RFL

সিরিয়াল দর্শকদেরও কিন্তু ‘SAY’ আছে

0

রোকসানা ইয়াসমিন রেশনা: ফেসবুকে হরেক রকম স্টিকার দেখা যায়, স্টার জলসা, স্টার প্লাস না থাকলে বাচ্চারা মায়ের আদর বেশি পেত, স্বামীরা বেশি যত্ন পেত, নারীরা কুটনামি শিখতো না, ইত্যাদি ইত্যাদি। ইদানিং আবার দেখছি, দেশি চ্যানেলে বিদেশি ডাবিং করা নাটক দেখানো বন্ধ করা নিয়ে  একটা মহল বেশ সোচ্চার। টিভিতে সব বড় বড় লোকদের দেখলাম এই অপরাধে পারলে একটা চ্যানেলই বন্ধ করে দেন, এ নিয়ে কী সব জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিচ্ছেন।

উনারাই বিদেশি চ্যানেল স্টার জলসা, স্টার প্লাস, জি বাংলা  প্রচার বন্ধের জন্যও সোচ্চার।
অনেকেই একমত যে, এই চ্যানেলগুলো দেখে সাধারণত: বাসার মুরুব্বি, হাউজওয়াইফ এবং হোম এ্যাসিস্ট্যান্টরা। আমি যদি মুরুব্বি ও হোম এ্যাসিস্ট্যান্টদের ফোকাস করি (কেউ আবার ভেবে নেবেন না যে আমি এদেরকে এক কাতারে ফেলছি), তাহলে দেখা যায়, এদের বিনোদন বলতে কিন্তু এইটুকুই।

আমাদের দেশের টিভি প্রোগ্রামগুলো ভালো হয় না, আমি তা মানতে নারাজ। এখনও যেসব নাটক তৈরি হচ্ছে অভিনয়, মেকিং, গল্প সবকিছু মিলে এতো চমৎকার যে, আমি অন্তত: নি:সন্দেহে বলতে পারি, এসব যদি বিদেশি চ্যানেলের মতো সিস্টেম মেনে দেখানো হতো, একজন দর্শকও ঐসব বস্তা পঁচা সিরিয়াল দেখতো না।

উদাহরণ হিসেবে বলি, আমি ইউটিউবে ডজনখানেক ধারাবাহিক নাটক দেখি। যেমন- লড়াই, সম্রাট, সংসার, সম্পর্ক, বাবুই পাখির বাসা, ঝামেলা আনলিমিটেড, মায়া ইত্যাদি। এর দু’একটা সম্ভবত: টিভিতে প্রচারও শেষ  হয়ে গেছে। প্রথমে ডিউরেশনের কথা বলি। নাটকগুলো সাধারণত: ১৭ থেকে ২১ মিনিট প্রচার হয়। প্রথম ২/৩.৫ মিনিট যায় নাম ও আগের পর্ব মনে করায় দিতে, শেষের ২/৩.৫ মিনিট যায় পরের পর্বে কী হবে ও কিছু ইনফরমেশন দিতে। ধরে নেই মোট ১৭ মিনিট প্রচার হয়।

ফেরদৌস হাসানের নাটক আমার দারুণ পছন্দের। পরে দেখি আমার মেয়ে ও হাজব্যান্ডও সেই ফোবিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। মায়া নাটকটা যখন দেখছি তখন মেয়েটা এতো বেশি আকৃষ্ট হয়েছে যে, পরের পর্ব ইউটিউবে আসা পর্যন্ত ওর তর সইছিল না। আপডেট পর্ব দেখতে টিভিতে বসে গেল। প্রথমে কয়টার নাটক কয়টায় শুরু হলো বুঝলাম না। এরপর ১৭ মিনিটের নাটক ৩৭ মিনিট ধরে দেখার পর মেয়ে বললো, থাক মা। আমি পরেই দেখবো। এখানে দেখতে গেলে আমার নাটক দেখার ইচ্ছাটা মরে যাবে।

এগুলো আমরা যারা বাংলাদেশের নাটক দেখতে চেষ্টা করি সবাই জানি। আরো কিছু জানা কাহিনী বলি। স্টার জলসা মাত্র শুরু হয়েছে। তখন আমার বাসায় দুইটা মেয়ে থাকে। একজন আমাকে কাকী আর একজন মামী ডাকে। হঠাৎ করে একদিন অফিস থেকে ফিরে দেখি রান্না-বান্না থেকে শুরু করে বাসা পুরো ফিটফাট। মেয়ে হোমওয়ার্ক করে দাদীর সাথে টিভি রুমে বসে আছে। ফ্রেস হয়ে এসে যথারীতি আমি টিভি দেখতে বসেছি। তখন সম্ভবত: কোনো খেলা চলছিল। আটটা বাজার কিছুক্ষণ আগে দেখি ছোটটা আমার মেয়েকে খোঁচাচ্ছে। খোঁচা খেয়ে মেয়ে আমাকে বললো, মা একটু সাতাশে দাও তো।
আমি বললাম, সাতাশে কী?
স্টার জলসা। বাংলা সিরিয়াল দেখবো।
সবার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম, সবাই একমত। তখন আমার বাসায় একটাই টিভি। সেটাতে আবার নেট চলে না। দর্শক চাহিদায় হেরে গিয়ে ওদের সাথে সিরিয়াল দেখা শুরু করলাম।

একদিন এসে বড়জন বলে, কাকী একটু সাতাশে দেন তো। একদিন ছোটটা বলে, মামী একটু সাতাশে দেন তো। একদিন শাশুড়ি বলেন, একদিন মেয়ে বলে। আস্তে আস্তে টাইম বাড়তে বাড়তে দুই ঘন্টায় গিয়ে দাঁড়ালো। মোট চারটা সিরিয়াল। একটা শেষ হতে আরেকটা শুরু। নিজের এই অবস্থা দেখে চারপাশে খেয়াল করলাম।
রাত এগারটা। ভাই তার বউকে নিয়ে বসে যায় স্টার প্লাসে।

সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা: মা তার ছোট নাতীকে খাওয়ানো শেষ করে তাকে নিয়েই আপুর বেডরুমের টিভিতে বসে যায় জি-বাংলায়।
সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা: দোতালার মনি আপাকে কফি খেতে ডাকলে জীবনেও আসবে না। মা-মেয়ের তখন জিটিভিতে সিরিয়াল দেখার সময়।
ভাবলাম, কী সুন্দর। কারা বলে(?) বাঙালী জাতির সময় জ্ঞান নেই! এই যে কতো সুন্দরভাবে টাইম মেইনটেইন করে সিরিয়াল দেখতে বসে যায়! কাজগুলোও তো বাকি থাকছে না। সবকিছুই সময় মেনে হচ্ছে।

অথচ এই প্রোগ্রামগুলোই বাংলাদেশের কোনো চ্যানেলে দেখতে গেলে ঠিক কতো ঘন্টা ব্যয় করতে হতো? আমরা কী আমাদের বাসার সহকারিদের ঘন্টার পর ঘন্টা বসে টিভি দেখতে দিতাম? এমনকি নিজেরাও কি আধা ঘন্টার নাটক আগে পরের সময়সহ ঘন্টার পর ঘন্টা ব্যয় করে দেখতাম?

যাই হোক, আমার মনে হলো এর থেকে বের হয়ে আসা দরকার। একদিন পিসিতে বসে আমার মেয়েকে বললাম, বাংলাদেশের নাটক দেখবা? মেয়ে বললো, না মা। আমার ভালো লাগবে না। বললাম, দেখোই না। ঐ যে কেয়া সাবানের এ্যাড করে না? মেয়েটা খুব সুন্দর অভিনয় করে।

প্রথমদিকে একটু বেগ পেতে হয়েছিল। সত্যি বলছি, বাসায় ফেরার পর এক সময় দেখি ছোট মেয়েটা বলছে, মামী আজকেও আমাদের একটা টিশা (তিশা) র নাটক দেখান তো। বড়টা বলছে, না, তারিনের নাটক। আমার মেয়ে বলছে, না অপূর্ব/ তাহসানের নাটক। শাশুড়িও ওদের সাথে বসে ওই নাটকই দেখতেন।

মেয়েগুলো এখন নেই। ওদের নেট ফ্যাসিলিটি নেই বলে হয়তো আবার ফিরে গেছে স্টার জলসা বা জি বাংলায়ই। তবে আমার মেয়ে কিন্তু এখন বাংলাদেশের অধিকাংশ অভিনেতা/অভিনেত্রীর নাম জানে। টিভিতে এ্যাড দেখে নেটে সার্চ দিয়ে বাংলাদেশের নাটকই দেখে।

রোকসানা ইয়াসমিন রেশনা

মি: কর্ণধারগণ, রাজনীতিবিদদের ফাঁকা বুলি, উল্টা-পাল্টা কথাবার্তা, সিস্টেমবিহীন কাজে এমনিতেই আম-জনতা মহা বিপাকে আছে। আর এই যে একটা শ্রেণী তাদের হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খাটে, তারাও কিন্তু মানুষ, তাদেরও বিনোদনের দরকার হয়। ঈর্ষাকাতর হয়ে দেশি চ্যানেলে তাদের এই সামান্য বিনোদন থেকে বঞ্চিত করার কোনো নৈতিক অধিকারই আপনাদের নেই।

আগে সিস্টম ঠিক করেন, ওরা যাতে সব কাজ শেষ করে ঠিক সময়মতো এসে টিভির সামনে বসে অনুষ্ঠান দেখতে পারে এবং শেষও করতে পারে।

এই পর্যন্ত সব কথা হয়তো বহুজন বহুভাবে আপনাদের বলতে চেষ্টা করেছে। যে কথাটা হয়তো কেউ বলেনি, তা হচ্ছে, দর্শকরাও কিন্তু জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিতে জানে। সাথে দৌড়ানিও দিতে জানে। সিস্টেম ঠিক না করে তাদের সামান্য একটু অধিকারে আঘাত করার কুপ্ররোচনা দেখে আপনাদেরও যে দৌড়ানি দেবে না, তার কিন্তু কোনো গ্যারান্টি নেই।

লেখাটি ১,০৬৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.