RFL

‘পুরুষতান্ত্রিক নারী’

0

পারভীন সুলতানা ঝুমা: পুরুষতন্ত্র রোগে আক্রান্ত কি শুধু পুরষেরা হয়? পুরুষদের  মধ্যে যদি  শতকরা ৮০ থেকে ৯০ ভাগ এই তান্ত্রিক রোগে আক্রান্ত হয়, তাহলে মেয়েদের ক্ষেত্রে সেই হিসাব শতকরা ৪০ থেকে ৫০ তো বটেই, হয়তো তার থেকেও বেশি।

পারভীন সুলতানা ঝুমা

পুরুষতন্ত্রের সংজ্ঞা দেওয়ার কি প্রয়োজন আছে? পুরুষদের অবস্থান নারীদের উপরে, এটাই পুরুষতন্ত্রের মোদ্দা কথা। আসলে  নিজের পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র আর বিশ্বে যা চলে আসছে এবং জন্ম থেকে যা দেখে আসছে, তার বিরুদ্ধে যেতে হলে যে মানসিক শক্তি প্রয়োজন, সেই শক্তি অর্জন করা চাট্টিখানা কথা নয়। আমার চারপাশে যা ঘটছে সেটিই ঠিক, এ উপলব্ধি থেকে বের হওয়াও খুবই কঠিন। সে কারণে হয়তো মাঝে-মধ্যে কোনো কোনো নারীর নারী অধিকার নিয়ে কিছু কিছু মন্তব্য আর বক্তব্যে  আহত হলেও অবাক হওয়ার মতো কিছু থাকে না। নিজেকে অধীনস্থ দেখার মাঝে যে সুখকে খুঁজে নেওয়া হয়, সেটি এক ধরনের পলায়ন মনোবৃত্তি ছাড়া আর কিছু না।

সে যা হোক, নারীদের পুরুষতান্ত্রিক কার্যকলাপ এবং মনোভাব বিষয়ক একটি জব্বর লেখা লেখেছেন মারলিয়া ডাবা( উচ্চারণ ভুল হলে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি) নামক একজন মার্কিন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। তিনি একে একে  ১২টি  পয়েন্ট বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন নারীরাও কিভাবে পুরুষতন্ত্রের ধ্বজাধারী হয়।

তার লেখার সঙ্গে আমি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা জোড়া লাগিয়ে একটু দেশীয় ফ্লেভার দেওয়ার চেষ্টা করছি। তার লেখায় পুরুষসঙ্গীর কথা বলা হলেও আমি এখানে ‘স্বামী’ শব্দটি ব্যবহার করলাম।

১) আমার স্বামী  আমার রক্ষাকর্তা: দূরদেশ থেকে এক রাজপুত্র এসে আমাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে। জেন্ডার-বেসড সেই রূপকথা শুনতে শুনতে আমরা মনে করি স্বামী বা পরিবারের পুরুষ সদস্যই একমাত্র আমার নিরাপত্তার সব দায়িত্ব পালন করবে, আমার নিরাপত্তার দায়িত্ব আমার নয়। ইংরেজিতে বললে, স্বামীই আমার প্রটেক্টর। তাই এখনও শরিয়া আইনের দেশগুলোতে পুরুষ সদস্য ছাড়া নারীরা বের হতে পারে না। সম্প্রতি  আফগানিস্তানে এক নারী স্বামী ছাড়া বের হওয়াতে তার গলা কেটে নিলো। অতি সুক্ষ্মভাবে দেখলে আমরা তার চেয়ে খুব একটা উন্নত অবস্থায় নেই। একা বের হতে হয়তো পারি, কিন্তুু পরিবারে একজন পুরুষ থাকতে হবে। তা না হলে আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগি।

২) স্বামী সব দায়িত্ব বহন করবে: সংসার চালাবে স্বামী। স্ত্রী চাকরি করলেও তাকে সাহায্য করবে মাত্র। সংসার চালানোর আসল দায়িত্ব স্বামীর। তথাকথিত বহু নারীবাদীও এ মানসিকতা থেকে উৎরাতে পারেননি। সম্প্রতি ‘প্রাক্তন’ সিনেমা নিয়ে বহু তর্ক-বিতর্ক  হচ্ছে। সেখানে দেখাচ্ছে , হানিমুনের জন্য স্ত্রী  কাশ্মির যাওয়ার টিকেট কিনে আনলে স্বামী অপমান বোধ করে। অনেক নারী একে  বাহাবা দিয়েছে এবং মনে করছে, স্ত্রীর কেনা টিকেট ফিরিয়ে দিয়ে স্বামী ব্যক্তিত্ব দেখিয়েছে। পুরুষতান্ত্রিক  মনোভাবই এর কারণ। স্বামী আমার ভরণপোষণের দায়িত্ব নিবে, এই বাসী সেন্টিমেন্ট এখনও বেশীরভাগ নারীর মধ্যে বিরাজ করছে।

৩) স্বামীর যত্নআত্তি করা আমার দায়িত্ব: স্বামীকে খাবার তুলে দেওয়া, স্বামীর কাপড় গুছিয়ে রাখা, বাইরে থেকে আসার পর স্বামীকে বিশ্রাম করতে দেওয়া, ইত্যাদি কাজগুলো স্ত্রী হিসাবে আমাকে করতে হবে। উল্টোটার কথা চিন্তাই করতে পারি না। তা না করলে নিজের বাবার বাড়ির লোকজনের কাছ থেকেও কথা  শুনতে হবে, ‘স্বামীর কোনো আদর যত্ন (সেবা কথাটা বাদ দিলাম) করা হচ্ছে না’। শ্বশুর বাড়ির মানুষদের কথা তো আর বলারই নেই।

৪)  সংসার ও সন্তান দেখাশোনা করা আমারই দায়িত্ব: স্বামী রান্না করে, বাচ্চার খাবার তৈরি করে, থালা-বাসন ধুয়ে দেয়? তাহলে তো আপনি বড় ভাগ্যবান। আপনি নিজেও তাই মনে করেন, তাই না? অফিসের কাজে রাত হয়ে গেলে আপনি অনুশোচনায় ভোগেন। বাচ্চাদের বাসায় রেখে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে ইচ্ছা হলেও পারেন না, একটা অপরাধবোধ কাজ করে। আপনারই সংসারের জন্য সব সাধ-আহ্লাদ বিসর্জন দিতে হবে। এই পুরুষতান্ত্রিক ধারণা অগোচরে আপনি ধারণ করছেন।

৫) অফিসের অনুষ্ঠানে আপনিই খাবার মেনু ঠিক করবেন: অফিসের যেকোনো অনুষ্ঠানে খাবার মেনু ঠিক করা আপনারই দায়িত্ব, অফিসও মনে করে, আপনিও মনে করেন, কারণ আপনি নারী। যেমন পিকনিকের স্থান নির্বাচন করা, সেটি করবে পুরুষ সহকর্মী। এছাড়া  সহকর্মীর বিয়ে বা অন্য অনুষ্ঠানের কেনাকাটর দায়িত্ব আপনার, কারণ আপনি নারী, আপনি বেশি কেনাকাটা করেন, আপনার অভিজ্ঞতা বেশী। আপনিও গদগদ হয়ে তাই করেন।

৬) কম বেতন, কম দায়িত্বে খুশি: পুরুষ সহকর্মীদের মতো আপনার বেতন বাড়ছে না, আপনি চুপ। ওরা পুরুষ, নেগোশিয়েট করতে পারে, আপনি নারী তা পারবেন না। কেন পারবেন না? চেষ্টা করে দেখেছেন? অফিসের বাড়তি দায়িত্ব আপনাকে না দিয়ে পুরুষ সহকর্মীকে দিল। আপনি বেঁচে গেলেন? বাসায় ঠিক সময় যেতে পারবেন, তাই? নাকি আগ বাড়িয়ে দায়িত্ব নেওয়ার কী দরকার? মাসের শেষে বেতনটা পেলেই হলো? নারী হয়েছি, এতো দায়িত্ব না নিলে চলবে – এ মানসিকতা কীসের ইঙ্গিত?

৭) পদোন্নতির জন্য বিছানায় যাচ্ছে: শুধু পুরুষরা নয়, অনেক নারীর ধারণা পুরুষের শয্যাসঙ্গী হলেই নারীদের সফলতা আসে। নিজ পেশার, এমনকী নিজ অফিসের নারী সহকর্মীর ব্যাপারেও  এ ধরনের নেতিবাচক মনোভাব নিয়ে চলেন অনেক নারী। এরা পুরষদের চেয়েও ভয়াবহ পুরুষতান্ত্রিক।

৮) সাজগোজ করে না, ও কি মেয়ে? অনেক নারী আছেন সাজসজ্জাবিহীন নারীদের বাঁকা চোখে দেখেন। মেয়েমাত্র সাজবে- এ ধারণা অনেক নারীর মজ্জাগত।

৯) বিয়ে করবে না? বাচ্চা নেবে না? ঢঙ! বিয়ে করছে না, নাকি  বিয়ে হচ্ছে না, এ ধারণাটি আমাদের দেশে একজন বয়ষ্ক অবিবাহিত নারীদের বেলায় বলা হয় বেশি। তাও বলেন অনেক নারী। আর ইচ্ছাকৃতভাবে সন্তান নিচ্ছে না? ভুয়া! সন্তান হচ্ছে না, বাঁজা নারী। বিয়ে-সন্তানই নারীর সকল সুখের উৎস। এ ধারণা পুরুষদের তো বটেই, অনেক নারীদেরও।

১০) ছেলে সন্তানের জন্য কান্নাকাটি: সত্যি ঘটনা। পরপর তিন সন্তান মেয়ে হওয়ায় ছেলের জন্য মায়ের গলা ছেড়ে কান্না। আগের দিনে সমাজে একজন নারীর সম্মান নির্ধারিত হতো তার ছেলে সন্তান থাকার ওপর। যুগ পাল্টালেও বহু নারী কায়মনে এখনও ছেলেকে বেশি প্রাধান্য দেয় ।

১১) ছেলে এবং মেয়ের বিভেদ করা: পরিবারে ছেলেমেয়ের মধ্যে বিভেদ অনেক কমে এসেছে, বিশেষ করে শহরের শিক্ষিত পরিবারে। এরপরও ছেলের হাতে গাড়ি তুলে দেওয়া এবং মেয়েকে পুতুল দিয়ে খেলতে বলার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি বেশিরভাগ নারী। ছেলে কাঁদলে বলে উঠবেন, ‘ছি: তুমি কী মেয়ে? কাঁদছো কেন?’ আর মেয়ে দুষ্টামি করলে, ‘ও ছেলেদের মতো’ এমন মন্তব্য করেননি, এমন মায়ের সংখ্যা গুটি কয়েক।

১২) দোষটা তো ওরই: স্বামী অত্যাচারী, দোষটা তো বৌ এরই, স্বামীর কথা শোনে না। মেয়েরা হেনস্থা হয় নিজেদের কারণে। যে কাপড়চোপড় পরে আজকালকার মেয়েরা, ছেলেদের কী দোষ? নারীদের মুখে এসকল মন্তব্য শোনেননি? বিশ্বাস হয় না। এমনকি  একজন শিক্ষিত নারীর মুখে শোনা গেছে, ‘ধর্ষিতার নিজের লজ্জা পাওয়া উচিৎ,তার আত্মহত্যা করাই সমাচীন।’

এ বলয় থেকে নারীরা বের না হতে পারলে, নারী অধিকার বা নারী স্বাধীনতা যাই বলি, তা অরণ্যে রোদন ছাড়া আর কী হতে পারে? আমি নিশ্চিত এ ধরনের  পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের নারী আপনি নিজে না হলেও আপনার পরিবারের কেউ, সহকর্মী বা প্রতিবেশী কারও না কারোর রয়েছে।

লেখাটি ৮২৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.