছিল বলে, লক্ষ্য থেকে সরে যাবার জন্যে গীতার বিলম্ব হয় আন্তর্জাতিক আসরে স্বর্ণ পেতে। যে ভুলে যায় না, যে কৃতজ্ঞ থাকে তার পথপ্রদর্শকের প্রতি, সেই আসলে প্রকৃত আদর্শ খেলোয়াড়।

যে কারণে বাংলাদেশের আম জনতার কাছে মাশরাফির চেয়ে বড় তারকা আর কেউ নেই। আর কেই বা হতে পারে! এখনতো আর রাজা-বাদশা যুদ্ধ করে না ময়দানে। বরং ময়দানে হয় খেলা। সেই খেলা দেখতে আসা দর্শকের হাসি-কান্নার আবেগময় চিত্র বলে দেয়, নিজের দেশকে কতখানি ভালো বাসে মানুষ। আর কত ভালোবাসে তার দেশের খেলোয়াড়দের।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সেলিব্রেটি হলো খেলোয়াড়রা। তারা শরীরের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করে। শাহরুখ খান শচীন সাজে পেপসির বিজ্ঞাপনে। শচীনের দরকার হয় না শাহরুখ খান সাজার।

মনিজা রহমান

দাঙ্গাল আবারও প্রমাণ করলো,  খেলোয়াড়দের নিয়ে মুভি মানেই হিট। পয়সা উসুল। পৃথিবীর সর্বকালের সেরা ব্যবসাসফল সিনেমার একটি- রকি। যে মুভি সিলভাস্টার স্ট্যালোনকে দিয়েছে কিংবদন্তির মর্যাদা। সিনেমার কাহিনী একজন দরিদ্র বক্সারের উঠে আসার গল্প নিয়ে।

মিলিয়ন ডলার বেবি, হুসিয়ার্স, রেইজিং বুলের মত অজস্র অসংখ্য বিখ্যাত হলিউডের সিনেমা রয়েছে খেলাধুলা নির্ভর। লাগান, চাক দে ইন্ডিয়া, ভাগ মিলখা ভাগ, মেরি কম, সুলতান যথাক্রমে আমির খান, শাহরুখ খান, ফারহান আখতার, প্রিয়াংকা চোপড়া, সালমান খানের ক্যারিয়ারের সেরা মুভি বললে কি কম বলা হবে?

হবে না। কারণ মাঠের খেলোয়াড়রাই সত্যিকারের হিরো। এই গ্রহে মোহাম্মদ আলী, পেলে, ম্যারাডোনা, জিদান, মেসির চেয়ে বড় তারকার নাম কি কেউ বলতে পারবেন?

৭ জানুয়ারি, ২০১৭, নিউইয়র্ক

(অন্ধকারে একটা জোনাকী)

লেখাটি ২,৪৭১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.