দর্শকের হৃদয়ে বাঁচিয়ে রাখুন আপনার কাজ

0

শারমীন জান্নাত ভুট্টো:  ২০১২ সালে কলকাতায় গেলাম বাবা-মাকে নিয়ে, উদ্দেশ্য চোখের চিকিৎসা। সেখানে থেকে চিকিৎসা করিয়ে আনলেও চোখে আরেকটি বদভ্যাস ধরিয়ে আনলাম। সেটা মূলত আমারই দোষে।

হাসপাতাল থেকে হোটেলে ফিরে যখন সময় কাটতো না, তখন সেখানকার টেলিভিশনে সিরিয়াল দেখেই মোটামুটি আমাদের বিনোদনের খোরাক মিটতো। সেই যে শুরু হলো কনকাঞ্জলী আর রাশির কান্নাকাটি দেখা, তা এখন অব্দি বহাল আছে। আমি দেশত্যাগের সাথে সাথে বদভ্যাসও জলাঞ্জলী দিয়ে এসেছি, তবে আমার অভিভাবকরা এখনও আছেন আগের পথেই। তবে তাদেরকে আমি খুব একটা দোষ দেই না। এর কারণও আছে বটে। একটু সময় নিয়ে ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করছি।

১. আমার বাবা-মার মতো বাংলাদেশী দর্শক যারা ভারতীয় সিরিয়ালগুলো দেখেন, তারা সাধারণত যে সময়টাতে সিরিয়াল দেখেন সেটি বাংলাদেশী সময় ৭-১০টার মধ্যে। এখন যদি ঠিক এই সময়ে বাংলাদেশী চ্যানেলগুলোতে কী দেখায় তা বিশ্লেষণ করি, তবে দেখতে পাবো যে, এই সময়কালে প্রায় সবগুলো চ্যানেলই পাল্লা দিয়ে সংবাদ প্রচার করতে থাকে। কোনো চ্যানেলের প্রাইম টাইম নিউজ শুরু হয় ৭ টায়, আর কোনোটায় ৭:৩০টায়, আর এর রেশ চলতে থাকে রাত ১১টা পর্যন্ত। তারপর রাত ১১টার পর থেকে শুরু হয় টকশো নামক অনুষ্ঠানের রেইস।

রেইস বলছি এই কারণে- নিউজ চ্যানেল থেকে শুরু করে প্রোগ্রাম চ্যানেল (এনটিভি, এটিএন, চ্যানেল আই ইত্যাদি) সবাই একযোগে তাদের লাইভ টকশো প্রচার করতে থাকে। যেহেতু টকশোর টিআরপি কোনো এক সময় বেশি ছিল, তাই সব চ্যানেলই হুমড়ি খেয়ে পড়লো তার পেছনে। এখন এই লম্বা সময়টাতে আমার বাবা-মার মতো দর্শকরা কেনো অন্য দেশী চ্যানেলে পাড়ি দেবেন না!

তবে এখানেও কথা আছে। কিছু কিছু চ্যানেলে ঠিকই নাটক ও মেগা সিরিয়াল প্রচার করছে, তাহলে তা কেনো দর্শকদের টানছে না? প্রশ্ন আমার মাঝেও ঘুরপাক খাচ্ছে, কিন্তু জবাব মিলবে কোথায়? ভাবলাম বাবা-মাকেই জিজ্ঞেস করি, তারাই ভালো বলতে পারবেন।

উত্তরে তারা জানালেন, বেশ কয়েকটি নাটক তারা দেখেছেন এর আগে। নামও উল্লেখ করা যেতে পারে এখানে। বন্ধন, রঙের মানুষ, লাল-নীল-বেগুনি, ডলস হাউজ প্রভৃতি। তবে ইদানিংকালে তাদের আর দেশী নাটকগুলো ভাল লাগছে না, কারণ প্রত্যকটি নাটকই নাকি তরুণদের প্রেমের গল্প আর ফাতরামিতে ঠাসা, যার শুরু-শেষ আর মূলে ফেসবুক। এটিকে ঘিরেই কাহিনীর মারপ্যাঁচ। যার কারণে তাদেরকে গল্পগুলো খুব একটা টানে না কিংবা তারা হয়তো সংযোগ তৈরি করতে পারেন না তাদের বয়সের কারণে।

২. আরেকটি কারণ তারা উল্লেখ করলেন। সেটি হলো বিশেষ দিনের নাটক নিয়ে। তাদের মতে, শুধুমাত্র বিশেষ দিন হলে চ্যানেলগুলো ভালো ভালো কিছু নাটক দেখানোর ব্যবস্থা করে। অন্যদিনে দর্শকদের কথা নাকি মনে থাকে না বলে অভিযোগ করলেন আমার অভিভাবকরা। তাদের কথার সাথে আমিও একটু যোগ করতে চাই নাটকের মান বিষয়ে।

গত ঈদে বিলেতে বসে ইউটিউবের সুবাদে ৩০টির মতো নাটক দেখেছি। সবগুলো নাটকের প্রথম দৃশ্য দেখে বলতে পেরেছি নাটকের শেষ দৃশ্য কী হবে। নাটকের কাহিনী আর নিমার্ণশৈলীতে যদি কোন ভিন্নতা না থাকে আর প্রেডিক্টেবল হয়, তাহলে আগ্রহ শেষ পর্যন্ত ধরে রাখাটা কঠিন একটা কাজ হয়ে যায়। কিছুদিন আগে হিন্দি ‘দাঙ্গাল’ মুভিটি দেখলাম যেখানে প্রত্যকটি দৃশ্য অনুমান করা যায় কী হতে যাচ্ছে। কিন্তু একেকজন শিল্পীর অভিনয় দেখে গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়। সেই সাথে সুনিপুণ নির্মাণ কৌশল আগ্রহ বাড়িয়ে দেয় অনেকাংশে। যদিও এই চলচ্চিত্রটির সাথে নাটকের কোনো ধরনের তুলনাই চলে না, তাও চলে আসলো প্রস্ঙ্গক্রমে।

ঈদের সবগুলো নাটক দেখেই মনে হয়েছে বাজেট কম ছিল, যে কারণে কুশীলবরা একই পোশাকে বিভিন্ন দৃশ্য শেষ করেছেন। নায়ক, নায়িকা, বাবা-মা, নতুবা বন্ধু বা বান্ধবী এই ৩/৪ জন দিয়েই একটি নাটকের ইতি টানা হচ্ছে। আমি বলছি না, বেশি আর্টিস্ট নিয়ে নাটক বানালে মান ভালো হবে। তবে চরিত্র নিয়ে গবেষণা কম, আর সেই সাথে বিভিন্ন নাটকে একই আর্টিস্টের সেই একই পোশাক দেখে আমার মতো কম বুঝতে পারা দর্শকদের মনেও প্রশ্ন আসতে পারে নির্মাতা ও শিল্পীদের ডেডিকেশন নিয়ে। যতোগুলো নাটক দেখেছি শেষ ঈদে, কোনোটি মনে দাগ কেটে আছে এমনটি বলতে পারবো না। শুধু বলতে পারবো নাটকগুলোর নাম বিভিন্ন রংয়ের নামে ছিলো। যখন নতুন এই নাটকে মন ভরলো না, তখন নক্ষত্রের রাত দেখা শুরু করলাম আবারও।

৩. দেশীয় নাটক না দেখার পেছনে চ্যানেলের অতি মুনাফালোভী চেহারাকে দুষলেন অভিভাবকরা। তাদের মতে, যখন নাটক দেখতে বসেন তখন তারা কিছুটা দ্বিধায় থাকেন। নাটকের মাঝে বিজ্ঞাপন নাকি বিজ্ঞাপনের মাঝে নাটক দেখানো হচ্ছে, এইটা ঠিক বোধগম্য হয়ে ওঠে না। আকাশ সংস্কৃতির মাঝে দর্শকদের যেখানে এক সেকেন্ডও লাগে না দেশ-বিদেশের সংস্কৃতিতে ঘুরে আসতে, সেখানে নাটক আর অনুষ্ঠানের মাঝে লম্বা-চওড়া বিরতি দিয়ে দর্শককে টাকা দিয়েও বসিয়ে রাখা যাবে না। আর এ কারণেই বাংলাদেশী দর্শকদের এদিক-ওদিক তাকানো সহজতর হচ্ছে। যে হারে নাটকের মাঝে বিজ্ঞাপন দেখানো হয়, আগামীতে শুধু বিজ্ঞাপন দেখানোর কোনো চ্যানেল তৈরি হলেও খুব একটা অবাক হবো না। চ্যানেল থেকে নাটক ও অনুষ্ঠানের জন্য বাজেট কম থাকে বলেই নাটকের মান কমছে দিনকে দিন।

আর বিজ্ঞাপনে বাজেট বেশি আর পোস্ট প্রডাকশনের সুবিধা আশেপাশের দেশ থেকে নেয়া যাচ্ছে বলে অনেক প্রথিতযশা নির্মাতা নাটক কিংবা চলচ্চিত্র নির্মাণের চেয়ে বিজ্ঞাপন জগতের দিকেই বেশি ঝুঁকে আছেন বলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে।

আমাদের দেশের একটি নামকরা ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের নাম উল্লেখ না করলে‌ই নয়, আর সেটি হচ্ছে ইত্যাদি। এই অনুষ্ঠানটি দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে দর্শক দেখে আসছে।

অথচ এ অনুষ্ঠানের জনপ্রিয়তায় আজও কোন ভাটা পড়েনি। এর পেছনে নির্মাতার শ্রম, নতুনত্ব ও ভিন্নতা প্রদর্শনের চেষ্টা জোরালো ভূমিকা পালন করেছে। আমরা কেনো গেম শো, কুইজ শো লাফটার, লেটনাইট শো, কিংবা অনুষ্ঠানের ভিন্নতা না তৈরি করে শুধুমাত্র নাটককেই বিনোদনের একমাত্র হাতিয়ার বানিয়ে রেখেছি, বুঝে উঠতে পারছি না।

সময় বদলাবে, আসবে নতুনত্ব আর হবে নিজ সংস্কৃতির জয়। সমালোচনার ঊর্ধ্বে কেউ নয়, তাই সমস্ত ধরনের সম-আলোচনাকে গঠনমূলক ও ইতিবাচকে রুপান্তর করে বাঁচিয়ে রাখুন নিজ কর্মকে। দর্শক নিজ দায়িত্বে তাদের মনে আর হৃদয়ে রাখবে সেই কর্মকে বছরের পর বছর। যেমনটা আমরা এখনও ইউটিউবে দেখে যাচ্ছি “আজ রবিবার” নাটকটি।  

লেখাটি ৭৩০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.