রাষ্ট্রের একটি বড় ওড়না প্রয়োজন

0

মাসকাওয়াথ আহসান: নীতি নির্ধারণী মস্তিষ্কে “ও”-তে ওলামা লীগ বিরাজ করলে; শিশুর পাঠ্যপুস্তকে “ও”-তে ওড়না লেখা হবেই। ওলামা-হেফাজত-জামাত যে নামেই ডাকি তাকে; এ যে সর্বদলীয় অনুভূতি-ব্যবসার মনোবিকৃত সমাজ; সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃষ্টান-আদিবাসী নির্যাতন ও বাড়ী- জমি দখলের ক্ষেত্রে যেরকম সর্বদলীয় আগ্রহ; একই আগ্রহ নারী নির্যাতন ও তাদের শরীর দখলের ক্ষেত্রে।

প্রবল যৌন অবদমনের শিকার, সংস্কৃতি ও নন্দনভাবনাহীন লোকজন যখন নীতি নির্ধারণে থাকে; তখন তাদের ব্যাপক লুন্ঠনের মাধ্যমে টেকাটুকা হবার পর; প্রবল রিরংসা জাগে নারীর শরীর লুন্ঠনের। কারণ টাকা আর নারীশরীর এর বাইরে চিন্তা করার কোন ক্ষমতা তাদের জন্মেনি। বিবর্তনের ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা এসব লোকজন তাদের অবচেতনের বিকৃতিকে উন্মুক্ত করেছে শিশু পাঠ্যপুস্তকে “ও”-তে ওড়না লিখে। ওপরে একটি কন্যাশিশুকে ওড়না পরানো ছবি দিয়ে লিখে দিয়েছে “ওড়না চাই।”

এই যে মনোভঙ্গি; এর শুধুই রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ আসলে নেই। এটি একটি স্থূল সামাজিক মনোভঙ্গিকে রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে একটি সুন্দর সমাজে প্রবেশ করিয়ে একে দূষিত করার রেসিপি। এইসব নীতি নির্ধারকদের জীবনে নারী স্তন বিশাল আগ্রহের জায়গা। পাকস্থলি কেন্দ্রিক জীবন হওয়ায় হৃদয়বৃত্তির স্থান সেখানে নেই বললেই চলে। ফলে অফিসের চেয়ারে ঝিমাতে ঝিমাতে এদের কল্পনায় ভেসে ওঠে নারীস্তন। বর্ণমালা সংযোজনের সময় হঠাত মনে পড়ে নিজের মেয়ের কথা। তখন দায়িত্ববান পিতা হিসেবে সে জুড়ে দেয়, ও-তে ওড়না। নিজে সারাজীবন রাস্তাঘাটে নারীস্তনের দিকে হা করে তাকিয়ে থেকেছে; সুতরাং ভাবছে “ওড়না”-টাই সবচেয়ে জরুরী।

পোশাক মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতার বিষয়। কেউ ওড়না পরলো কী পরলো না; তা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। এখানে একটি রাষ্ট্র তার শিক্ষানীতি কৌশলের মাধ্যমে কোনভাবেই নাকগলাতে পারেনা। এরকম সামাজিক পুলিশীকেই বলা হয় অনধিকার চর্চা। রাষ্ট্রের নিজের জন্য বরং একটা বড় ওড়না জোগাড় করা দরকার যা দিয়ে সে তার তীব্র অব্যবস্থাপনা ঢাকতে পারে। অবশ্য এতো বড় লুন্ঠনের মহাকাব্যের দলিল ঢাকার মতো বড় ওড়না পাওয়া দুষ্কর।

বাংলাদেশের নীতি নির্ধারকদের ধর্ম-অনুভূতি-চেতনা ইত্যাদি নিয়ে ব্যবসা বানিজ্যটা বন্ধ করতে হবে। অনেক তো হলো। একই ব্যবসা কৌশলে এতো দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব।

আমরা ইউরোপ ছাড়া আর কোথাও তেমন কল্যাণ রাষ্ট্র ও অপেক্ষাকৃত সফল সমাজ দেখিনি। কারণ ইউরোপ ধর্মের নামে ব্যবসাটা বন্ধ করে দিয়েছিলো সচেতন সামষ্টিক সমাজের তীব্র প্রতিরোধের নবজাগরণের মাধ্যমে। রাষ্ট্র এবং ধর্ম দুটো বিষয়কে অনুশীলনের ক্ষেত্রে পৃথক না রাখা গেলে উভয়েরই মর্যাদাহানি ঘটে। অথচ বাংলাদেশে শিশুদের পাঠ্যপুস্তকে “ও”-তে ওড়না; “ওড়না চাই” লিখে দিয়ে হেফাজতের নারীর মানবতা বিরোধী তেরো দফার বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে গেছে সমসাময়িক ক্ষমতা কাঠামো। এ হচ্ছে ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতির ব্যবসা। অথচ ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত অনুশীলনের বিষয়। সৃষ্টিকর্তা এবং ব্যক্তিমানুষের একান্ত ব্যক্তিগত সম্পর্কের মাঝে ধর্ম-রাজনীতি-রাষ্ট্রের ম্যানেজারি করার কোন এখতিয়ার তো নেই।

খুব আশ্চর্যজনকভাবে পারিবারিক ক্ষমতা কাঠামোর প্রধান চরিত্র “মা” নিজের তরুণ বয়সে নিজের ইচ্ছামত পোষাক পরে; বুড়ো বয়সে এসে মৃত্যুচিন্তায় এতোই স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে উঠছেন যে নিজের মেয়ের পোষাক বাছাইয়ের ইচ্ছার স্বাধীনতা কেড়ে নিচ্ছেন। এর কারণ হতে পারে; তাদের নিজের জীবনে অনেক সম্ভাবনার মৃত্যু ঘটেছে; ফলে মায়ের নৈরাশ্যের খাঁচায় বন্দী হয়ে পড়ছে মেয়ে।

পশ্চিমা সমাজের নারীর পোষাক দেখে যেসব অর্ধশিক্ষিত লোক আঙ্গুল উঁচিয়ে বলে, পশ্চিমা সমাজ উচ্ছন্নে গ্যাছে; তারা জানে না; যে স্কার্ট পরা মেয়েটি হেঁটে যাচ্ছে; সে হয়তো একজন চিকিতসা- বিজ্ঞানী; তার উদ্ভাবিত ওষুধ খেয়েই অর্ধশিক্ষিত ভোক্তা সমাজটি হয়তো বেঁচে আছে। কারণ ভোক্তা সমাজের তো সমুদয় গবেষণার বিষয় নারীর শরীর। তাদের ওষুধ উদ্ভাবনের সময় কোথায়। আবার পাঠ্যপুস্তকে “ওড়না চাই” লিখে কত সম্ভাবনাময় নারী বিজ্ঞানীর সম্ভাবনাকে হত্যা করে একটি শরীর গবেষক স্থূল পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়েছে আর্থিক নিরাপত্তার খোঁজে।

চিন্তার ও অভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতার কারণে নীতিনির্ধারকরা হয়তো বুঝতে পারছেন না; টেকাটুকাইজমটাই জীবনের সবটা নয়। আর নারীর স্তনটাই একমাত্র দর্শনীয় বস্তু নয়। শিশুদের সৃজনশীল মনে বইপড়া-ভ্রমণ-চলচ্চিত্র-চিত্রকলা-সংগীত-বিতর্ক-ক্রীড়া এরকম অসংখ্য সত্য-সুন্দর-মঙ্গল উপাদান ছড়িয়ে দিলে তাদের একটি প্রশস্ত মানব দৃষ্টি তৈরী হয়। তখন তারা জীবনের বড় একটি অর্থ খুঁজে পায়; জীবনের যে অর্থ অর্থবিত্ত কিংবা স্তনে নেই। সুতরাং বড় হয়ে ছেলেরা কারো অর্থ বা স্তনের দিকে তাকিয়ে থাকেনা। মেয়েরাও বড় হয়ে কারো অর্থের দিকে তাকিয়ে থাকেনা; আর ওড়না পরবে কী পরবে না সেটাতো তার ইচ্ছার স্বাধীনতা।

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.