RFL

ভারবাল পর্ন সাইট “সাজু খাদেম”

0

নাহরীন খান: একটি ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। এক টকশোতে উপস্থাপক তার চার নারী অতিথিকে একটি প্রশ্ন করেছেন। প্রশ্নটি  অত্যন্ত নোংরা, কুরুচিপূর্ণ এবং ভয়াবহ রকমের আপত্তিকর।  যদিও  টকশোতে এটি প্রদর্শিত হয়নি , বোধহয় বিজ্ঞাপন বিরতির সময়ে এটি হয়, এবং চ্যানেলেরই কেউ এটি রেকর্ড করে ইউটিউবে ছেড়ে দেয়। ব্যস, সাথে সাথেই সেটি ভাইরাল হয়ে যায় অন্যসব অশ্লীল ভিডিওর মতোনই।

এমন এক সময়ে ভিডিওটি প্রচার হলো যখন টেলিভিশন কলা-কুশলীরা অনশন করছেন এই বলে যে সুলতান-সুলেমান অশ্লীল, এবং আমাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে সঙ্গতিবিহীন! আর এই উপস্থাপক আর তার প্রশ্ন!!! আন্দোলনরত শিল্পীরা কি এগুলো দেখেন না? সর্ষেতেই ভূত রেখে, ভূত তাড়ানোর কী অপচেষ্টা! “দেশীয় সংস্কৃতি ধ্বংসের মুখে” এসব বুলি আওড়ানোর আগে তাদের দেখা উচিৎ, আমাদের সংস্কৃতি আজ কাদের হাতে।

সাজু খাদেম

খোঁজ নিয়ে জানলাম, উপস্থাপকের নাম সাজু খাদেম। তিনি NTV তে ‘হাshow’ নামে একটি ‘কমেডি ‘ অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন! আর ব্যক্তিগত জীবনে ড. ইনামুল হক আর লাকি ইনামের মত প্রথিতযশা অভিনয় শিল্পীর মেয়ের স্বামী।

লোকটি এই বিকৃত রুচি নিয়ে দীর্ঘদিন মিডিয়াতে টিকে আছেন কী শুধুই খুঁটির জোরে? কারা এধরনের লোকদের এই মিডিয়াতে  প্রশ্রয় দেয়? নাকি নারীদের নিয়ে যেকোনো রসিকতা যেকোনো জায়গাতেই করা যায়? খোদ অনুষ্ঠান বিরতিতেও? এমনকি চার-চারজন নারী অতিথিকে এমন একটি প্রশ্ন করার আগে তিনি একবারও ভাবলেন না যে, নিজের কামুক ভাবনা প্রকাশের জায়গা মিডিয়া নয়। মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হয়ে এটাও জানেন না যে sexual harassment কাকে বলে?

ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশনের Conditions of Work and Employment Series No. 2(2005)-এর পৃষ্ঠা ২ এ Examples of sexual harassment এর প্রথমেই লেখা আছে Verbal conduct যেমন Comments on a worker’s appearance, age, beuty, private life, etc. এগুলো নিয়ে কোন অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য করা অথবা এমন প্রশ্ন যাতে কেউ বিব্রত বোধ করেন তা sexual harassment এর শামিল।

তাই সাজু খাদেম যেহেতু তার কর্ম ক্ষেত্রে এই ধরনের মন্তব্য করেছেন এটা অবশ্যই sexual harassment এর আওতায় পড়ে এবং এই আইনের আওতায় উনার বিচার চাওয়াটা যৌক্তিক।

এখন যে কেউ প্রশ্ন তুলতেই পারেন, তারকাদের নিজেদের মধ্যকার কথাবার্তা বা আড্ডা নিয়ে কেনই বা আমরা এতো মাথা ঘামাচ্ছি! তাছাড়া ভিডিও ক্লিপটা তো আর টেলিভিশনে প্রচারিত হয়নি! এ দুটি প্রশ্নের উত্তরে বলা যেতে পারে, ভিডিওটি টিভিতে প্রচারিত হলে যতো না দর্শক দেখতো, তার চেয়ে ঢের বেশি দর্শক ইউটিউব আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে দেখছে। আর কেউ দেখুক আর না দেখুক একজন পুরুষ  উপস্থাপক যদি তার অনুষ্ঠানে উপস্থিত নারী অতিথিদের নিয়ে এ ধরনের কুৎসিত মজা বা কৌতুক করতে পারেন, তাহলে তাকে এর জবাবদিহি করতেই হবে।

শেষ করছি একেবারে সরাসরি কয়েকজনকে কিছু প্রশ্ন করে-
হৃদি হক, আপনাকে দিয়েই শুরু, আপনার বোনের স্বামীর এহেন প্রশ্নে আপনার কি একবারও ঐ লোকটির কথা মনে পড়ছে না, যার কামুক দৃষ্টি অথবা “মালটা দারুণ” মন্তব্য আপনার প্রাতঃভ্রমণকে একটু হলেও বিব্রত করে? তার বিরুদ্ধে যদি আপনার অভিযোগ থাকে, তবে ঘরের মানুষের এই প্রশ্নে আপনার অবস্থান কোথায়?
ড. ইনামুল হক এবং লাকি ইনাম, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ আর অপসংস্কৃতি রোধে আপনাদের প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য খুব অচেনা নয়। সাজু খাদেমের এই অশ্লীল কথোপকথনের জন্য কোন প্ল্যাকার্ড হাতে আগামীকাল আপনাদের কি দেখতে পাবো আমাদের কাতারে?

নাহরীন খান

মাননীয় মন্ত্রী, পর্ন সাইট যদি আমাদের অনুভুতিতে আঘাত করে, তবে সাজু খাদেমের এই কথোপকথন কি এক ধরনের ভারবাল পর্ন নয়? ভিজ্যুয়াল পর্ন বন্ধের ঘোষণার সাথে সাথে এই মৌখিক পর্নও বন্ধ হবে কি?

আর শেষ প্রশ্নটি চারজন অতিথির কাছে, আপনাদের বিব্রত- হাসি আর “ইটস টু মাচ” কি এই অপরাধীর জন্য যথেষ্ট? আপনাদের নীরবতা এদের কি আরও প্রশ্রয় দেয় না? প্রতিবাদের শুরুটা কী আপনাদের কাছেই আমরা আশা করি না?

আসলে এই সাজু খাদেমরাই আজ আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সেলিব্রেটি। এরাই সকালে শহীদ মিনারে যায় সংস্কৃতি রক্ষা করতে, দুপুরে তনু হত্যার বিচার চায়, আর বিকেলে রাস্তায় হেঁটে যাওয়া সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ মেয়েটির আপাদমস্তক গজ-ফিতা দিয়ে ৩৪-২৪-৩৪ মাপজোক করে। আসলে এরা একেকজন ভার্চুয়াল ধর্ষক, যারা সুযোগের অভাবে ধর্ষণ করতে পারে না, কিন্তু মুখ আর চোখ দিয়ে ধর্ষণ করে প্রতিনিয়ত। রাস্তার বখাটে এবং ইভটিজারদের সাথে এই সাজু খাদেমের মূলত কোনো তফাতই নেই।

কষ্টটা হলো, বখাটেদের ফলোয়ার তেমন থাকে না, কিন্তু সেলিব্রিটিদের প্রচুরসংখ্যক ফলোয়ার, এবং তাদের কথা, তাদের আচরণ সেই ফলোয়ারদের জীবনেও প্রভাব ফেলে। দেশে যখন নারী নির্যাতন মহামারী আকার নিয়েছে, নির্যাতন বন্ধে যখন অনেকেই সোচ্চার আজ, ঠিক সেই সময় এ ধরনের আচরণের প্রকাশ এটাই প্রমাণ করে যে, দেশ এবং সমাজ নারী নির্যাতনমুক্ত করার স্বপ্ন দু:স্বপ্নেরই শামিল। সাজু খাদেমের আচরণ, অঙ্গভঙ্গি এবং অশ্লীল কৌতুক একজন নারীকেই ভয়াবহ অসম্মান।

কাজেই একান্তভাবেই চাই, সাজু খাদেমের বিচার হোক, নিষিদ্ধ হোক অশ্লীলতা, কামুক থাকুক নির্বাসিত, আলো আসুক সংস্কৃতিতে। (লেখাটিতে কৃতজ্ঞতা শারমীন জান্নাত ভুট্টো এবং সুপ্রীতি ধরকে)

ভিডিও লিংকটি শেয়ার করা হলো এখানে: https://www.youtube.com/shared?ci=4oWOw7u2CLs

লেখাটি ৩৩,২৫৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.